স্পিড মানি থেকে সহনীয় মাত্রার ঘুষ : কোন পথে বাংলাদেশ?

নাঈম আব্দুল্লাহ

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের একটি বক্তব্য দেশের প্রচারমাধ্যমে বেশ ঝড় তুলেছিল। যতদূর মনে পড়ে এটি ছিল ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসের ঘটনা। তখন মন্ত্রী আবুল মাল সাহেব বলেছিলেন – ‘স্পিড মানি মানে ঘুষ দেওয়া অবৈধ নয়। রিকশায় চড়ে টাকা দেওয়াটা বৈধ এবং কারো কাজ দ্রুত করে দিয়ে, উপহার নিলে সেটা অবৈধ মনে করা হয়। কিন্তু আমি মনে করি কাজ দ্রুত করায় যদি কেউ কাউকে উপহার হিসেবে কিছু দেয় তবে তা অবৈধ নয়। উন্নত দেশে এটার বৈধতা দেওয়া হয়েছে ভিন্ন নামে। তারা এটার নাম দিয়েছে ‘স্পিড মানি’।’

দেশের আইনে ঘুষ দেওয়া-নেওয়া দুটোকেই দুর্নীতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে এগুলোকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই সেসময়ে ঘুষের পক্ষে আবুল মাল সাহেবের এই ফতোয়া তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। অবশ্য তাতে কোন সমাধান মেলেনি। কারণ, এমপি মন্ত্রীদের বেফাঁস মন্তব্য শুনে জনমনে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও জনগণ দ্বিগুণ গতিতে ঝাপিয়ে পড়ে এই অবৈধ লেনদেন এ।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে ‘এক নম্বর প্রতিবন্ধক’ ঘুষ-দুর্নীতি-পুঁজি লুণ্ঠন। এটাকে নতুন করে সর্বনাশা আশকারা দিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। গতকাল তিনি বলেছেন-‘শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নয়, মন্ত্রীরাও দুর্নীতি করেন। ঈদে বলেছি, আপনারা ঘুষ খাবেন; তবে সহনশীল মাত্রায় খান। ঘুষ খাবেন না, এটি বলার সাহস আমার নেই।’ এক পর্যায়ে তিনি নিজেকে চোর দাবি করে বলেন -‘ খালি যে অফিসাররা চোর তা না; মন্ত্রীরাও চোর। আমিও চোর।’

মন্ত্রী নাহিদ আজ যে চুরির কথা স্বীকার করেছেন বহু আগেই তার স্বীকৃতি দিয়েছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসা। তিনি বলেছিলেন ‘লোকজন একদিন আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীদের দেখলে বলবে তুই বেটা চোর।’ এবিএম মূসার সে কথা সত্যে পরিণত হয়েছে। এখন লোকজনকে আর কষ্ট করে আওয়ামী লীগকে চোর বলতে হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরাই এখন নিজেদের চোর দাবি করছেন।

স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে শেখ সাহেবও এই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। নিজের কম্বলখানা বুঝে না পেয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘সবাই পায় সোনার খনি, আমি পেলাম চোরের খনি।’ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে চুরির ব্যাপারটা আসলে ‘চুরি কর্মের’ সাথে যায় না। কারণ, চুরি ব্যাপারটা গোপনেই করতে হয়। আর তাই পিটিয়ে শয্যাশায়ী করে ফেললেও কোন চোর নিজেকে চোর বলে স্বীকার করেনা। ঘুরে ফিরে সে দাবি করে সে চুরি করেনি।

কিন্তু, বর্তমান ক্ষমতাসীন কর্তা-ব্যক্তিরা এক উন্নত ধরণের চোর। তারা প্রকাশ্য দিবালোকে ঘোষণা দিয়ে চুরি করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এতে তাদের পকেট ভারী হচ্ছে ঠিক। দেশে বিদেশে ব্যাংকের একাউন্টও সমৃদ্ধ হচ্ছে। কেউবা এসব করে ব্যাংকের উদ্যোক্তা বনেও যাচ্ছেন। তাতে দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন হলেও কিছুই যায় আসে না।

প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষামন্ত্রীর এ উন্মুক্ত চুরি ও ঘুষ গ্রহণের ঘোষণা জাতিকে ঘুষ, চুরি আর দুর্নীতির দিকে যে উস্কে দিবে তা ঠেকাবে কে? অবশ্য আজকাল ১ম শ্রেণির শিশুরাও জানে টাকা থাকলে পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন কিনতে পাওয়া যায়। আর এই চুরির আঞ্জাম দিতে গিয়ে দেশের প্রাথমিক স্কুলগুলোতেও এবার প্রশ্নফাঁসের হিড়িক দেখা গেছে। প্রশ্নফাঁস প্রমাণিত হওয়ায় বরগুনায় ৩৯৫, মুন্সিগঞ্জে ১১৩ ও নাটোরে ১০২ টি অর্থাৎ মোট ৬১০ টি স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিতও করা হয়। এ তো গেল প্রশ্নফাঁস প্রমাণিত হওয়ার খবর। কিন্তু যেসব জায়গায় প্রমাণিত হয়নি কিংবা উপরের চাপে চেপে গেছে সবাই সব হিসেব করলে এবার শুধুমাত্র প্রাথমিক স্কুলে প্রশ্নফাঁসের জন্য গিনেসবুকে নাম লেখাতে পারতো বাংলাদেশ। বিশ্বের আর কোন দেশের এতগুলো প্রাথমিক স্কুলের পরীক্ষা প্রশ্নফাঁসের অপরাধে স্থগিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

জাতিকে আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জমান করতে আওয়ামী লীগ সরকারের এ অব্যাহত প্রণোদনা প্রমাণ করে এর পেছনে অবশ্যই খারাপ কোন উদ্দেশ্য আছে। কারণ, জনগণকে অবৈধ উপার্জনে জড়িয়ে ফেলতে পারলে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে রাখা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। একজন দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি কখনোই অন্যের অন্যায়ের সমালোচনার সাহস দেখায় না। যদি দেখানোর সাহস দেখায় তবে দুর্নীতির প্রমাণ উপস্থাপন করে খুব সহজেই তাকে খোয়াড়ে নিক্ষেপ করা যায়। যার সর্বশেষ প্রমাণ দিয়ে গেলেন সিনহা বাবু।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Comments

comments