আওয়ামী লীগের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ও দেশবাসীর বোধোদয়

নাফিজ তমিজী

প্রণব বাবুর বিতর্কিত সেই ছবি

যূগে যূগে আওয়ামী লীগের ভারত তোষণনীতি ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতিতে দেশ ও দেশের সার্বভৌমত্ব কতখানি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তা হিসেব করে বলা মুশকিল। কিন্তু এদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতি যতবার ব্যহত হয়েছে তার নেপথ্যে ভারতের কূটকৌশল এখন জাতির সামনে অনেকটাই স্পষ্ট। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ভারতীয় হাইকমিশনের পোস্ট করা প্রণব বাবুর ফটোসেশন প্রকাশিত হওয়ার পর অনলাইনে এ আলোচনা বেশ জোরদার হয়েছে।

ড. আসিফ নজরুল বলেন “ভারতের হাই কমিশনারের সাথে এককাতারে দাড়িয়ে আমাদের দেশের স্পীকার, সিনিয়র কয়েকজন মন্ত্রী এবং সাবেক একজন রাষ্ট্রপতি। সামনে ভরিক্কি ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে আছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি। এ ছবি দেখে অনেকে অনেক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। আমারো কিছু প্রতিক্রিয়া হলো যা না লিখে পারলাম না।
ক. ছবিটি দেখে আমি দুঃখ পেলেও অবাক হইনি। প্রণব বাবু ভারতের রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে খবরদারীত্ব করতেন। হয়তো এখনো করেন। ছবির শরীরি ভাষা তাই বলে।
খ. দুঃখটা আমাদের নেতাদের নিয়ে। যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে আমার দেশ। এ দেশের বহু নেতার মধ্যে তারপরও আত্নমর্যাদাবোধের এতো অভাব কেন?
গ. অন্যদের প্রসঙ্গ না হয় বাদ দিলাম। এরশাদ সাহেব তো প্রণব বাবুর চেয়ে বয়সে বড়, প্রণব যখন সাধারণ একজন মন্ত্রী, এরশাদ ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। প্রণব মুখার্জি রাষ্ট্রপতি হওয়ার ৩১ বছর আগে এরশাদ রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। বসে থাকা প্রণবের পেছনে অন্যদের সাথে তিনি কিভাবে দাড়িয়ে গেলেন?
আমরা লজ্জা পাচ্ছি। তারা কি পাচ্ছেন একটুও?”

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে মানুষ, হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ নয় পেছনে দণ্ডায়মান বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট। প্রণব মূখার্জী যখন ভারতের অর্থমন্ত্রী (১৯৮২-৮৪) হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। তাছাড়া বয়সেও প্রণব মূখার্জী তাঁর থেকে ৫ বছরের ছোট। রীতিবদ্ধভাবে, একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির সাথে আরেক সাবেক রাষ্ট্রপতি দেখা করতে গেলে যেরকম প্রটোকল দেখানো উচিত সেই সৌজন্যতাও ভারতীয় দূতাবাস দেখায়নি । অন্তত এরশাদ সাহেবের জন্য আরো একটি চেয়ার দিয়ে, সমতা দেখানো উচিত ছিল।

তবে এই সমালোচনায় এদেশীয় কয়েকটি ভারতপন্থী মিডিয়া ও গুটিকয়েক সাংবাদিক অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেশের আপামর জনতার মতামতকে তির্যক আক্রমনের লক্ষবস্তুতে পরিণত করেছে। ছবিতে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতিকে দাঁড়িয়ে থাকা বিষয়টি নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন, তাদেরকে ‘ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণের পরামর্শ’ দিয়ে কেউ কেউ বলছেন যে, প্রণবের হয়তো পায়ে সমস্যা আছে, অসুস্থ। এইজন্য তাকে বসতে দেয়া হয়েছে, বাকিরা দাঁড়িয়ে আছেন! তাদের জন্য নিচের ছবি।

এ ছবিতে দেখা যাচ্ছে কোনো মানুষ বা বস্তুর সাহায্য ছাড়াই একা হেঁটে বাড়ি পরিদর্শন করতে পারছেন প্রণব। তার মানে মিডিয়ায় প্রচারিত হবে এমন একটি আনুষ্ঠানিক ছবির ছবির পোজ দেয়ার সময় দাঁড়াতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি!!

পিনাকী ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের মানুষ মনে করে ভারতের আশীর্বাদপুস্ট হয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আছে। তাদেরই প্রত্যক্ষ মদদে গত ভোটার বিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পেরেছে এবং এমন অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরেও সরকার ক্ষমতায় থাকতে পেরেছে। গত নির্বাচনে ভারত ন্যাক্কারজনকভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। মানুষ বিশ্বাস করে তার রাজনৈতিক অধিকার হরণ করার পিছনে একমাত্র কারণ ভারত। তারা এটাও আশংকা করে বাংলাদেশকে ভারত তার করদ রাজ্যে পরিণত করবে। বাংলাদেশে ভারতের এই রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের প্রাণপুরুষ হিসেবে মানুষ প্রণবকে চিনেছে। প্রণব এই আগ্রাসনের প্রতীক। এই চেনার পিছনে প্রণবের সাম্প্রতিক প্রকাশিত বইয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার হস্তক্ষেপের স্বীকারোক্তি একটি নিয়ামক ভুমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকার হরণে প্রণবের হস্তক্ষেপ:
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা সংসদ নির্বাচনে ভারত প্রকাশ্যে কলকাঠি নেড়েছে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে। দেশটির পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এসে বিএনপিকে বাইরে রেখে অন্য দলগুলোকে নির্বাচনে আনার জন্য তৎপরতা চালিয়েছিলেন।

২০১৪ সালের সে নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত শুধু প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ করেনি, গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠায় একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ ভারতের এ ধরনের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রকাশ্য কলকাঠি নাড়ার এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ২০০৭ সাল থেকে। সে সময় বাংলাদেশের রাজনীতি ক্ষমতার প্রধান নিয়ন্ত্রক ছিলেন বিতর্কিত সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ। কিভাবে তিনি দিল্লির নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছেন, সে ব্যাপারে ‘দ্য কোয়ালিশন ইয়ারস ১৯৯৬-২০১২’ বইতে খোলামেলা লিখেছেন ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি।

‘শেখ হাসিনা (আমার) ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু। যখন আমি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলাম, তখন ভারত তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করার মাধ্যমে। যখন তিনি জেলে ছিলেন এবং তাকে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতা ত্যাগ করেছিলেন, আমি তাদেরকে তাদের অবস্থানে ফিরে যেতে তাগিদ দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, তারা এমন একজনকে ত্যাগ করছেন, এটা অনৈতিক। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন হলো। সেই নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী হলেন শেখ হাসিনা।’

প্রশ্ন হলো, প্রণব মুখার্জি কিভাবে নির্বাচনের আগে নিশ্চিত হয়েছিলেন শেখ হাসিনা জিতবেন? তিনি নির্বাচনের ফলাফল জানতেন বলে কি মইন উ আহমেদকে আশ্বস্ত করেছিলেন? নাকি মইন উ আহমেদ শেখ হাসিনাকে জিতিয়ে আনলে তাকে রক্ষার গ্যারান্টি প্রণব মুখার্জি দিয়েছিলেন?

সূত্র: আলফাজ আনাম, নয়াদিগন্ত

সময়ে অসময়ে আওয়ামী নেতাদের ভারতের শরণাপন্ন হওয়া:
আলাউদ্দিন নাসিম আর শামীম ওসমান বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ করেছিলেন প্রণব মুখার্জির সঙ্গে। শামীম ওসমান কানাডা ছেড়ে চলে আসেন ভারতে। একবার প্রণব মুখার্জির দুই পা ধরে শামীম ওসমান চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন। আর বলতে থাকেন, দাদা আপনি যেভাবে পারেন আমাদের নেত্রী, আমাদের আপাকে বাঁচান। তারা মেরে ফেলেছে নেত্রীকে। প্রণব মুখার্জি বিস্ময় নিয়ে তাকান শামীমের দিকে। এবার শামীম বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি দাদা কাল রাতে। আপনি খোঁজ নিন।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, নঈম নিজাম

শুধু এ ঘটনা নয় এভাবে বার বার আওয়ামী ভারততোষণের মানসিকতা, নির্লজ্জভাবে ভারতীয় নেতাদের তোষণ ও ভারতের কর্তৃত্বমূলক মনোভাবের কারণে স্বাধীন হলেও বার বার বিতর্কিত হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

সংখ্যালঘূ নির্যাতনের গুজবে ভারতের উত্তেজনা:
ভারতের মুসলিমদের উপর নির্যাতনে বাংলাদেশ সরকার কোনো বক্তব্য না দিলেও বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের গুজবে ভারতের নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশে লাফিয়ে চলে এসেছে।
গত ৩১ মে ২০১৬ বিজেপি’র কেন্দ্রীয় নেতা অরুন হালদার বাংলাদেশে এসেছিলেন সরকারের কোনো অবগতি ছাড়াই।

এছাড়াও ভারতে থেকে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী নেতারা নানা রকম উস্কানিমূলক বক্তব্য বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ দখলের জন্যও হুঙ্কার দিয়েছে বিজেপির সুব্রাহ্মনিয়াম স্বামীসহ আরও অনেক নেতা। সম্প্রতি সেনাবাহিনীর একটি অংশ কর্তৃক হাসিনার আক্রান্ত হওয়ার খবরও ছেপেছে ভারতীয় মিডিয়া।

ভারতের তোষণে আওয়ামী লীগ এতটা নির্লজ্জ যে গত ১০ ই ডিসেম্বর, ২০১০ আর্মি স্টেডিয়ামে ভারতীয় অভিনেতা শাহরুখ খানের কনসার্টে চেয়ার না পেয়ে মাটিতে বসে পরেছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর চেয়ারে থাকা শামসুল হক টুকু। যার গাড়িকে অন্য গাড়ি অতিক্রম করলে ড্রাইভারকে ধরে পেটান সেই লোক সামান্য একজন অভিনেতার আগমনে মাটিতে বসে পরেন। এমন হীন কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন আপামর দেশবাসী।

যাইহোক, প্রণব বাবুর পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকা আর তার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তোলায় অন্তত নতুন প্রজন্মের কাছে একটা বার্তা অবশ্যই পৌঁছেছে। আর এর মাধ্যমে জাতির বোধোদয় হয়ে থাকলে তা অবশ্যই বাংলাদেশকে আধিপত্যবাদী ভারতের গ্রাস থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশ নিজের পায়ে দাঁড়াক। সার্থক করুক অর্জিত স্বাধীনতা।

লেখক: সাংবাদিক

Comments

comments