বগুড়ার তুফান সরকারের ‘বাবা’ সামছুদ্দিন শেখ

তুফান সরকার ও সামছুদ্দিন শেখ

কিশোরীকে ধর্ষণ এবং পরে সেই কিশোরী ও তার মায়ের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার ঘটনার পর বগুড়ার আলোচিত তুফান সরকার ছয় মাস ধরে হাজতে রয়েছেন। হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মাদক ও চোরাচালানের ছয় মামলার আসামি তুফান সরকার। বগুড়া শহরের চকসূত্রাপুর চামড়াগুদাম কসাইপট্টি এলাকার মজিবুর রহমান তাঁর বাবা। কিন্তু তুফান বাবা ডাকেন সামছুদ্দিন শেখ ওরফে হেলালকেও।

কে এই সামছুদ্দিন শেখ? তুফান সরকারই-বা তাঁকে বাবার মর্যাদা দেন কেন? বগুড়ার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তুফান সরকারকে নিচে থেকে তুলে এনেছেন সামছুদ্দিন শেখ। বগুড়া পৌরসভার কাউন্সিলর সামছুদ্দিন শেখ জেলা শ্রমিক লীগ ও জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের রাজশাহী বিভাগের যুগ্ম সম্পাদক।

বগুড়ার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তুফান সরকারের যিনি ‘বাবা’, তাঁরও ‘বাবা’ আছে। বগুড়ায় বাবা-চেইনটি এ রকম: তুফান সরকার—সামছুদ্দিন শেখ—মমতাজ উদ্দিন। জেলার রাজনীতিতে অবশ্য সামছুদ্দিন শেখকে প্রতিষ্ঠিত করেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা মোটর মালিক গ্রুপের আহ্বায়ক মঞ্জুরুল আলম ওরফে মোহন।

তুফান সরকারের বড় ভাই যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা মতিন সরকারের রাজনৈতিক উত্থানও এই মঞ্জুরুল আলমের হাত ধরে। তবে তুফান সরকার, মতিন সরকার ও সামছুদ্দিন শেখের মাথার ওপর সব সময়ের জন্য ছায়া হিসেবে আছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন। তবে মঞ্জুরুল আলমেরও শহরে আলাদা একটা প্রভাব রয়েছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নেতা হিসেবে সবার প্রতিই দায়িত্ব-কর্তব্য থাকতে হয়। তার মানে এই নয় যে কারও অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রতি আমার সমর্থন আছে।’

১১ থেকে ১৩ ডিসেম্বর বগুড়া শহরের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের আড়ালে সামছুদ্দিন শেখের আরও পরিচয় রয়েছে। বগুড়ায় তিনি বেশি পরিচিত দখলদার ও চাঁদাবাজ হিসেবে। ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সামছুদ্দিন শেখ ছিলেন বাসস্ট্যান্ডের ‘কলার বয়’। কোন বাস কখন ছাড়বে, যাত্রীদের ডেকে তা জানিয়ে দেওয়ার কাজ করতেন তিনি। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তিনি শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তখন তিনি বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করে চলতেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যুক্ত হন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে। তখন তাঁর অত নামডাক বা প্রতিপত্তি ছিল না।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর কপাল খুলে যায় সামছুদ্দিন শেখের। একই সঙ্গে তুফান সরকারেরও। আর তুফান সরকার যে সামছুদ্দিন শেখের আশীর্বাদপুষ্ট, এ কথা তিনি নিজেও অস্বীকার করেন না।

বগুড়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে ১৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সামছুদ্দিন শেখের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি তুফান সরকারকে আশীর্বাদ করার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘তুফানদের পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের সমর্থনকারী। আর আমাকে সে অনেক সম্মান করে।’

তুফান সরকার আপনার এতই আশীর্বাদপুষ্ট যে আপনাকে বাবা বলেও ডাকেন—এর জবাবে সামছুদ্দিন শেখ বলেন, ‘হ্যাঁ। বাবা ডাকে। বাজান ডাকে। চাচা ডাকে।’

বগুড়ায় দখলদার হিসেবে সামছুদ্দিন শেখের কৌশল অভিনব। তাঁর পছন্দ রেলের জমি। তাও আবার ইজারার নামে। আগে দখল, পরে ইজারা—এই হচ্ছে তাঁর পদ্ধতি। তিনি তা স্বীকারও করেন। বললেন, ‘জমি যার দখলে থাকে, রেল তাকেই ইজারা দেয়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।’

সরকারি আজিজুল হক কলেজের ছাত্রীনিবাস-সংলগ্ন দুটি পুকুর বগুড়াবাসীর কাছে ‘জোড়াপুকুর’ নামে পরিচিত ছিল। একটি পুকুর এখন নেই, যার আয়তন এক একর নয় শতাংশ। সেই পুকুর এক বছর আগে ভরাট হয়ে গেছে সামছুদ্দিন শেখসহ তিনজনের নেতৃত্বে। অন্য দুজন হচ্ছেন জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান আকন্দ এবং তুফান সরকারের বড় ভাই শহর যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা আবদুল মতিন সরকার।

জমি উদ্ধারে রেলওয়ের ভূসম্পত্তি বিভাগ মামলা করেছিল। রহস্যজনক কারণে রেল কর্তৃপক্ষই আবার ওই পুকুর ইজারা দিয়েছে এই তিনজনের কাছে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, এই জমিতে একতলা ভবনের কাঠামো তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া সামছুদ্দিন শেখ শহরের কামারগাড়ি এলাকায় রেলের জমির ওপরই ৩৫টি ও বাদুড়তলা এলাকায় ৫৬টি দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন।

বগুড়ার সাতমাথা হচ্ছে সাতটি রাস্তার মোড়। একটি রাস্তার পাশে বগুড়া ট্রাফিক পুলিশের বক্স। এর সামনেই প্রতি রাতে চলে চাঁদাবাজি। বগুড়া হয়ে যেসব গাড়ি ঢাকা ও উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাওয়া-আসা করে, প্রতিটিকেই চাঁদা দিয়ে যেতে হয়। চাঁদা তোলার জন্য পাঁচ থেকে ছয়জন লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন সাতমাথা মোড়ে। ১২ ডিসেম্বর রাত ১২টায় সরেজমিনে দেখা যায়, বাসের চালকের সহকারীদের থেকে টাকা নিচ্ছেন আর রসিদ দিচ্ছেন সামছুদ্দিন শেখের লোকেরা। চাঁদা দেওয়ার পর একটু এগিয়ে গেলে ঢাকাগামী একটি বাসের চালক প্রথম আলোকে বলেন, ‘৪৫০ টাকা চাঁদা দিতে হইছে। মাঝে মাঝে এর বেশিও দিতে হয়। নইলে মাইর শুরু করে।’

পুলিশ বক্সের সামনেই সামছুদ্দিন শেখেরা চাঁদাবাজি করছেন, পুলিশ কী করছে, জানতে চাইলে বগুড়া জেলা পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘যতটুকু জানি সংগঠনের নামে টাকা তোলা হয়। চাঁদাবাজির কোনো অভিযোগ পাইনি। একটা অভিযোগ পেলেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বগুড়া জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, এ জেলায় তিনি নতুন এসেছেন এবং জেলার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। চাঁদাবাজিসহ যেকোনো অপরাধের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবেন তিনি। জমি উদ্ধারে অভিযান পরিচালনার জন্য রেল কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখেছেন বলে জানান তিনি।

সামছুদ্দিন শেখের কার্যক্রম সম্পর্কে এলাকার সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে কিছু বলার সাহস রাখেন না। বগুড়ায় ২০ বছর ধরে বসবাস করছেন ষাটোর্ধ্ব জয়নাল শেখ। তিনি শুধু বললেন, ‘চোখের সামনে সামছুদ্দিন শেখের বিস্ময়কর উত্থান দেখেছি।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অন্যায়, চাঁদাবাজি, দখল এমনকি মাদক কেনাবেচার সঙ্গে যারা যুক্ত, পুলিশ তাদের ধরছে না কেন? দুর্নীতি দমন কমিশন কী করছে? জেলা প্রশাসন কী করছে? এই যে তুফান সরকার হাজতে আছে বা আরও যারা ধরা খাচ্ছে, আমি তো কাউকেই ছাড়ার জন্য তদবির করিনি।’

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে আপনার ওপরও বর্তায় কি না, এ প্রশ্নের জবাবে মমতাজ উদ্দিন বলেন, ‘কারও ব্যক্তিগত অপরাধের দায় তো আমি নিতে পারব না।’

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বগুড়া পৌরসভা নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার সময় নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় সামছুদ্দিন শেখ নিজের সম্পদের হিসাব দিয়েছিলেন। তাতে বলা হয়, তাঁর নগদ ১৪ লাখ ১৬ হাজার টাকা, একটি মাইক্রোবাস, একটি মোটরসাইকেল, ২৩ শতাংশ কৃষি-অকৃষি জমি ও ছয়তলা একটি ভবন আছে। পেশায় গৃহিণী তাঁর স্ত্রীর নামে নগদ ১৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, ১১ শতাংশ জমি ও পাঁচতলা ভবন, তিনটি বাস ও ১২ ভরি স্বর্ণালংকার থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।

এখন তাঁর সম্পদ আরও অনেক বেড়েছে। তিনি ও মঞ্জুরুল আলমসহ তাঁর অন্য তিন সহযোগীর ‘শাহ ফতেহ আলী’ নামে বাস কোম্পানি রয়েছে। বগুড়া-ঢাকা গন্তব্যে তাঁদের ৬০টি বিলাসবহুল বাস চলাচল করে। নিউমার্কেটে দুটি এবং চুড়িপট্টিতে চারটি দোকান রয়েছে। সম্প্রতি বাদুড়তলা উপশহরে দুই কোটি টাকা দামের বাড়ি কিনেছেন বলে জানা গেছে।

অল্প সময়ে কীভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন—এ প্রশ্নের জবাবে সামছুদ্দিন শেখ প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, কষ্ট করেই টাকা জমিয়েছেন তিনি এবং ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেছেন।

সব মিলিয়ে বগুড়ায় সামছুদ্দিন শেখের মতো সব প্রভাবশালীই স্ব স্ব প্রভাববলয় তৈরি করেছেন। তাঁরা প্রশাসনের লোকদের হাতে রাখেন সব সময়। আর সে কারণে তাঁদের অপকর্মের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ অভিযোগ দিতে ভরসা পান না, সাহসও রাখেন না।

Comments

comments