অস্ত্র সরবরাহকারী ছাত্রলীগ নেতাকে খুঁজছে পুলিশ

চট্টগ্রামে স্কুলছাত্র আদনান হত্যা

চট্টগ্রামে স্কুলছাত্র আদনান ইসপার (১৩) খুনে অস্ত্র সরবরাহকারী ছাত্রলীগ নেতা এনাম হোসেনকে খুঁজছে পুলিশ। পাশাপাশি ওই অস্ত্রটিও (পিস্তল) উদ্ধারের চেষ্টা করছে তারা। ঘটনার পর চার ঘাতককে আশ্রয় দিয়েছিলেন ফটিকছড়ি উপজেলার সমিতিরহাট ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি মো. ফয়সাল। তার বাড়ি থেকেই ওই চারজনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। কাজেই এ হত্যায় ফয়সালের সম্পৃক্ততা আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

হত্যার সময় আদনানকে ছুরিকাঘাত করেছিল মঈন খান। তার পরিবারের দাবি, চকবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রউফ মঈনকে বিপথগামী করেছে।

কে এই এনাম : আদনান হত্যায় এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা শুক্রবার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এতে সাব্বির খান বলেছে, যে অস্ত্রটি আদনানের মাথায় ঠেকিয়ে ভয় দেখিয়ে মারধর করা হয়েছিল সেটি সরবরাহ করেছে তার রাজনৈতিক বড় ভাই এনাম হোসেন। ঘটনার পর সে অস্ত্রটি অন্য এক বড় ভাইয়ের কাছে জমা দিয়েছিল। এনাম মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের একাংশের নেতা এবং সরকারি হাজী মুহম্মদ মহসিন কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তার বাড়ি রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের সিকদার পাড়া গ্রামে। তার বাবার নাম এসকান্দর মিয়া চৌধুরী। এনাম স্থানীয়ভাবে চকবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রউফের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

এলাকার ইউপি সদস্য মো. জয়নাল আবেদিন যুগান্তরকে বলেন, ‘স্কুলছাত্র আদনান হত্যায় অস্ত্র সরবরাহদাতা এনামের বিষয়টি পত্রিকায় পেয়েছি। তবে এনামকে এলাকায় কখনও অস্ত্র নিয়ে হাঁটা কিংবা খারাপ কোনো কাজে দেখিনি। হয়তো শহরে খারাপ বন্ধুদের সঙ্গে মিশে এমন হয়েছে। তার বাবা মারা গেছে কয়েক বছর আগে। ৩ ভাই দুই বোনের মধ্যে এনাম সবার ছোট। তার বড় ভাই এমরান হোসেন বিদেশে থাকে। মেঝ ভাই ইমাম হোসেন লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনি করে। এনাম কদলুপর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর শহরের ভালো কলেজে পড়ার সুযোগ পায়। এ কারণে সে শহরেই থাকে।’

কোতোয়ালি থানার ওসি মো. জসিম উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক বড় ভাই এনামই সাব্বিরকে অস্ত্রটি সরবরাহ করেছে বলে আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে বলেছে। এনামকে গ্রেফতারের পাশাপাশি অস্ত্রটি উদ্ধারে আমরা চেষ্টা করছি। আদনানকে হত্যার সময় পিস্তলটি তার মাথায় ঠেকিয়ে ভয় দেখানো হয়। মঈনের ছুরিকাঘাতে মৃত্যু হয় আদনানের।

আশ্রয় দাতার খোঁজ : আদনানের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর ১৬ জানুয়ারি বিকাল ৪টার দিকে মূল ঘাতক মঈন খানসহ চারজন চট্টগ্রাম শহর থেকে পালিয়ে যায় জেলার ফটিকছড়ি উপজেলায়। সেখানে সমিতিরহাট ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি মো. ফয়সালের বাড়িতে তারা আশ্রয় নেয়। গোপনে জানতে পেরে পুলিশ সেখান থেকে মূল ঘাতক নগরীর চান্দগাঁও এলাকার একটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র মঈন খান, সাব্বির খান, চকবাজার ডিসি রোডের হলি ফ্লাওয়ার স্কুল থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী এখলাছ উদ্দীন আরমান এবং ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে সদ্য এইচএসসি পাস করা আবদুল্লাহ আল সাঈদকে গ্রেফতার করে।

এ প্রসঙ্গে নগর পুলিশের উপ-কমিশনার মোস্তাইন হোসেন যুগান্তরকে জানান, হত্যাকারীদের আশ্রয়দাতা ফয়সালের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আশ্রয়দাতার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মঈনকে বিপথগামী বানিয়েছে রউফ : ১৬ জানুয়ারি দিনে-দুপুরে মঈন খানের ছুরিকাঘাতে আদনান মারা যায়। শুক্রবার আদালতে দেয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও মঈন স্বীকার করেছে আদনানকে ছুরিকাঘাতের কথা। মঈন লোহাগাড়া উপজেলার রাজঘাটা এলাকার প্রবাসী নুরুল ইসলামের ছেলে।

মঈনের মা নাজমুন নাহার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার ছেলে মানুষ খুন করবে তা আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। মঈনকে বিভিন্ন সময়ে গত সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুর রউফ লোক দিয়ে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যেত। রউফই আমার ছেলেকে বিপথগামী করেছে। মঈনের আরেক আত্মীয় জানান, রউফের কারণে মঈন আজ খুনি হয়েছে। হাতে হাতকড়া পরতে হয়েছে। জেলে যেতে হয়েছে। তিনি আরও জানান, রউফ স্কুল-কলেজের ছাত্রদের নিয়ে নোংরা রাজনীতি করে।

খোঁজ নিয়ে গেছে, রউফ চকবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক পদে দায়িত্বে আছে। চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজে আধিপত্য বিস্তারের জন্য কিশোর বয়সী এসব কর্মীদের ব্যবহার করে ফায়দা লুটত সে। রউফ গত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়।

এ প্রসঙ্গে কোতোয়ালি থানার সহকারী কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম যুগান্তরকে জানান, শুক্রবার আদালতে দেয়া পাঁচ আসামির জবানবন্দিতে আদনান হত্যায় জিলহাজ নামে আরও একজন জড়িত থাকার কথা এসেছে। ঘটনার সময় আদনানকে মারধর করে জিলহাজ। অস্ত্র সরবরাহকারী এনামকে গ্রেফতার এবং ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারে আমরা চেষ্টা করছি।

Comments

comments