বদলে যাওয়া এক দেশের গল্প

ভ্রমণ : সিঙ্গাপুর

বাংলাদেশের কাছাকাছি সময়ে স্বাধীন হওয়া এক দেশ সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালে। আর ৬৩টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত সিঙ্গাপুর স্বাধীন হয় ১৯৬৫ সালে। এক লাখ ৪৭ হাজার ৬৫০ বর্গকিলোমিটারের বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটিরও বেশি। আর ৭১৬ বর্গকিলোমিটারের সিঙ্গাপুরে বাস করে প্রায় ৫৫ লাখ মানুষ। সমসাময়িক সময়ে স্বাধীন হলেও বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় এক হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার বা এক লাখ ৩৫ হাজার ২৪০ টাকা। অথচ সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় ৪৬ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। বাংলাদেশের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের সমারোহ নেই সিঙ্গাপুরে। আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশের ঢাকা জেলার চেয়ে ছোট হলেও এশিয়ার ধনী দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে আছে সিঙ্গাপুর। বিশ্বব্যাংকে তাদের রিজার্ভ জাপান এবং চীনের চেয়েও বেশি।

ফোর্বস ও উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশের মতোই ভাঙাচোরা রাস্তা, নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন, অশিক্ষা ও দরিদ্রতা সঙ্গী ছিল সিঙ্গাপুরের। দুর্নীতি ও অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যের তকমাও ছিল তাদের গায়ে। অথচ স্বাধীনতার মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে নিজেদের আমূল বদলে ফেলেছে তারা। এখন বিশ্বের সবচেয়ে কম অপরাধপ্রবণ রাষ্ট্রের তালিকায় সিঙ্গাপুর আছে দ্বিতীয় স্থানে। আবার সবচেয়ে বেশি বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় জেনেভা আর জুরিখের পরেই তৃতীয় স্থানে আছে ছোট এ দ্বীপ রাষ্ট্রটি।

সিঙ্গাপুরে নাগরিকত্ব পাওয়া বাংলাদেশি ও সিঙ্গাপুর কার্গো শিপ প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক ক্যাপ্টেন শওকত আলী জানান, প্রকৃতির ভয়ানক থাবায় ক্রমশ ভাঙছে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূল। আর সমুদ্রতলের মাটি, পর্বত ও অন্যান্য দেশ থেকে মাটি সংগ্রহ করে ক্রমশ বড় হচ্ছে সিঙ্গাপুর। ১৯৬০-এর দশকে দেশটির আয়তন ছিল প্রায় ৫৮২ বর্গকিলোমিটার। এখন সেটি ৭১৬ বর্গকিলোমিটার। ২০৩৩ সাল নাগাদ এর পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে আরও ১০০ বর্গকিলোমিটার।

সিঙ্গাপুর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে আলাদা হয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে মিলে রাষ্ট্র্র গঠন করে ১৯৬৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। ২ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে, ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট তারা এক রক্তপাতহীন চুক্তির মাধ্যমে মালয়েশিয়া থেকে আলাদা হয়ে নিজস্ব রাষ্ট্র গঠন করে। সেই থেকে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার পার্শ্ববর্তী দেশ সিঙ্গাপুরে প্রতি বছর ৯ আগস্ট জাতীয় দিবস পালিত হয়।

ইন্টারনেটে দেবার্ণব রায়ের একটি নিবন্ধ সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকেই সিঙ্গাপুরে একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায়। দলটির নাম পিপলস অ্যাকশন পার্টি, যা সংক্ষেপে পিএপি নামে পরিচিত। লি কুয়ান ইয়ু, যাকে আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক বলা হয় তিনি এই দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৬৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি একটানা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তারপরে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন গোহ চক তং। ২০০৪ থেকে ক্ষমতা নেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং, যিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও সিঙ্গাপুরের জনক লি কুয়ান ইউদর পুত্র।

সুনামের পাশাপাশি বদনামও আছে সিঙ্গাপুরের। এখানে গণতন্ত্র আছে আঁতুড়ঘরে। সিঙ্গাপুরে বিরোধী দলকে সংগঠিত হতে দেওয়া হয় না। সিঙ্গাপুরের অসাধারণ উন্নয়নের জন্য লি কুয়ান ইউ যেমন সারাবিশ্বে বিখ্যাত তেমনি বিরোধী নেতাকর্মীদের নানাভাবে জেলে আটকে রাখা, কূটকৌশলে ঋণখেলাপি করা ইত্যাদি কারণে তিনি সমালোচিতও।

মজার তথ্য হচ্ছে সিঙ্গাপুরে ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক। না দিলে আছে জরিমানার ব্যবস্থা। আর প্রত্যেকের ব্যালট পেপার নির্বাচনের আগের দিন ন্যাশনাল কার্ড নাম্বারসহ ভোটারের বাসার ঠিকানায় ডাকযোগে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাসা থেকে সিল মেরে, কেন্দ্রে এসে শুধু সিল মারা ব্যালট পেপারটা জমা দিলেই হয়। যেহেতু ব্যালটে ন্যাশনাল কার্ড নাম্বার থাকে, তাই এটা সহজেই বের করা সম্ভব কে কাকে ভোট দিয়েছে। বাংলাদেশে গোপন ব্যালটে ভোট দিয়ে ‘আমার ভোট আমি দিব যাকে খুশি তাকে দিব’ স্লোগান কার্যকর থাকলেও পুরো বিপরীত চিত্র যেন সিঙ্গাপুরে। এ কারণে ইচ্ছা থাকলেও সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা বিরোধী দলকে ভোট দিতে চিন্তা করে শতবার।

সিঙ্গাপুরের স্থায়ী নাগরিকদের ৮৭ ভাগেরই নিজস্ব বাড়ি আছে, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ বাড়ি মালিকানার হার। তবে গাড়ি কিনতে হলে সরকারকে কর দিতে হয় প্রায় ৭৫ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার, যা বাংলাদেশের মুদ্রামানে হয় প্রায় ৪৪ লাখ টাকা। গাড়ি কিনতে সরকারকে এমন ট্যাক্স দেওয়ার হার বিশ্বে সর্বোচ্চ।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, সিঙ্গাপুরের নিজস্ব কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা নেই। পুরো বিদ্যুৎ আমদানি করা হয় মালয়েশিয়া থেকে। তারপরও এখানে কোনো লোডশেডিং নেই। মোট প্রয়োজনীয় পানিরও ৫০ ভাগ আমদানি করা হয় মালয়েশিয়া থেকে। আর বাকি ৫০ ভাগ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করে তারা। প্রয়োজনীয় খাদ্যেরও প্রায় ৯৭ ভাগ আমদানি করতে হয় সিঙ্গাপুরকে। কারণ সিঙ্গাপুরে কৃষি জমি খুবই কম। হাতেগোনা কয়েকটি হাঁস-মুরগি, মাছের খামার, উচ্চপ্রজাতির ঘাস চাষ ছাড়া কৃষিকাজ করার তেমন কোনো সুযোগও নেই এখানে।

সিঙ্গাপুর ভ্রমণের সময় কথা হয় সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিপিং কোম্পানি পাইওনিয়ার শিপিং এজেন্সির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল খালেক পারভেজের সঙ্গে। তিনি জানান, সিঙ্গাপুরের আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে রফতানি ও বন্দর। ইলেকট্রনিকস, রাসায়নিক এবং সেবা জাতীয় পণ্য রফতানি করে তারা। তবে সিঙ্গাপুরের পোর্ট হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বন্দর। পেশাদার সেবা এবং দক্ষ কর্মশক্তির কারণে অনেক জাহাজ এ বন্দর ব্যবহার করে। জাহাজ ভাঙা শিল্পও সুদৃঢ় করছে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি। দেশীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ব্যতিক্রমী কৌশল আছে সিঙ্গাপুর সরকারের। পরিবহন খাত, আবাসন খাত, শপিং মল, পার্ক ও বন-জঙ্গল সরকার নিজে উৎপাদনমুখী করে জনগণের কাছে বিক্রি বা ভাড়া দেয়। সিঙ্গাপুরে মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ অন্য দেশের হলেও জাতীয় অর্থনীতি বিনির্মাণে সমান অংশ নিতে হয় তাদেরও। তাই সিঙ্গাপুরের অর্থনীতিকে বিশ্বের সবচেয়ে মুক্ত অর্থনীতি বলা হয়। যেসব দেশে ব্যবসা চালু করা সবচেয়ে সহজ তার একটি জরিপে সম্প্রতি প্রথম হয়েছে সিঙ্গাপুর। যেসব দেশের অর্থনীতি সবচেয়ে দুর্নীতিমুক্ত সেসব দেশের তালিকায়ও সিঙ্গাপুর আছে সপ্তম স্থানে। আর সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে এ দ্বীপ রাষ্ট্রের অবস্থান তৃতীয় স্থানে।

বাংলাদেশকে অপরূপ সাজে সাজিয়ে রেখেছে প্রকৃতি। আর সিঙ্গাপুরকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে রেখেছে প্রযুক্তি। সিঙ্গাপুর দেখতে আসা ডায়মন্ড সিমেন্টের পরিচালক আজিম আলী বলেন, ‘পৌনে সাতশ বর্গ কিলোমিটারের ছোট্ট সিঙ্গাপুরকে সাজানো হয়েছে একেবারে পরিপাটি করে। কৃত্রিম পার্ক স্যান্টোসাতে গিয়ে ক্যাবল কারে চড়ে এক নজরে দেখা যায় পুরো সিঙ্গাপুরকে।’ সমুদ্র বন্দরের জন্যও আদর্শ স্থান সিঙ্গাপুর। আবার চিকিৎসা শাস্ত্রেও আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে এ দ্বীপ রাষ্ট্রটি। দর্শনীয় স্থান মাদাম তুসোর মোমের জাদুঘর, নাইট সাফারি, মেরিনা বে, মার লায়ন পার্কে গেলে লেগে থাকে বিস্ময়ের ঘোর। পর্যটনের শহর সিঙ্গাপুর দিনে থাকে একরূপ। আর রাতে হয় অপরূপ। এ জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে বাংলাদেশ থেকেও অনেক পর্যটক ছুটে যান সিঙ্গাপুরে। প্রতিবছর সিঙ্গাপুর ভ্রমণে আসা এমন পর্যটকের সংখ্যা দেড় কোটির ঘর ছাড়িয়ে যায় বলে জানান ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নিয়মিত সিঙ্গাপুর আসা ডায়মন্ড সিমেন্টের পরিচালক লায়ন হাকিম আলী।

Comments

comments