রায়ের বাজার বেড়িবাঁধে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুরা

তারিকুল হাসান

শিশুরা নিষ্পাপ, ফুলের মতো সুন্দর। তারা ফুলের মতো ফুটবার এবং পরিপূর্ণ রূপে বিকশিত হবার দাবি নিয়ে পৃথিবীতে আসে। দেশের সম্পদের অসমবণ্টন ও সামাজিক অসংগতির কারণে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে, অনেক শিশুর সুন্দর রুপে বেড়ে ওঠা। তাদের সুন্দর হাত গুলো শিকার হচ্ছে শিশুশ্রমের।

রায়ের বাজার বেড়িবাঁধ এলাকায় স্টিল এবং লোহার কারখানায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে দেখা যায় কোমলমতি শিশুদের। যেখানে তাদের বেড়ে ওঠা আর বেঁচে থাকা দুটিই হচ্ছে চরম দারিদ্রতা ও বঞ্চনার মধ্যে দিয়ে।

রায়ের বাজার বেড়িবাঁধের অলিউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে গ্রিলের কাজ করে সাইদ খান (১৩)। তিনি বলেন, ‘বাবার রিক্সার আয় দিয়ে সংসার চলেনা। তাই এখানে ৬ হাজার টাকা বেতনে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮ প্রযন্ত কাজ করি। মা বাসাবাড়িতে কাজ করে। গ্রিল ঝালাইয়ের কাজে অনেক সময় চোখে শর্ট লাগে, হাট- পা কেটে যায়, তখন মালিক বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।’

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের কম বয়সি শিশুদের কাজে নিয়োগ দেয়া এবং ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ দেয়া আইনত নিষিদ্ধ৷ তবে সেই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছেনা৷ ফলে কমছেনা শিশুশ্রম, যা শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ক্ষতিকর৷

সাদেক খান তেলের পাম্পের পাশের ইটখোলার বস্তিতে বাবা-মায়ের সাথে থাকে জাকির হোসেন (১৩)। বেড়িবাঁধের জাহাঙ্গীর মিয়ার ওয়ার্কশপে ১৮০০ টাকা বেতনে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত লোহা টানার কাজ করে জাকির। জাকির বলেন, ‘লোহা টানতে পারিনা কষ্ট হয়। বাবা রাজমিস্ত্রি, মা বাসাবাড়িতে কাজ করে, বড় ভাই বাসের হেল্পারি করে তাও বাড়িতে অভাব। স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে, মা স্কুলে দিয়ে চায় কিন্তু বাবা বলে স্কুলে যাওয়ার দরকার নাই, কাজে যা। এই নিয়ে বাবা মায়ের খুব ঝগড়া হয়।’

বাংলাদেশের বাস্তবতায় নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরায় তাদের ঘরে চাঁদের টুকরা এলেও সে সন্তানটি হয় অবহেলিত, নিগৃহীত, অধিকারবঞ্ছিত। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে তারা বেড়ে ওঠে পড়গাছার মত, মুখোমুখি হয় কঠিন বাস্তবতার।

কেন শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করান জানতে চাইলে রায়ের বাজার বেড়িবাঁধের ফাহিম এন্টার প্রাইজের মালিক মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা তো ওদের কাজ দিতে চাইনা। ওদের বাবা মা এসে খুব অনুগ্রহ করে বলে, তখন বাধ্য হয়েই কাজ দিতে হয়। কাজে তো ঝুঁকি আছেই কিন্তু এটাই আমাদের দেশের চিত্র।’

আন্তর্জাতিক শ্রম আইন সংস্থা (আইএলও) এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, যখন কোন শ্রম বা কর্ম পরিবেশ শিশুর জন্য দৈহিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক এবং সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে অন্তরায় ও ক্ষতিকর হিসেবে গণ্য হবে তখন তা শিশুশ্রম হিসেবে গণ্য হবে।

রায়ের বাজার বেড়িবাঁধের স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম সাগর বলেন, ‘বেড়িবাঁধের অনেক কারখানায় শিশুদের বড়দের চেয়ে অনেক বেশী কাজ করায় কিন্তু বেতন দেয় অনেক কম। যে বেতন দিয়ে তারা চলতেই পারেনা। বাবা যখন ছেলের কাজের জন্য এসে অনুরোধ করে, মালিকেরা সেই সুযোগ নিয়ে ১ ঘণ্টার জায়গায় ২ ঘণ্টা কাজ করায়।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত ‘জাতীয় শিশু জরিপ ২০১৩’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিভিন্ন শ্রমে নিয়োজিত আছে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু।এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজারশিশু।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের হিসাবমতে, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে দেশের ১৩লাখশিশু।

২০০৬ সালের শিশু সনদে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের সার্বিক শ্রম এবং ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সরকারী শিশু জরিপ ২০০৩ অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সের ৩.২ মিলিয়ন শিশু কাজ করে।যারা প্রতি নিয়তই হচ্ছে অধিকার বঞ্চিত। বেতন বৈষম্য থেকে শুরু করে তারা হয় নানারকম শারিরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার।

হায়দার স্টিল ওয়ার্কশপে লোহা টানার কাজ করে সামিম হোসেন (১২)। তিনি বলেন, ‘সকাল ৮ থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত মাসে ৩৫০০ টাকা বেতনে কাজ করি। বাবা মাকে ছেড়ে যাবার পর ভোলা থেকে মায়ের সাথে ঢাকায় চলে আসি। ঢাকায় আসার পর মা অসুস্থ হলে অনেকদিন ভিক্ষাও করছি। ঢাকায় মা আরেকটা বিয়ে করার পর থেকে আমি এই কারখানাতেই থাকি, লোহা টানি।’

বাংলাদেশে শিশু শ্রমিকরা প্রায় ৩৪৭ ধরনের অর্থনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে ৪৭ ধরনের কাজকে অত্যন্ত ঝুঁকি পূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে ব্যাটারিসহ বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক কারখানায় শিশুশ্রম, ট্যানারিশিল্প, যৌনকর্ম, বিড়ি ও তামাকফ্যাক্টরি, পরিবহনখাত, ময়লা আবর্জনা সংগ্রহকরা, গ্যাসফ্যাক্টরি, লেদমেশিন ও ওয়েল্ডিংয়ের কাজ, অটো মোবাইল কারখানা, লবণকারখানা, রিকশাওভ্যানচালনা, কাঠমিস্ত্রিরকাজ, জুয়েলারি শিল্পে কারিগরেরকাজ, চাল ও মসলার কারখানায় কাজ, ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানারকাজ, মাদকদ্রব্যবিক্রি।

শিশু চিকিৎসক ডা. হাফিজুর রহমান বলেন, শিশুকাল শারীরিক ও মানসিক বিকাশের শ্রেষ্ঠসময়।এমন সময় শিশুর পক্ষে উপযুক্ত নয় এমন কঠিন, বিপজ্জনক, ঝঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পরে তবে ওদের শারীরিক ওমানসিক গঠন বাধাগ্রস্ত হয়।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করতে গিয়ে শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে যায়। শিশুরকাশি, যক্ষা, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, হৃদরোগসহ, নানারকম স্কিন ডিজিজ এবং কিডনির জটিলতা এবং ফুসফুসের ক্যান্সার হতে পারে।

Comments

comments