ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচন: পানামা-প্যারাডাইসে নাম উঠে আসা কাউকে প্রার্থী চায় না ২০ দলীয় জোট নেতাকর্মীরা

বিদেশে অর্থ পাচার ও বিনিয়োগের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন পাকিস্তানের নওয়াজ শরীফ। পানামা পেপারস-এ নাম উঠে এসেছিল নওয়াজ শরীফ পরিবারের। পানামা ভিত্তিক আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকার অফসোর কোম্পানীতে বিনিয়োগকারীদের নথি ফাঁস করে দেয়। পানামা প্যাপারস নামে খ্যাত আলোচিত এই নথিতে বাংলাদেশের একাধিক রাজনৈতিক পরিবারের নামও উঠে এসেছিল। তাদের কিছু না হলেও ঠিকই পদ ছাড়তে হয়েছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল পানামা পেপারস। সব কিছু তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ২৮ জুলাই পদত্যাগ করেন নওয়াজ শরীফ। পানামা পেপারসে নওয়াজ পরিবারের ৪ সদস্যের নাম উঠে আসে।

পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে নওয়াজ শরীফের পদ যাওয়া নিয়ে যখন হৈ চৈ তখনই প্রকাশিত হয় প্যারাডাই পেপারস। এতে বাংলাদেশের রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী আবদুল আওয়াল মিন্টু পরিবারের নাম প্রকাশ পায়। কর ফাঁকি দিয়ে যারা বিদেশে বিভিন্ন কোম্পানীতে বিনিয়োগ করেছেন তাদের নামই উঠে আসে ফাঁস হওয়া পানামা পেপারস ও প্যারাডাইস পেপারস-এ। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিগত নির্বাচনে আবদুল আওয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিদ আওয়াল ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তাঁর নাম এবার উঠে এসেছে প্যারাডাইস পেপারসসে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে বিজয়ী আরেক ব্যবসায়ী আনিসুল হক ইন্তেকাল করেছেন। এতে এই সিটি কর্পোরেশনে উপনির্বাচন এখন অনিবার্য্য। প্রশ্ন উঠেছে পানামা পেপারসে নাম উঠে আসায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে পদত্যাগ করতে হল। প্যারাডাইস পেপারসে নাম উঠে আসার পরও কি তাবিদ আওয়াল আবারো ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হবেন!

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপার্সনসহ দলের সিনিয়র নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারনে অন্য কাউকে পাত্তাই দিতে চান না তাবিদ আওয়াল। বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করে বের হয়ে যাওয়ার সময় কারো দিকে থাকান না তিনি। উপস্থিত নেতা-কর্মীরা সামাল দিলে সেটাও পাত্তা দেন না দলে নবাগত এই নেতা। বিএনপি’র একাধিক অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা জানান, তাবিদ আওয়াল কারো ফোন রিসিভ করেন না। এমনকি দলীয় প্রয়োজনে কথা বলার জন্যও তাঁকে কখনো খুজে পাওয়া যায় না। নেতাদের প্রশ্ন হচ্ছে যিনি দলের কর্মীদের সালাম পর্যন্ত গ্রহন করেন না, নেতাদের ফোন রিসিভ করেন না তাঁকেই কি উপ-নির্বাচনে আবারো মনোয়ন দেবে দল? এই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে।

অপরদিকে দলীয় মনোয়ন ঘোষণার পর তাঁকে মনোনয়ন দিলে প্যারাডাইস পেপারস আবারো গণমাধ্যমে সামনে চলে আসবে। এনিয়ে যথাযথ তদন্ত শুরু হলে ফেঁসে যেতে পারেন তাবিদ আওয়ালসহ মিন্টু পরিবার। নির্বাচনে এটাকে ইস্যু বানিয়ে কাজে লাগাতে চাইবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তখন কথা উঠবে এসব জেনেও কেন তাঁকে আবার উপ-নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হল!

বিগত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগে তাবিদ আওয়াল ছিলেন রাজনীতিতে একেবারেই অপরিচিত মুখ। মেয়র নির্বাচনে প্রার্থীতা তাঁকে পরিচিতি এনে দেয় রাজনীতিতে। ২০ দলীয় জোট নেতাকর্মীদের প্রশ্ন হচ্ছে ক্লিন ইমেজের কোন ব্যক্তিকে প্রার্থী হিসাবে খুজে বের করে মনোনয়ন দিলে ক্ষতির কি আছে? তাবিদ আওয়াল যদি অপরিচিত মুখ হিসাবে প্রার্থী হয়ে পরিচিতি পেতে পারেন ক্লিন ইমেজের একজন হলে তিনিও পরিচিতি লাভ করবেন প্রার্থীতার মাধ্যমে।

আওয়ামী লীগ এবারও আনিসুল হকের মত একজন ব্যবসায়ীকে প্রার্থী দিতে যাচ্ছেন এমন খবর প্রচারিত হচ্ছে। বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলামের নাম জোরে শোরেই শোনা যাচ্ছে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে। গতকাল তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখাও করেছেন। ব্যবসায়ী মহলে আতিকুল ইসলাম সুপরিচিত মুখ। তবে রাজনীতিতে তাঁর তেমন পরিচিতি নেই। তাই তাঁর নামে তেমন কোন দুর্নাম সহজে খুজে বের করা যাবে না। আওয়ামী লীগ দুর্ণাম বিহীন প্রার্থী খুজছে আগামী উপ-নির্বাচনে।

শীর্ষ নেতৃত্বের আশির্বাদই রাজনৈতিক পরিচিতি:

অতীতে দেখা গেছে শীর্ষ নেতৃত্বের আশির্বাদই রাজনৈতিক পরিচিতি সোপান হিসাবে কাজ করে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মরহুম আনিসুল হক প্রার্থী হওয়ার আগে রাজনীতিতে অপরিচিত মুখ ছিলেন। সফল ব্যবসায়ী এবং টিভি উপস্থাপক হিসাবে তাঁর পরিচিতি ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচিতি তেমন ছিল না। শেখ হাসিনার আশির্বাদে মনোনয়ন পান সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। হয়ে উঠে রাজনৈতিক পরিচিত মুখ। সুতরাং আনিসুল হকের বিকল্প হিসাবে আওয়ামী লীগ গার্মেন্টস শিল্পে ব্যবসায়ী আতিকুল ইসলামও শেখ হাসিনার আশির্বাদ পেলে রাজীতিক পরিচিতি লাভ করতে সময় লাগবে না।

একই ভাবে তাবিদ আওয়ালের নামই কেউ জানত না। রাজনীতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পদচারনায়ও তাঁকে কোথায়ও দেখা যায়নি। বাবা আদুল আওয়াল মিন্টু ব্যবসার পাশাপাশি রাজনীতিতে আছেন। সেই সুবাদে তিনি আবদুল আওয়াল মিন্টুর ছেলে হিসাবে প্রথম পরিচিতি পায়। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার আশির্বাদে মেয়র প্রার্থী হওয়ার পর রাজনৈতিক পরিচিতি লাভ করেন তাবিদ আওয়াল। বিগত নির্বাচনে আনিসুল হক পেয়েছিলেন ৪ লাখ ৬০ হাজার ১১৭ ভোট।

দুপুরের মধ্যেই নির্বাচন বর্জন ঘোষণা দেওয়ার পরও তাবিদ আওয়াল পেয়েছিলেন ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০ ভোট। তাবিদ ও তাঁর পিতা আবদুল আওয়াল মিন্টুর পরিচয়ে এই ভোট আসেনি। ভোট ছিল সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের বহি:প্রকাশ। এজন্যই নেতা কর্মীদের দাবী হচ্ছে সকলের প্রতি সজ্জন এবং ক্লিন ইমেজের একজন প্রার্থী খুজে বের করা। যিনি চেয়ারপার্সনের রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় অন্তত হাসমুখে কর্মীদের সালাম গ্রহন করবেন। নেতারা ফোন করলে ব্যস্ততায় রিসিভ করতে না পারলেও পরবর্তীতে ব্যাক করে খোজ নেবেন। প্যারাডাইস পেপারসের দায় মনোনয়নের মাধ্যমে দলের কাঁধে উঠিয়ে নেবে না এটাই চায় দলীয় নেতাকর্মীরা।

Comments

comments