ফিরে দেখা ২০১৭: আলোচনায় মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা

মিয়ানমারের সরকার দাবি করে রাখাইন রাজ্যে দেড়শোর মতো মুসলিম জঙ্গি এক যোগে বিভিন্ন পুলিশ স্টেশন, সীমান্ত ফাঁড়ি এবং সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর পর অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছে। মিয়ানমারের নেত্রী অন্য সান সু চির অফিস থেকে বলা হয়, নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ জন সদস্য রয়েছে।

এই খবর যখন সংবাদমাধ্যমের প্রচার হচ্ছিল তখনো ধারণা করা যায় নি, এর পরবর্তী প্রভাব কী হতে পারে।

একই দিন মিয়ানমার বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা টেকনাফের নাফ নদী দিয়ে রোহিঙ্গারা প্রবেশের চেষ্টা করে, এবং বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয় তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং কোনভাবেই রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেবে না।

প্রথম কয়েক দিন বাংলাদেশ সীমান্ত বাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি করলেও পরে তাদের প্রবেশ করতে দেয়। এর পর থেকেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।

শুরু হয় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে স্রোতের মত রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে প্রবেশ। নাফ নদী পার হয়ে ছোট ছোট নৌকায় তারা আসতে থাকেন দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা জুরে। হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠী আশ্রয় নেয় বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বের জেলা কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায়। তার মধ্যে টেকনাফ এবং উখিয়া অন্যতম।

নারী, পুরুষ, শিশু দিনের পর দিন পায়ে হেটে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আসতে থাকে । সবার মুখে নির্যাতনের ভয়াবহ গল্প। টেকনাফের কুতুপালং ক্যাম্পে মিয়ানমার থেকে আসা আলমাস খাতুন বলছিলেন, “আমার স্বামী এবং একমাত্র ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এরপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের ধরে নিয়ে গেছে। আমি জানি না আদৌ তারা বেচে আছে না মারা গেছে”।

রাখাইন রাজ্য থেকে আসা আরেক জন নারী বলছিলেন, “আমার স্বামী আর তিন ছেলেকে আমার সামনেই হত্যা করা হয়েছে। দুইটা ছেলে পালিয়ে যাওয়ার সময় পিছন থেকে গুলি করা হয়। সেখানেই মৃত্যুর কোলে লুটিয়ে পরে তারা”।

অনেক নারী অভিযোগ করেন তাদের ধর্ষণ করা হয়েছে। নারীদের কি নৃশংস ভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তার বর্ণনা দিচ্ছিলেন মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা মো. ইলিয়াস।

তিনি বলছিলেন, “আমরা যখন পালিয়ে আসি তখন একজন নারীকে আমি ধর্ষিত হতে দেখেছি। কোলে তার শিশু সন্তান ছিল। পরে ঐ নারীর অর্ধপোড়া মরদেহ আমি দেখতে পাই আরো ৫ টি মরদহের সাথে”।

অগাস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হয়। কিন্তু কারো ধারণা ছিল না কতদিন ধরে তারা বাংলাদেশে আসা অব্যাহত রাখবেন বা সংখ্যায় কি পরিমাণে আসবেন!

দেশ-এবং বিদেশের নানা দেশকে হতবাক করে দিয়ে দেখা গেল কয়েক লক্ষ মানুষ প্রবেশ করেছে টেকনাফ এবং উখিয়াতে।

তাদের আশ্রয়, খাদ্য,বস্ত্রের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে লাগলো স্থানীয় প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো। এক পর্যায়ে শুরু হয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গার তালিকা তৈরির কাজ।

উখিয়ার তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাইনুল বলেন, “রোহিঙ্গাদের তালিকা করা হবে বাংলাদেশিদের সাথে যাতে করে তারা মিশে না যায়। তাদের ফেরত পাঠানোর সময় এটা কাজে দেবে।তবে অবশ্যই বিষয়টা বেশ কঠিন”।

ত্রাণসংস্থাগুলো যখন হিসেব দিচ্ছিল সাড়ে তিন লক্ষের মত মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তখন সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মত টেকনাফে যান পরিস্থিতি দেখতে।

রোহিঙ্গাদের প্রবেশের ক্ষেত্রে বরাবরই বাংলাদেশ সরকার কঠোর অবস্থানে ছিল বলে দাবি করা হয়েছে, কিন্তু টেকনাফে প্রধানমন্ত্রীর সফর পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। সেখানে তিনি বলেন মানবিকতার করার কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদেরকে মিয়ানমারের ফিরে যেতে হবে। একই সাথে আন্তর্জাতিক মহলকে মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য আহ্বান জানান।

এর ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মত ঢাকায় দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হয়। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির দপ্তরের মন্ত্রী কিউ টিন্ট সোয়ে’র সাথে বৈঠক করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী।

মিয়ানমার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব করেছে বলে জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী। মি. আলী বলেন প্রত্যাবসন প্রক্রিয়ার সার্বিক তত্বাবধানের জন্য দুই পক্ষ একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে।

নভেম্বরের ১৭ তারিখে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর জোট ওআইসি’র আহবানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে ভোটাভুটির আয়োজন করে জাতিসংঘ। এতে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক অভিযান বন্ধের প্রস্তাব পাশ হয়। সেই ভোটাভুটিতে চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারের পক্ষে ভোট দেয়। ভারত ও জাপান ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে।

নভেম্বরের শেষ দিকে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ সফরে আসেন পোপ ফ্রান্সিস । তিনি এমন এক সময়ে এই দুই দেশ সফর করেন যখন রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহল সরগরম। স্বাভাবিকভাবেই নজর ছিল রোহিঙ্গা ইস্যুতে তিনি কী বলেন সেটা দেখার জন্য।

কিন্তু তিনি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করেন নি। অনেকে হতাশ হন। এরপর ৩০শে নভেম্বরের বাংলাদেশে আসেন তিনি। পহেলা ডিসেম্বরে ঢাকায় খৃস্টানদের প্রধান গির্জা বিশপ হলে তিনি প্রথমবারের মত রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেন।

আন্তর্জাতিক ত্রাণসংস্থাগুলো বলছে ২৫শে অগাস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষের বেশি রোহিঙ্গা মুসলমানরা আশ্রয় নিয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার তাদের টেকনাফের উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে রেখেছেন। তবে নানাভাবে আলোচনা চলছে কিভাবে, কি প্রক্রিয়ায় তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়। রোহিঙ্গা ইস্যুটি ২০১৭ সালের শেষ চারমাস আগে শুরু হয়, যেটা সারা বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তবে এর সমাধানের প্রক্রিয়া ২০১৮ সালে ও অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা যায়।

Comments

comments