ছাত্রলীগের নেতৃত্বে চট্টগ্রামেও ৪১ ওয়ার্ডে শতাধিক গ্রুপের ‘গ্যাং কালচার’

চট্টগ্রামে এতকাল কিশোরদের গ্যাঙের অস্তিত্বের কথা জানা যায়নি। দু দল কিশোরের দ্বন্দ্ব, প্রচণ্ড গতিতে মোটর সাইকেল চালানো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফ্রি ওয়াইফাই জোনে বসে ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি ছাড়া তেমন কোনো উৎপাতের খবর ছিল না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে।

গত ১৬ জানুয়ারি নগরীর জামালখান এলাকায় কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্রলীগ নেতা আদনান ইসফারের খুনের তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে নতুন তথ্য। জানা যায়, গ্যাং কালচারে অভ্যস্ত কিশোরদের অনেকেই জড়িয়ে পড়েছে খুনোখুনির ঘটনা এবং রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’দের প্রশ্রয়ই তাদের এমন বেপরোয়া করে তুলেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার কারণে এসব বড় ভাইয়েরা কখনোই ধরা পড়ে না। কোনো ঘটনার পর কিছুদিন বড় ভাইদের নিয়ে শোরগোল শোনা যায়, পরে অন্য কোনো খবরের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। এ সুযোগে বড় ভাইয়েরা নতুন করে আবারো গ্যাং কালচারে টেনে নতুন করে গ্রুপ গঠন করে দেন।

ইতোপূর্বে ঢাকায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এ ধরনের স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের গ্যাং কালচারের খবর জানাজানি হয়েছিল। উত্তরার ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবীর খুন হয়। খবরটি নিয়ে চাঞ্চল্যের ফাঁকেই তেজকুনি পাড়ায় খুন হয় ১৬ বছরের কিশোর আজিজুল হক। আশঙ্কার বিষয় হলো, ঢাকায় গ্যাং কালচারের নেপথ্যে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার খবর উঠে আসলেও পুলিশ ছিল নির্বিকার। রাজধানীর মতই চট্টগ্রামে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গ্যাং কালচার পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে।

গত ১৬ জানুয়ারি ছাত্রলীগের কোন্দলে আদনান খুনের ঘটনার পর কিশোর গ্যাঙের এই উপস্থিতি নতুন করে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই খুনের ঘটনার পর নগরীতে গ্যাংগুলো সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, গ্যাঙের সদস্যরা মূলত কিশোর। এদের মদ্যে অনেকেই নামী স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থী। ছাত্রলীগের থানা ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা মূলত এদের পরিচালনা করে। দলীয় মিছিল ও সভা সমাবেশে এদের ব্যবহার করার জন্যই বিভিন্ন অনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া হয়। এসব গ্যাঙের সদস্যদের কাছে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, পাড়া–মহল্লায় দাপট দেখানো তাদের প্রথম দিককার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এসব থেকে স্বাভাবিকভাবেই মারামারি। প্রথমে ছোটখাটো, তারপর ক্রমান্বয়ে ভয়ংকর।

এসব গ্রুপের লিড দেয় এলাকার ছাত্রলীগের কথিত ‘বড় ভাইয়েরা’। এদের কাজ নিজ এলাকার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আধিপত্য ধরে রাখা। অনেকেরই অভিযোগ, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১৪ থেকে ১৮ বছরের কিশোররা ভয়ংকর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এসব অপরাধের বলী হয়েছে আদনান। আদনান ইসফার হত্যায় জড়িত আরমান, সাব্বির, মুনতাসির, মহিম ও আবু সাঈদকে গ্রেপ্তারের পর এখন পর্যন্ত গণি বেকারি, চকবাজার, মহসিন কলেজ, চন্দনপুরাকেন্দ্রিক তিনজন ছাত্রলীগ নেতার সন্ধান পাওয়া গেছে। এরা হলেন জিলহাজ, এনাম ও বোরহান। এদের পেছনে আছে চন্দনপুরার রউফ। একইভাবে নিহত আদনান ও তার বন্ধুরা জামালখান এলাকায় সাব্বির নামে অন্য এক বড় ভাইয়ের ছায়ায় চলাফেরা করত বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। তবে এ দুটি গ্রুপ শুধু নয়, নগরীর ৪১ টি ওয়ার্ডেই অন্তত শতাধিক গ্রুপের সন্ধান আছে পুলিশের কাছে। শুধু নন্দনকানন, জামালখান, আন্দরকিল্লা, চকবাজার, কলেজ রোড, দেওয়ানবাজার, দেওয়ানজী পুকুর পাড় ও চন্দনপুরায় ১২টি গ্রুপের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ, যারা গত এক বছরে অন্তত বিশটি ঘটনা ঘটিয়েছে।

সিএমপির অতিরিক্ত উপ–কমিশনার শাহ মোহাম্মদ আবদুর রউফ বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘এসব গ্রুপ গড়ে ওঠার পেছনে শুধু পুলিশকে দায়ী করাটা অবিচার হবে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ক্লাস এইট, নাইন, টেন এসময় শিক্ষার্থীরা অতি আবেগী হয়ে ওঠে। কৌতূহলটাও তাদের বেশি থাকে। পাশাপাশি বিদ্রোহী মনোবৃত্তিটাও কাজ করে। পারিবারিকভাবে তাকে গাইড করাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি হয়ে পড়ে। পারিবারিক বন্ধন শিথিলতা একটা বড় কারণ। আর এরা যখন পলিটিক্যাল শেল্টার পায়, তখন আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পারিবারিক অনুশাসন বাড়াতেই হবে। সামাজিক অনুশাসনটাও জরুরি।’

অভিযোগ রয়েছে, কোনো একটি ঘটনা ঘটার পর গ্রুপের দুই–একজন ধরা পড়লেও বড় ভাইয়েরা আড়ালে থাকে। ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক তদ্বিরের কারণে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে না। তার সুযোগে তারা নতুন করে গ্রুপ গঠন করে। বড় ভাইয়েরা প্রকাশ্যেই চলাফেরা করে। শুধু তাই নয়, ওই বড় ভাইয়েরা নিজেদের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে নতুন গ্রুপ গঠন করতে প্রয়োজন হবে এমন দুই একজনকেও বাঁচিয়ে নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়ী হারুন খুন, ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত খুন, বন্ধুর হাতে নৃশংসভাবে ইমন খুন এবং সর্বশেষ আদনান খুনের ঘটনায় বড় ভাই খ্যাত এসব ছাত্রলীগ নেতারা আড়ালেই রয়ে গেছে।

Comments

comments