মূসা ভাই, চোর চোর

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

প্রয়াত ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক এ বি এম মূসা তথা সকলের মূসা ভাই টেলিভিশন টকশোতে আহ্বান জানিয়েছিলেন যে, সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের দেখলে আমরা যেন তাদের ‘চোর চোর’ বলে ধাওয়া দেই। মূসা ভাইয়ের কথায়ই হোক আর মন্ত্রী এমপিদের কৃতকর্মের জন্যই হোক, বহু জায়গায় তারা জনগণের ধাওয়ার সম্মুখীন হয়েছেন। অনেক জায়গায়ই সুনির্দিষ্টভাবে জনগণ তাদের চোর বলে প্রতীয়মান করেননি। কিন্তু সবাই জেনেছিলেন তারা চোর। ঘুষ, দুর্নীতি, ব্যাংকের টাকা তছরূপ, জালিয়াতি, লুট এখন বাংলাদেশের স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে এবং এই সকল অপকর্মের পেছনে সরকারি দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের হাত রয়েছে। গত ১০ বছর ধরে জনগণের প্রতিবাদ করার সুযোগ কেড়ে নেয়া হয়েছে। এ আইন সে আইন দিয়ে মানুষের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। জনগণের কণ্ঠস্বর সত্যি সত্যি স্তিমিত হয়ে এসেছে।

কিন্তু জনগণ যদি সুযোগ পায় তাহলে সত্যি সত্যি এসব মন্ত্রী-এমপিকে চোর চোর বলে তাড়া করে। তার সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এর আগে এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঝন্টুকে বিপুল ভোটে জয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। সে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাতীয় পার্টির প্রার্থীর কাছে প্রায় লক্ষ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। প্রায় সকলেই স্বীকার করেছেন যে, এই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। ঝন্টুর ট্র্যাক রিপোর্ট খুব খারাপ। রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের বেশিরভাগই তিনি স্বৈরাচারী কায়দায় আত্মসাৎ করেছেন বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ আছে। এ নিয়ে প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ ছিল না। তিনি সরকারের মতোই এতটাই স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিলেন যে, প্রশ্নকারীকে সবসময় তটস্থ থাকতে হতো। কিন্তু যেই না মানুষ সুযোগ পেয়েছে অমনি তারা চোর চোর বলে ধাওয়া দিয়ে তাকে একেবারে নদীতে ডুবিয়ে দিয়েছে। রংপুর সিটি করপোরেশন গেছে। এর রাস্তাঘাট উন্নয়ন গত পাঁচ বছরে কিছুই হয়নি। কিন্তু বরাদ্দকৃত অর্থ হাওয়া হয়ে গেছে। আর সে কারণেই সুযোগ পেয়েই জনগণ তাকে ধাওয়া দিয়েছে।

আসলে এ রকমই হয়। কখনও কখনও সত্যের ঢাক আপনাআপনি বেজে ওঠে। সত্য প্রকাশ হয়ে পড়ে। এর আগে বেদিশা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ঘুষ গ্রহণকে যৌক্তিকতা দিয়ে বলেছিলেন, এটা ঘুষ গ্রহণ নয়, কুইক সার্ভিস। বেতাল অর্থমন্ত্রী এ কথার পর ঘুষ বাণিজ্যকারীরা জনগণের টুঁটি চিপে ধরে কুইক সার্ভিসের ফি আদায় করতে শুরু করেন। সরকার যেহেতু নিজেই চোর, ফলে এখানে তাদের করার কিছুই থাকে না। সব জায়গায় গিয়ে তো আর ধাওয়া করা যায় না। জনগণ অপেক্ষায় আছে ধাওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এই যেমন ধরা যাক, বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু। তাকে নিয়ে কত যে রং-তামাশা হচ্ছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এই ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির অর্ধশত মামলা আছে। এর সঙ্গে জড়িত সকলেই বলেছেন, প্রায় ৬০০০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির জন্য শেখ আবদুল হাই বাচ্চু দায়ী। পরিচালকরা বলেছেন, বাচ্চরু মুখের উপর কথা বলার ক্ষমতা তার ছিল না; তিনি সরকারের এতটাই প্রিয়ভাজন ছিলেন। এখন বাচ্চুকে দুদক ডাকে। বাচ্চু দু’বার গিয়েছিলেন। তৃতীয় বার একমাসের সময় চেয়েছেন। এবং মাসতুত ভাই দুদক বাচ্চুকে সে সময় বরাদ্দও করেছে। বাচ্চুর ঋণ জালিয়াতি সাড়ে ৬০০০ কোটি টাকার মতো। নিজে ও তার ভাই, সন্তানেরা ও স্ত্রী আত্মসাৎ করেছেন শত শত কোটি টাকা। কিন্তু কোনো মামলায়ই এখন পর্যন্ত বাচ্চু আসামী নন। কী মজা!

অথচ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি টাকা নাকি আত্মসাৎ হয়েছে, এই অভিযোগে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে প্রতি সপ্তাহে দুদকের আইনজীবীরা আদালতে হাজির করছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই মামলায় আত্মসাতের কোনো প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলছেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং তাকে রাজনীতি থেকে বিরত রাখার জন্যই এসব অভিযোগ করা হয়েছে। সন্দেহ নেই, দু’ কোটি টাকার জন্য সরকারের বেপ্রমাণ যে সর্বগ্রাসী প্রয়াস তার সঙ্গে কোনো কিছুর মিল নেই। বেসিক ব্যাংকের বাচ্চু এখন পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদের পর্যায়ে, তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। তাহলে এ টাকার ভাগ কারা পেলেন? হলমার্ক কেলেঙ্কারির সাড়ে ৪০০০ কোটি টাকা উধাও।

ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার খবর নাই। বাংলাদেশের ব্যাংকের ভল্ট চুরি হয়ে গেছে। সে চুরির থাইলতদার, মাঝে মাঝে মনে হয়, অর্থমন্ত্রী নিজেই। দেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির টাকা কোনোদিন ফেরত পাওয়া সম্ভব হবে না। আর অর্থমন্ত্রী বলছেন, যতদিন ফেরত পাওয়া না যায়, ততদিন এর তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে না। এমন নষ্ট চিন্তার লোক দেশের অর্থমন্ত্রী আছেন। সম্প্রতি তিনি এও বলেছেন যে, চালের মূল্য কিছুটা বাড়ুক, সরকার তা চেয়েছে।
পিঁয়াজের দাম একশ’ চল্লিশ টাকা কেজি। অর্থমন্ত্রীর পিঁয়াজের দোষ আছে কিনা জানি না। কিন্তু চুপচাপ অজগর সাপের মতো শুয়ে থাকা বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ হঠাৎই বলে বসলেন যে, নতুন পিঁয়াজ উঠলে পিঁয়াজের দাম কমে যাবে। নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য এটি একটি শুভ সংবাদ। কিন্তু আমাদের নিশ্চিত মনে হয় যে, পিঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির পেছনে চোরাদের কারসাজি আছে। বাণিজ্যমন্ত্রী কি সেই চোরাদের সহযোগী। না হলে পিঁয়াজের মূল্য ১৪০ টাকায় তিনি যৌক্তিকতা দেবার চেষ্টা করছেন কেন? মুহিত না হয় বুঝলাম স্বৈরশাসক এরশাদের পদলেহী ছিলেন। কিন্তু তোফায়েলকে অন্তত সে দোষে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না।

এখন তারা আছেন এরশাদের সঙ্গে গলায় গলায়। একসময় তা ছিলেন না। কথা ছিল, এরশাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বামদল কোনো রকম আঁতাত করবে না। কিন্তু ভাগ্যের এমনই নিষ্ঠুর পরিহাস এই যে, মেনন-ইনুও এরশাদের পায়ে তেল ডলে চলে। এরা যে মুজিবকোট গায়ে তুলেছে, তার তো একটা মূল্য দিতে হবে। শেখ হাসিনার সঙ্গে এরশাদের আন্তরিক সম্পর্ক তার ক্ষমতা দখলের পর থেকে সবসময়ই অটুট ছিল। এখনও আছে। এরশাদ মাঝে মাঝে এটা ওটা বলছেন। কিন্তু তিনি জানেন, হাসিনার তাকে চাই-ই চাই। সে জন্য কেউ কাউকে কলসীকানা মারে না। ভালই আছেন এই জুটি।

কিন্তু তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেবার মিশন দিয়ে সরকারে নিয়োজিত শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এত উচ্চমাত্রার বাজে লোকও যে বাংলাদেশে মন্ত্রী হতে পারে এটা কেউ কল্পনাও করেনি। কী এক প্রতিমন্ত্রী জয় বাসের ড্রাইভারকে থাপ্পড় মেরে অনেক নাম কামিয়েছিলেন। তিনি এখনও মন্ত্রী আছেন। এদের খবর কেউ রাখে না। কোথাকার কে প্রতিমন্ত্রী কোথায় কী বলেছে তা নিয়ে কারো কিছু আসে যায় না। কিন্তু দারুণ বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেছেন, শুধু কর্মকর্তারাই ঘুষ খান না, মন্ত্রীরাও দুর্নীতি করেন। মন্ত্রীরা চোর। আমিও চোর। এ জগতে এমনই চলে আসছে। তিনি শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘুষ খেতে উৎসাহিত করে বলেছেন, ঘুষ খান। তবে সহনশীল মাত্রায় খান। কারণ আমার বলার সাহসই নাই যে, ঘুষ খাবেন না। তা অর্থহীন হবে। কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনার স্কুলে যান খাম রেডি থাকে। সেটি নিয়ে আসেন। পরে পজিটিভ রিপোর্ট দেন।

তিনি বলেন, কিছুদিন আগে একজন কর্মকর্তাকে দুদক দিয়ে ধরিয়েছি। কারণ থানা পুলিশ দিয়ে ধরালে ঘুষ খেয়ে তারাও ছেড়ে দিবে। বাধ্য হয়ে দুদককে দিয়ে ধরাতে হয়েছে। নাহিদ বলেন, ঐ কর্মকর্তার তথ্য সংগ্রহ করে দেখলাম উনি পাঁচটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক থেকে পিয়ন পর্যন্ত সবার একমাসের বেতন দিতে বলেন। সে অনুযায়ী শিক্ষকরা তার জন্য টাকা রেডি করেন। অনেক কষ্টে তাকে ধরতে হয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষা অধিদপ্তরে চাকরি করেন এমন একজন ঢাকায় ১৩টি বাড়ি করেছেন। এই লোক অবশ্য চালাক। এক এক জায়গায় জমি কিনে ধীরে ধীরে বাড়িগুলো করেছেন। এখন কেউ চা পর্যন্ত খেতে চান না। আমি বলব, এটা করার দরকার নেই। আপনি আপোসে চা কেন, মাংস খান। কিন্তু খাম না নিলেই হয়। তারপরও শেষপর্যন্ত এই নরাধম লোকটি বলেছেন, ঘুষ-দুর্নীতি অনেক কমেছে।

এখন ব্যবস্থা দুটি হতে পারে। এক. এই মন্ত্রীকে অবিলম্বে গলা ধাক্কা দিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে বের করে দেয়া যেতে পারে (সেই সঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী আদালত কর্তৃক দণ্ডিত কামরুলকেও)। দুই. সমাজে দুর্নীতিতে উসকানি দেয়ার জন্য তাকে সরকার ঘোষিত আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করা যেতে পারে। দেখি শেখ হাসিনা সরকার কোনটা করেন। দুর্নীতি দমন করেন। নাকি দুর্নীতিবাজকে কোলে নিয়ে দোলেন।

একটি প্রসঙ্গেই আলোচনাটি সীমাবদ্ধ রাখলাম। প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি উল্লেখই করলাম না। এই শিক্ষাঘাতক শিক্ষামন্ত্রীর আমলে এমন কোনো শিক্ষা বিষয়ক পাবলিক পরীক্ষা নেই যার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। প্রথম শ্রেণীর প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। বিসিএস-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। ফাঁস করেছে ছাত্রলীগ। ফাঁস করেছে সরকারি কর্মকর্তারা। মাঝে মাঝে মনে হয় ফাঁস করেছেন মন্ত্রী নাহিদ নিজেই। কারণ তার লক্ষ্য শিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি বাংলাদেশে যাতে বিকশিত না হয় সেটি নিশ্চিত করা। মরহুুুুম মূসা ভাই, এদেরকে কি শুধু চোর চোর বলে ধাওয়া দিলেই যথেষ্ট হবে!

Comments

comments