ফোরজি দিয়ে কী হবে

দেশে চতুর্থ প্রজন্মের নেটওয়ার্ক (ফোরজি) চালু হতে পারে আগামী মার্চ মাসের শেষ দিকে। এখনও নিলাম হয়নি, দেওয়া হয়নি লাইসেন্স, কেবল আগ্রহী অপারেটরগুলোর আবেদন জমা পড়েছে। অথচ এরই মধ্যে ফোরজি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে গেছে। অপারেটরগুলো মোটামুটি তৈরি এই সেবা চালু করতে।

শুধু তাই নয়, মোবাইল ফোন আমদানিকারকরাও এরই মধ্যে ফোরজি ফোন বাজারজাত করতে শুরু করেছে। ফোরজি নিয়ে বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও এত যে মাতামাতি চলছে, সেই ফোরজি আসলে কী, ফোরজি দিয়ে কী হবে— তা অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়।

জানতে চাইলে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যত দিন যাচ্ছে, মানুষ কিন্তু কথা বলার চেয়ে ডেটার (ইন্টারনেট) ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। পৃথিবীই এখন ডেটার ওপর পরিচালিত হচ্ছে। এখন ডেটা অনেক দামি, ধীরগতির। ইন্টারনেট থেকে কিছু ডাউনলোড করতে গেলে অনেক সময় লাগে। ফোরজি এলে এসব সমস্যা দূর হয়ে যাবে।’

আইটি শিল্পর উন্নতির পেছনে ডেটার ভূমিকা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এই যে আইটি-বেজড ইন্ডাস্ট্রি, তা কিন্তু ইন্টারনেটের ওপর ভিত্তি করেই গ্রো করে। যত বেশি গতি পাওয়া যাবে তত বেশি এই শিল্প খাত গ্রো করবে। ফোরজি এলে আমার মোবাইল ফোনে কোনও কনটেন্ট যত তাড়াতাড়ি ডাউনলোড করতে পারবো, এখন তো সেটা পারি না।’

বিটিআরসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘আমরা চিন্তা করছি ফাইভজিতে (পঞ্চম প্রজন্মের নেটওয়ার্ক) যাব। চারদিকে আইওটি’র (ইন্টারনেট অব থিংস) ব্যবহার যেমন বাড়ছে, আমাদেরও এসব প্রযুক্তির দিকে যেতেই হবে।’ উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে টেলিকম সেক্টরে যে অগ্রগতি হয়েছে, তার সবকিছু অনুসরণ করে আমাদের দেশকে উন্নত করতে হবে। পর্যায়ক্রমে আমরা সেদিকে যাচ্ছিও।’

জানা যায়, লং টার্ম ইভোল্যুশনকেই (এলটিই) চতুর্থ প্রজন্মের নেটওয়ার্ক বা ফোরজি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই নেটওয়ার্কে সেকেন্ডে ২ মেগাবাইট থেকে ৪০ মেগাবাইট পর্যন্ত গতিতে তথ্য আদান-প্রদান করা যাবে। ফোরজি হলো ইন্টারনেট গতির ক্ষেত্রে বড় একটি পর্যায়। তাত্ত্বিকভাবে এর ডাউনলোড গতি ১০০ এমবিপিএস থেকে ১ জিবিপিএস পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে যে নেটওয়ার্ক সেকেন্ডে কমপক্ষে ২০০ কিলোবাইট তথ্য স্থানান্তর করতে পারে সেটাই থ্রিজি নেটওয়ার্ক। থ্রিজিতে অনলাইন টিভি, হাই ডেফিনেশন ভিডিও, ভিডিও কলিং, ভিডিও গেমসগুলো ডেভেলপ হয়েছে। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, একজন থ্রিজি ব্যবহারকারী ইন্টারন্টে সেকেন্ডে ১৪ মেগাবাইট গতি পেলে তিনিই ফোরজিতে ১ জিবিপিএস পর্যন্ত গতি পাবেন।

এ বিষয়ে বিটিআরসির এক মহাপরিচালক নিজেকে উদ্ধৃত না করে জানান, ফোরজি এলে ব্যান্ডউইথের সক্ষমতা বাড়বে। ফলে মোবাইল ইন্টারনেটে গতিও অনেক বাড়বে। সেই সঙ্গে মোবাইল ফোনের সেবার মান (ভয়েস ও ইন্টারনেট) অনেক ভালো হবে।

তিনি বলেন, ‘ওটিটি (ওভার দ্য টপ) সেবা তথা যোগাযোগভিত্তিক অ্যাপগুলোর কোয়ালিটি অব সার্ভিস অনেক ভালো হবে। ভাইবার, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য অ্যাপে কথা আরও পরিষ্কার শোনা যাবে, ছবি হবে ঝকঝকে। টেলিমেডিসিন সেবা আরও উন্নত হবে। যেকোনও যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও দ্রুত গতির হবে। অনলাইনভিত্তিক সরকারি সেবাগুলোও আরও ভালোভাবে পাওয়া যাবে বলে তিনি মনে করেন।’ যেকোনও কিছু দ্রুত ডাউনলোড করা ও অ্যাকসেস করার ক্ষেত্রে সময় অনেক বেঁচে যাবে বলেও তিনি মনে করেন।

এছাড়া মোবাইল ওয়েব সেবা, আইপি টেলিফোনি, গেমিং সেবা, এইচডিটিভি, হাই-ডেফিনেশন মোবাইল টিভি, ত্রিমাত্রিক টেলিভিশন (থ্রিডি টিভি)এবং ক্লাউড কম্পিউটিং সেবা পাওয়া যাবে ফোরজির মাধ্যমে।

গত ২৯ নভেম্বর সচিবালয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ঘোষণা দেয়, নতুন বছরে দেশবাসীর জন্য উপহার হতে যাচ্ছে ফোরজি। ফোরজি সেবার সংশোধিত গাইডলাইনে প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দেওয়ার পরেই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এই ঘোষণা দেয়। সে সময় ঘোষণা দেওয়া হয়, ফোরজির গতি হবে ২০ এমবিপিএস (মেগাবাইট পার সেকেন্ড)। যদিও ফোরজির গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড ১৬ এমবিপিএস।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ফোরজির গতি শুরুতে এত হবে না। একটা স্ট্যান্ডার্ড মান নিয়ে যাত্রা শুরু করব। হয়তো পর্যায়ক্রমে গতি বাড়বে।’ তবে ২০ এমবিপিএস পর্যন্ত গতি পৌঁছাবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন ওই কর্মকর্তা।

জানা যায়, ফোরজির ডাউনলোড গতি ১ এমবিপিএস থেকে শুরু করে এর ১ হাজার ২৪ গুণ, অর্থাৎ ১ জিবিপিএস পর্যন্ত হতে পারে। এর আগে দেশে থ্রিজি চালু হলেও এর কোনও গতি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। এ কারণেই সমস্যা এড়াতে এবার আগে থেকেই ফোরজি’র গতি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে, জাতীয় ব্রডব্যান্ড নীতিমালা-২০০৯ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত নীতিমালায় এর গতি তিন বার পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রথমবার (২০০৯ সালে) ব্রডব্যান্ডের ন্যূনতম গতি ছিল ১২৮ কেবিপিএস, দ্বিতীয়বার গতি নির্ধারণ করা হয় ১ এমবিপিএস, তৃতীয়বার তা ৫ এমবিপিএসে এসে দাঁড়ায়। ফলে ফোরজির গতি কোথা থেকে শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মোবাইল অপারেটরগুলো এরই মধ্যে ফোরজি’র জন্য নিজেদের নেটওয়ার্ক সেটআপের কাজ শেষ করেছে। একাধিক মোবাইল ফোন অপারেটর ফোরজির পরীক্ষামূলক অপারেশন চালিয়ে সফলতাও পেয়েছে। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি অপারেটরগুলো লাইসেন্স পেলে কারিগরি পরীক্ষা সম্পন্ন করে মার্চ শেষ নাগাদ ফোরজি সেবা চালু করতে পারবে বলে বিটিআরসি কর্তৃপক্ষ আশা করছে।

Comments

comments