ডিএনসিসি : সরকার ইসি যোগসাজশ

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিএনপি সিরিয়াস। কিন্তু আওয়ামী লীগ পান খায়, গান গায়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যেখানেই পরাজয়ের ভয় সেখানেই তারা নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করে। আবার জনগণ যদি বিরোধী কাউকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে, তবে ধরে নেওয়া যায় যে, তাকে জেলের ভাত খেতেই হবে। তার বিরুদ্ধে সাজানো হবে নানা ধরনের মামলা। এভাবে দেশের শত শত বিরোধীদলীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে সরকার জেলে পুরেছে। কেউ কেউ নিম্ন আদালত উচ্চ আদালত করে স্বপদে বহাল হয়েছেন। কেউ কেউ জেলে পচে মরছেন। অর্থাৎ এদেশের মানুষ নিজের পছন্দ মতো কাউকে ভোট দিতে পারবে না। বিরোধী দলের কাউকে নির্বাচিত করতে পারবে না। ভোট যদি দিতেই হয়, তাহলে তা দিতে হবে আওয়ামী লীগকেই। আওয়ামী নেতাদের ভাষ্য অনেকটা সে রকমই। অমুককে ক্ষমতায় আসতে দেয়া যাবে না। অমুককে ক্ষমতায় আসতে দেয়া হবে না। এই গৎ তারা গেয়েই চলেছেন।

এর মধ্যেও সামান্য ব্যতিক্রম যে হয়নি তা নয়। সকলেই সে ব্যতিক্রম হিসেবে কুমিল্লা ও রংপুর সিটি নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে থাকেন। সে এক কুমির ছানার মতো। কিন্তু রংপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জয় লাভ করেনি। জয় লাভ করেছেন জাতীয় পার্টি প্রার্থী। এখানেও আওয়ামী লীগ কিছুই হারায়নি। স্বৈরাচারী এরশাদ এখনও আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও সরকারের অংশীদার। ফলে যাহা বাহান্ন, তাহাই তিপ্পান্ন। কিন্তু রংপুর সিটি নির্বাচনের পর পর ১২২ টি স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে কার্যত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছে, রংপুর পরবর্তী নির্বাচনগুলো প্রহসনে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় ইসিকে শক্তিশালী হওয়া এবং নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা। সেসব নির্বাচনে ৫ জানুয়ারির মতোই আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা হয়েছে। প্রকাশ্যে সীল মারা হয়েছে। বালকেরা ভোট দিয়েছে। ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়েছে। আর নির্বাচন কমিশন ঠুঁটো জগন্নাথের মতো কেবল তাকিয়ে সে দৃশ্য দেখেছে। এসব কারণে নির্বাচন কমিশন কোনো একটি আসনে ভোট গ্রহণ স্থগিত করেছে, এমন শোনা যায়নি। যেন ফ্রি স্টাইল। এ ভোট কারচুপিকে নির্বাচন কমিশন সমর্থনই দিয়ে গেছে। কমিশনের কেউই্ ব্যাপারে মুখ খোলেনি। বলেননি যে নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। বলেননি এমন কাচুপিতে তারা কি কি ব্যবস্থা নিয়েছেন। অর্থাৎ লে হালুয়া।

এবার এসেছে ডিএনসিসি বা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। স্থানীয় সরকারের মধ্যে এ নির্বাচন বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং তা খোদ ঢাকায়। নির্বাচনে কতটা কারচুপি করা যাবে, এ ব্যাপারে সরকার এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। কিন্তু সবকিছু ঠিকঠাক সাজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সপ্তাহখানেক আগে শোনা গিয়েছিল তাদের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম আতিক। প্রধানমন্ত্রী নাকি তাকে কাজ করে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু তার দু’ তিন দিনের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলে বসলেন যে, আতিকুল ইসলাম আতিকের মনোনয়ন এখনও চূড়ান্ত হয়নি। কাকে মনোনয়ন দেয়া হবে তা জাানিয়ে দেয়া হবে। এই যে এত বড় একটা নির্বাচনের আয়োজন, কিন্তু সাড়াশব্দ যেন কম। নির্বাচন কমিশন টুকটাক যাই বলুক না কেন, ডিএনসিসি নিয়ে কোনো কথা বলছেন না। বললেও তাদের কথা যে কেউ শুনবে এমন কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার স্বার্থে নির্বাচন কমিশন ঢাকা উত্তরের কিছু ব্যাংক শাখাকে গত শনিবার খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলো সে নির্দেশ থোড়াই পরোয়া করেছে। কোনো ব্যাংক শাখা খোলা ছিল না। তাহলে ভবিষ্যতে এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার জন্য ভোট কারচুপিকার, ভোট জালিয়াত, ব্যালট বাক্স ছিনতাইকারী, ভীতি সঞ্চারকারী, পক্ষপাতদুষ্ট সরকারি কর্মকর্তা কারো বিরুদ্ধেই এই কমিশন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে মনে হয় না। তারা হা করে সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবে, হুজুর আদেশ করুন এখন কি করতে হবে।

আগামী ২৬ শে ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। ঐ দিন আরও ২৯টি কাউন্সিলর পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু এটা যে কমিশনের কত বড় ধোঁকা সেটা একটু খেয়াল করলে বোঝা যাবে। নির্বাচন কমিশন বলেছে, ১৮ই জানুয়ারি মনোনয়নপত্র জমা দানের শেষ দিন। এর চেয়ে চরম ফাজলামো আর কিছু হতে পারে না। ডিএনসিসির মেয়র পদে উপ-নির্বাচনের দিনই আরও ২৯টি কাউন্সিলর পদে নির্বাচন হবে। এগুলো নতুন ওয়ার্ড। আগে ইউনিয়ন ছিল, এখন ঢাকা উত্তরের সাথে অধিভুক্ত করা হয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এই যে, এই নবগঠিত ওয়ার্ডগুলোর সীমানা নির্ধারিত হয়নি। তার কোনো ভোটার লিস্টও তৈরি করা হয়নি। বলা হয়েছে, এই ২৯টি ওয়ার্ডে ভোটার লিস্ট প্রকাশ করা হবে আগামী ৩১ শে জানুয়ারি। নির্বাচন কমিশনের কূটকৌশলটা এখানেই। এখানেই ষড়যন্ত্রটা লুকিয়ে আছে। সরকারের সঙ্গে যোগসাজশে নির্বাচন কমিশন আসলে ডিএনসিসি নির্বাচন করতেই চায় না।

ধরা যাক আমি অধীভুক্ত নতুন ওয়ার্ডের একজন ভোটার এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই। কিন্তু আমার উপায়? ভোটার তালিকায় আদৌ আমার নাম আছে কিনা আমি জানি না। থাকলে কত নম্বর ভোটার আমি, তাও জানি না। আমি কাকে দিয়ে আমার নাম প্রস্তাব করাবো, তাও জানি না। কে হবেন আমার প্রার্থিতার সমর্থক তাও জানি না। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে বসেছেন। আমাকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে আগামী ১৮ জানুয়ারির মধ্যে আর ভোটার লিস্ট প্রকাশ করা হবে ৩১ শে জানুয়ারি। জনগণের সঙ্গে এমন কৌতুক নির্বাচন কমিশন আগে কখনো করেনি। এ কথা তো প্রথম থেকেই উঠেছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মহল গোড়া থেকে বলে আসছিলেন যে আগে ওয়ার্ডগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা হোক। তারপর ভোটার লিস্ট পূর্ণাঙ্গরূপে প্রকাশ করা হোক। তারপর মনোনয়নপত্র জমার তারিখ দেয়া হোক। কমিশন তাতে কর্ণপাত করেনি। তাতে তো কারো বোঝার বাকি থাকে না যে, কমিশন কী চায়।

আসলে কমিশন একটি আইনগত জটিলতার পথ এখানে খোলা রেখেছে যাতে যে কেউ আদালতে আবেদন করলে ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালতকে সম্ভবত এ নির্বাচনকে স্থগিত ঘোষণা করতে হবে। সরকারের ইচ্ছা পূরণ হবে। কমিশনেরও সরকারের দাসত্ব পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে। তাহলে এ প্রহসনের অর্থ কি ছিল? আমরা তো শুরুতেই বলেছি নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের তেমন কোনো তোড়জোড় নেই। আওয়ামী লীগ নিজে হয়তো কোনো মামলা করবে না। কিন্তু সংক্ষুব্ধ যে কোনো ব্যক্তি এই বলে একটি মামলা ঠুকে দিতে পারেন যে, নির্বাচন কমিশন তার নির্বাচিত হওয়ার অধিকার হরণ করে নিয়েছে। আসলেই তো নিয়েছে। আওয়ামী লীগ বলবে আমরা তো নির্বাচন চেয়েছি, আমরা তো নির্বাচন চাই। কিন্তু কেউ সংক্ষুব্ধ হলে আমাদের কি করার আছে। আদালত যা সিদ্ধান্ত নেবে তাই হবে। অর্থাৎ অনির্দিষ্টকালের জন্য ডিএনসিসি নির্বাচন পিছিয়ে যেতে বাধ্য।

তবে ডিএসসিসি নির্বাচন নিয়ে যত না কথা হচ্ছে তার চেয়েও অনেক বেশি কথা হচ্ছে একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে। নির্বাচন কমিশন বলার চেষ্টা করছে যে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে। সে ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশন কে এম নুরুল হুদা কাজী রকিবউদ্দিনের কমিশনের জুতায় পা গলিয়ে বসে আছেন। সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কমিশন কোনো উদ্যোগই নেয়নি। সরকার প্রশাসনকে নিজেদের অনুকূলে আনার জন্য এখন থেকেই ধারাবাহিকভাবে রদবদল চালিয়ে যাচ্ছে। নুরুল হুদা বলেছেন, আগামী অক্টোবর থেকে একাদশ সংসদ নির্বাচনের কাজ শুরু হবে। তার জন্য প্রয়োজন ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণ। সে কাজটিও বেশ বড়। কিন্তু তার জন্য কোথায়ও কোনো সাড়াশব্দ নেই।

সুশীল সমাজ ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যতই বলছেন যে, নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ করার জন্য সেনা মোতায়েন করা প্রয়োজন। কিন্তু এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন সে ব্যাপারে জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। এ ব্যাপারে তারা তাকিয়ে আছে সরকারের মুখের দিকে। বরং বিভিন্ন নির্বাচনে যখন সেনা মোতায়েনের দাবি উঠেছে, তখন নির্বাচন কমিশন বলেছে সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন নেই। যদি প্রয়োজন না থাকে তাহলে ১২২ টি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেন এত ব্যাপক কারচুপি হলো?

নির্বাচন কমিশনকে সংবিধানে প্রভূত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সেখানে কমিশন সরকারের ছক সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল আনতে পারে। কিন্তু তাতেও সংশয় দেখা দিয়েছে। সাধারণ ব্যাংক শাখা যদি নির্বাচন কমিশনের কথা না শোনে, তাহলে সরকারের মদদপুষ্ট দলীয় প্রভাবে প্রভাবান্বিত প্রশাসন কেন নির্বাচন কমিশনের কথা শুনবে। আমাদের তো ধারণা কমিশন সে পথে হাঁটবেই না। তাহলে কীভাবে কমিশন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করবে। নির্বাচনে কারচুপি সবটাই তো লোক দেখিয়ে হয় না। কখনো কখনো স্বাভাবিকভাবে ভোটারদের বুথে যেতে বাধা দিয়ে ভেতরে সমানে সীল দেয়া হয়। তারপর ভোটারদের ঢুকতে দেয়া হয়। সেখানে চলে সীল মারার হিড়িক। সেটা গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা দেখেছি। প্রিজাইডিং অফিসার থেকে শুরু করে পুলিশ কর্মকর্তারা ভোট গ্রহণ বন্ধ করে ভেতরে সীল মেরেছেন। তারপর ভোটারদের ভেতরে ডেকেছেন। জাতীয় নির্বাচনেও যে এমন নষ্ট কারচুপির ঘটনা ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? প্রধান নির্বাচন কমিশনের এক কথা। যে যাই বলুক, তিনি বলেন, এটা আমার দায়িত্ব না। সেনা মোতায়েন তার দায়িত্ব না। প্রশাসন পুনর্বিন্যাস তার দায়িত্ব না। লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা তার দায়িত্ব না। যেন তিনি একটি স্থির ডাকবাক্স।

যদি তাই-ই হয় তাহলে তো এই নির্বাচন কমিশনের কোনো প্রয়োজনই পড়ে না। সুতরাং নিঃসংশয়ে বলা যায়, অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দুর অস্ত।

Comments

comments