পুলিশ হেফাজতে চোখ উৎপাটন, মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছে পুলিশ

পুলিশের বর্বর নির্যাতনে দু’চোখ হারানো শাহজালাল (ফাইল ফটো)

খুলনা : খুলনায় পুলিশের বিরুদ্ধে দুই চোখ উৎপাটনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে আসামিদের অব্যাহত হুমকির মুখে চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন অন্ধ শাহ জালাল এবং তার পরিবারের সদস্যরা।

এজাহারভুক্ত আসামি খালিশপুর থানার ওসিসহ অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের থানা থেকে প্রত্যাহার না করায় মামলা তুলে নেয়ার জন্য অর্থের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। যেকোনো সময় আসামিরা জীবননাশসহ তাদের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা।

শনিবার (৬ জানুয়ারি) দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করা হয়।

এসময় শাহজালালের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান অ্যাডভোকেট ইশ্বর চন্দ্র সানা। একইসঙ্গে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) -এর তদন্ত রিপোর্টও দ্রুত দাখিল এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, মামলার সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে এজাহারভুক্ত আসামি খালিশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাসিম খানসহ অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের থানা থেকে প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষ তাদের প্রত্যাহার না করায় মামলাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত,তদন্তকাজে প্রভাব বিস্তার এবং মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত তারা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ওসি নাসিম খান ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য অর্থের প্রলোভন দিচ্ছেন।তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, পুলিশ কর্মকর্তাদের চাপের কারণে পিবিআইও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে সময় ক্ষেপণ করছে। এমনকি মামলা দায়েরের পর পুলিশের ইন্ধনে শাহজালালের বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

সংবাদ সম্মেলনে দু’চোখ হারানো শাহজালাল বলেন,‘ওসি নাসিম খান এবং তার পুলিশ বাহিনী আর্থিক লালসার জন্য আমাকে পৃথিবীর আলো দেখা থেকে চিরদিনের জন্য বঞ্চিত করেছেন। দু’টি চোখ উপড়ে ফেলে আমার ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিয়েছেন। চোখ হারিয়ে বর্তমানে আমি মানবেতর জীবন-যাপন করছি।’ মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আসামিদের হুমকিতে পরিবার-পরিজনসহ চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলেও জানান শাহজালাল।

আসামিদের দ্রুত থানা থেকে প্রত্যাহার এবং দ্রুত পিবিআই’র তদন্ত রিপোর্ট দাখিলের জন্য সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপিসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। এসময় শাহজালালের বাবা জাকির হোসেন, মা রেনু বেগম এবং শিশু সন্তানসহ স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত,পুলিশের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০১৭ সালের ১৮ জুলাই নয়াবাটি রেললাইন বস্তি কলোনির বাসা থেকে তিনি রাত আটটায় মেয়ের দুধ কেনার জন্য দোকানে যান। এ সময় খালিশপুর থানার ওসি নাসিম খানের নির্দেশে তাকে থানায় ডেকে নেওয়া হয়। বিষয়টি জানতে পেরে পরিবারের সদস্যরা থানায় গিয়ে হাজির হন। তখন ওসি শাহজালালকে ছাড়ানোর জন্য পরিবারের সদস্যদের কাছে দেড় লাখ টাকা দাবি করেন। তার দাবি অনুযায়ী টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ কর্মকর্তারা শাহজালালকে গাড়িতে করে বাইরে নিয়ে যান।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়,পরদিন ১৯ জুলাই খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে তাকে দু’টি চোখ উপড়ানো অবস্থায় দেখতে পান স্বজনরা। তখন শাহজালাল পরিবারের সদস্যদের জানান, পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গাড়িতে করে গোয়ালখালি হয়ে বিশ্ব রোডের (খুলনা বাইপাস সড়ক) একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে তার হাত-পা চেপে ধরে এবং মুখের মধ্যে গামছা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এরপর স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে দু’টি চোখ উপড়ে ফেলা হয়।

এ ঘটনায় শাহজালালের মা রেনু বেগম বাদী হয়ে ৭ সেপ্টেম্বর খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিমের আমলী আদালতে মামলা দায়ের করেন। টাকা দাবি করে না পেয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে তার ছেলে শাহজালালের দু’টি চোখ উপড়ে ফেলে বলে অভিযোগ করা হয়। মামলায় খালিশপুর থানার ১১ পুলিশ ও আনসার কর্মকর্তাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়।

আসামিরা হচ্ছেন- খালিশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাসিম খান, এসআই রাসেল, এসআই তাপস রায়, এসআই সেলিম মোল্লা, এসআই মিজান, এসআই মামুন, এসআই নূর ইসলাম ও এএসআই সৈয়দ সাহেব আলী, আনসার সদস্য (সিপাই) আফসার আলী, আনসার ল্যান্স নায়েক আবুল হোসেন, আনসার নায়েক রেজাউল এবং অন্য দু’জন খালিশপুর পুরাতন যশোর রোড এলাকার সুমা আক্তার ও শিরোমনি বাদামতলা এলাকার লুৎফুর হাওলাদারের ছেলে রাসেল।

Comments

comments