২০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি

বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বিদেশ যেতে বাংলাদেশি কর্মীদেরই সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ হয়। দুর্নীতিবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্য, ফিলিপাইনের কর্মীরা মধ্যপ্রাচ্যে বিনা খরচে কাজের অনুমতি বা ওয়ার্ক পারমিট পান। সে একই অনুমতিপত্র পেতে বাংলাদেশি কর্মীদের মাথাপিছু খরচ হয় দুই থেকে তিন লাখ টাকা। এভাবে জনশক্তি রফতানিতে বিদেশ থেকে চাহিদাপত্র, যা ‘ভিসা কেনা’ নামে পরিচিত, সংগ্রহ করে দেশে তা প্রক্রিয়াকরণে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম হয়।

গত বছর বাংলাদেশ থেকে রেকর্ডসংখ্যক কর্মী কাজ নিয়ে বিদেশ গেছেন। সংখ্যাটি ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। এসব কর্মীর কাছ থেকে মধ্যস্বত্বভোগী ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো যথেচ্ছ টাকা আদায় করছে। এর জন্য ভিসা কেনাবেচাকে দায়ী করেছেন জনশক্তি খাত সংশ্নিষ্টরা।

টিআইবির তথ্যানুযায়ী, বিদেশগামী ৯০ ভাগ পুরুষ কর্মী দুর্নীতির শিকার হন। ২০১৬ সালে ‘ভিসা কেনা’ বাবদ পাঁচ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার হয়েছে। গত বছর অনিয়মের অঙ্ক সোয়া আট হাজার কোটি টাকা। সমকালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৭ সালে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। এই টাকার একটি অংশ পায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট।

গত বছরে প্রায় সাত লাখ পুরুষ কর্মী সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গেছেন। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে গেছেন আরও দেড় লাখ কর্মী। সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে দুই থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত বেশি আদায় করে এজেন্সিগুলো। এই বাড়তি টাকা চাহিদাপত্র কিনতে যায় বলে জানিয়েছেন অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ব্র্যাক মাইগ্রেশনের প্রধান শরীফুল হাসান। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়া থেকে প্রায় প্রতিটি চাহিদাপত্র কিনে আনেন জনশক্তি রফতানিকারকরা। তা দেশে এনে কর্মীদের কাছে বিক্রি করেন। গন্তব্য দেশ ও বাংলাদেশ দুই দেশের দালালরা এই কেনাবেচায় জড়িত। এতে বিদেশ যাওয়ার খরচ (অভিবাসন ব্যয়) সরকার নির্ধারিত সীমার চেয়ে তিনগুণ পর্যন্ত বেশি হয়। ফলে সৌদি আরব যাওয়ার সরকার নির্ধারিত ব্যয় এক লাখ ৬৫ হাজার থেকে বেড়ে ছয় লাখ টাকা হয়। মালয়েশিয়া যাওয়ার ব্যয় এক লাখ ৬০ হাজার থেকে তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা। চাহিদাপত্র কেনাবেচা অবৈধ, তাই দাম পরিশোধ হয় হুন্ডির মাধ্যমে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে লাগামহীন অনিয়ম, দুর্নীতি হচ্ছে জনশক্তি খাতে। গত বছর টিআইবির গবেষণায় যে তথ্য এসেছে, গত এক বছরে পরিস্থিতি তার চেয়ে আরও খারাপ হয়েছে। এ বিষয়টি সবাই জানেন; কিন্তু সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে না। মালয়েশিয়ায় কর্মী যাচ্ছে সরকারি ব্যবস্থাপনায় (জিটুজি প্লাস), তার পরও দুর্নীতি হচ্ছে।

জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রা মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপন দাবি করেন, কর্মী এজেন্সির কাছে পৌঁছানোর আগেই দালালরা একটি বড় অঙ্ক নিজের জন্য রেখে দেয়। তা বন্ধে বায়ো-রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব করেছেন তিনি। এ পদ্ধতিতে দেশে চাহিদাপত্র বিক্রি বন্ধ হবে। এটা হলে বিদেশ থেকে কেনাও বন্ধ হবে। দালালমুক্ত করা যাবে বিদেশগামী কর্মী সংগ্রহের কাজ। এ পদ্ধতিতে কর্মী বিদেশ যাওয়ার পর টাকা পাবে এজেন্সি। তার টাকা থাকবে জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের (ডেমু) তত্ত্বাবধানে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।

বিদেশ থেকে কর্মীর চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে রিক্রুটিং এজেন্সি। এর বিপরীতে কর্মীরা ভিসা পান। ভিসা প্রক্রিয়াকরণে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে ছাড়পত্র সংগ্রহ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়া, দূতাবাস থেকে ভিসা সত্যায়ন করতে হয়। এগুলো এজেন্সির মাধ্যমে করতে হয় এবং এর প্রতিটি ধাপে অনিয়ম হয় বলে অনুসন্ধানে দেখা যায়।

এ অনিয়মের জন্য বিদেশগামী কর্মীদের দায়ও দেখছেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি। তার দাবি, কর্মীরা অতিরিক্ত টাকা দিলেও অভিযোগ করে না। ইমিগ্রেশনে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও বাড়তি টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করে না। মন্ত্রী সমকালকে বলেন, ‘যারা বেশি টাকা দিয়ে যাচ্ছেন তারা যদি অভিযোগ না করেন, আমরা কী করতে পারি? যারা অভিযোগ করেন, তাদের বেশিরভাগ সেটা করেন বিদেশ যাওয়ার পর। কিন্তু যাওয়ার পর অভিযোগ করলে কী করে ব্যবস্থা নেব? যাওয়ার আগে যদি লিখিত অভিযোগ নিয়ে আসেন ব্যবস্থা নেব। সার্বক্ষণিক তাদের অভিযোগ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। বাড়তি টাকা নিলেই রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে নেওয়া হবে।’

কর্মীরা কেন অভিযোগ করে না- তার জবাব পাওয়া যায় প্রতারিত কর্মীদের সহায়তা করা অনির্বাণ ফাউন্ডেশন নামের একটি সংগঠনের কর্মকর্তা আল আমিন সয়নের কথায়। তিনি নিজেও একসময় প্রতারিত হয়েছিলেন। আল আমিন বলেন, গ্রামের একজন যুবক দেশে ভালো কাজ না পেয়ে ভিটামাটি বিক্রি করে, ধারদেনা করে উন্নত জীবনের আশায় বিদেশ যান। অভিযোগ করলে যদি তার বিদেশ যাওয়া আটকে যায়, এ ভয়ে কেউ মুখ খোলেন না। প্রবাসী কল্যাণ ভবনে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে আসা কর্মীদেরও একই বক্তব্য। সবাই বাড়তি টাকা দিচ্ছেন; কিন্তু কারও অভিযোগ নেই। কেউ মুখ খুলতে চান না।

বায়রার সাবেক একজন শীর্ষ নেতা সমকালকে বলেন, চলতি বছরে সাড়ে পাঁচ লাখ কর্মী সৌদি আরব গেছেন। প্রতিটি চাহিদাপত্র পাঁচ থেকে ১৫ হাজার রিয়ালে (এক লাখ থেকে তিন লাখ টাকায়) কেনা। নিয়োগকারী কর্মীকে এক বছরে যে টাকা বেতন দেবেন, তা ভিসা বিক্রি করেই তুলে নেন। কর্মী নিয়োগ দিতে পারলেই লাভ, এ অঙ্ক থেকে নিয়োগকারীরা ভুয়া চাকরি দেখিয়েও ভিসা পাঠান।

এ ধরনের ভুয়া ভিসার শিকার গাইবান্ধার সাঘাটার সর্দারপাড়া গ্রামের মো. মানিক মিয়া। গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি সৌদি আরব গিয়েছিলেন। আট লাখ টাকা খরচ হয়। ঢাকার সেগুনবাগিচার গ্রিনল্যান্ড ওভারসিজ (নিবন্ধন নম্বর আরএল-০৭৩৯) নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সি তাকে পাঠায়। কারখানায় চাকরির কথা বলে বিদেশ পাঠিয়ে পরিচ্ছন্নকর্মীর কাজ দেয়। কর্মীর প্রয়োজন না থাকার পরও তার নিয়োগকারী তাকে সৌদি নিতে চার লাখ টাকায় ভিসা বিক্রি করে। চাকরি হারিয়ে গত এপ্রিলে শূন্য হাতে দেশে ফেরেন তিনি। তবে একটি টাকাও ফেরত পাননি।

বায়রার ওই সাবেক নেতা স্বীকার করেন, চলতি বছরে তিনি এক হাজার ২০০ কর্মী পাঠিয়েছেন। অধিকাংশ চাহিদাপত্রই কিনেছেন। প্রতিটি চাহিদাপত্রের জন্য গড়ে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। দেশে বিক্রি করেছেন চার লাখ টাকায়। কর্মী জোগাড় করে দেওয়া দালালদের জনপ্রতি ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা দিতে হয়। তিনি জানান, একজন কর্মীর বিদেশ যাওয়ার যাবতীয় অনুমতি ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে কল্যাণ তহবিলে সাড়ে তিন হাজার টাকা দেওয়াসহ সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা খরচ হওয়ার কথা; কিন্তু দিতে হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা গেছে মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির সিন্ডিকেটের পকেটে। বিমান টিকিট ও এজেন্সির মুনাফাসহ ছয় লাখ টাকা খরচ পড়ে কর্মীর। কিন্তু সরকার নির্ধারিত ব্যয় এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা।

বায়রার ওই নেতার তথ্য যাচাই করতে সাংবাদিক পরিচয় গোপন করে এজেন্সি প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিএমইটিতে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি ধাপেই অনিয়ম হয়।

চারটি এজেন্সির প্রতিনিধিরা সমকালকে জানান, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে প্রবাসী কল্যাণ ভবনে ‘বই’প্রতি ২০ হাজার টাকা দিতে (পাসপোর্টকে বই বলা হয় এখানে)। মধ্যপ্রাচ্যে নারী কর্মীদের বিনা খরচে বিদেশ যাওয়ার কথা থাকলেও তাদের ‘বই’ থেকেও টাকা আদায় হয়। গত বছরে প্রায় ১০ লাখ কর্মী বিদেশে গেছেন। কর্মীপ্রতি ২০ হাজার টাকা হিসেবে দুই হাজার কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে।

টাকা কাকে দিতে হয়? কারা এই ‘সিন্ডিকেট’? এজেন্সি মালিক ও প্রতিনিধিরা জানান, বিএমইটি ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের দুই কর্মকর্তা এবং একজন মন্ত্রীর ছেলের নেতৃত্বে চলছে এই সিন্ডিকেট। তারাই প্রক্রিয়াকরণের নিয়ন্ত্রক। অভিযোগ রয়েছে, প্রবাসী কল্যাণ ভবনের বাইরেও ছাড়পত্র ও সত্যায়নের কাজ হয়।

জানা গেছে, ভিসা কেনাবেচা ও ঘুষে সৌদি আরব যেতে সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা বেশি খরচ হয়। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়ায় কারখানার কাজে এক লাখ ৬০ হাজার ও কৃষি কাজে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা, বাহরাইনে ৯৭ হাজার ৭৮০ টাকা, কাতারে এক লাখ ৭৮০ টাকা, কুয়েতে এক লাখ ছয় হাজার ৭৮০ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করেছে। অথচ সরেজমিনে দেখা যায়, মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের কাছ থেকে তিন লাখ ৬০ হাজার থেকে তিন লাখ ৮০ হাজার, কাতারগামীদের কাছ থেকে তিন লাখ থেকে সাড়ে তিন লাখ, কুয়েতগামীদের কাছ থেকে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ, সিঙ্গারপুরগামীদের কাছ থেকে চার লাখ থেকে চার লাখ ২০ হাজার টাকা নিচ্ছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। কিন্তু টাকা লেনদেনের কোনো রসিদ দেওয়া হয় না।

অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সি আর আবরার বলেন, রসিদ ছাড়া লেনদেনের কারণে অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়েছে।

Comments

comments