নিজেদের ভবন ভাড়া দিয়ে ব্যাংকের টাকার অপব্যয়

পরিচালকদের আরেক কেলেঙ্কারি

হাছান আদনান: ঋণ অনুমোদন-বিতরণ ও জনবল নিয়োগেই শুধু নয়, ফারমার্স ব্যাংকের প্রতিটি ধাপেই অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছিলেন পরিচালকরা। ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় থেকে শুরু করে অধিকাংশ শাখাই চালু করা হয়েছে পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভবনে। ভবন ভাড়াসহ বিভিন্ন খাতে পরিচালন ব্যয় দেখিয়ে ব্যাংকটির অর্থ অপব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে।

বেশি টাকায় ভবন ভাড়া নিয়ে ব্যাংকের অর্থ অপচয়ের বিষয়টি স্বীকার করছেন ফারমার্স ব্যাংকের বর্তমান পরিচালকরাও। ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাসুদ ও নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আজমত রহমান দুজনেই স্বীকার করেন, একই এলাকায় স্থাপিত অন্য ভবনের তুলনায় ফারমার্স ব্যাংক বেশি দাম দিয়ে ভবন ভাড়া করেছে। বেশ কয়েকজন পরিচালক ও উদ্যোক্তা নিজেদের ভবন ব্যাংকের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। ভাড়া নেয়ার প্রক্রিয়ার বিষয়ে বেশকিছু আপত্তি এসেছে।

তাদের বক্তব্য, ব্যাংকের শাখা স্থাপনের জন্য জায়গার পরিমাণ ও ভাড়াসহ সব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে বিষয়গুলো বিবেচনা করত, তাহলে আজকের পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ভাড়া বেশি হওয়াসহ ব্যাংকটির বিভিন্ন বিষয়ে শুরু থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক আপত্তি জানিয়ে আসছে। ব্যাংকটির বাংলামোটর শাখার ভাড়া বেশি হওয়ায় একাধিকবার ফাইল ফেরত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকটির নীতিনির্ধারকদের প্রভাবের কারণে শেষ পর্যন্ত তা অনুমোদন করতে হয়েছে।

ফারমার্স ব্যাংকের ৫৪টি শাখার মধ্যে শুধু চাঁদপুর জেলায়ই রয়েছে সাতটি। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান চাঁদপুর-১ আসনের (কচুয়া) সংসদ সদস্য। ফারমার্স ব্যাংকের কচুয়া শাখাটি মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মালিকানাধীন গুলবাহার হিমাগার লিমিটেড থেকে ভাড়া নেয়া ভবনে চালু করা হয়। ৩ হাজার ৯৭৩ বর্গফুটের শাখাটির জন্য বেশি ভাড়া পরিশোধ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। এছাড়া ওই ভবনে একটি এটিএম বুথ স্থাপনের জন্য ১০০ বর্গফুট জায়গাও ভাড়া নিয়েছে ব্যাংকটি।

উত্তরা শাখার জন্য ছয় হাজার বর্গফুটের ভবন ভাড়া করেছে ফারমার্স ব্যাংক। ভাড়া করা ওই ভবনের মালিক ব্যাংকটির উদ্যোক্তা-পরিচালক ও পদত্যাগকারী ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোহা. আতাহার উদ্দিন। উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের ৩৩ নম্বর সড়কে লুনারিয়াম ভবনে শাখাটির অবস্থান। আজমত গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মোহা. আতাহার উদ্দিন ফারমার্স ব্যাংকের ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক।

ফারমার্স ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জন্য গুলশান-১-এর জব্বার টাওয়ারের ১৩ নম্বর ফ্লোর ভাড়া নেয়া হয়েছে। আট হাজার বর্গফুটের ওই ফ্লোরটির মালিক ব্যাংকটির বর্তমান নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আজমত রহমান। তিনি আজমত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

ব্যাংকের জামালপুরের বকশীগঞ্জ শাখার জন্য পাঁচ হাজার বর্গফুটের ভবন ভাড়া করেছে ফারমার্স। ভাড়া করা এ ভবনের মালিক ব্যাংকটির উদ্যোক্তা রাশেদুল হক চিশতী। ব্যাংকটির পর্ষদ থেকে গত ২৭ নভেম্বর পদত্যাগকারী মো. মাহাবুবুল হক বাবুল চিশতীর ছেলে তিনি।

ফারমার্স ব্যাংকের ১১ হাজার ৮৯৭ বর্গফুটের গুলশান করপোরেট শাখাটি গুলশান সাউথ এভিনিউর লোটাস কামাল টাওয়ার-২-এর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় অবস্থিত। এছাড়া ভবনটিতে আরো ৬ হাজার ৬৭ বর্গফুট জায়গা ভাড়া নিয়েছে ফারমার্স ব্যাংক। ভাড়া করা ওই স্পেসের মালিক ব্যাংকটির পরিচালক নাফিসা কামালের মা কাশ্মীরি কামাল।

ব্যাংকটির চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখার জন্য পাঁচ হাজার বর্গফুট স্পেস ভাড়া নিয়েছে ফারমার্স ব্যাংক। ভাড়া করা এ ভবনের মালিক ব্যাংকটির উদ্যোক্তা-পরিচালক মো. আবু আলম।

ফারমার্স ব্যাংকের অল্টারনেটিভ ডেলিভারি চ্যানেল ও মোবাইল ব্যাংকিং বিভাগের জন্য বনানীর সোলারিয়াম ভবনের ৪ হাজার ৭৬০ বর্গফুট স্পেস ভাড়া করা হয়েছে। ভাড়া করা ওই জায়গার মালিকও ব্যাংকটির বর্তমান নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আজমত রহমান।

এছাড়া ময়মনসিংহ শাখার জন্য সাড়ে চার হাজার বর্গফুট স্পেস ভাড়া নিয়েছে ফারমার্স ব্যাংক। ভাড়া করা ওই ভবনের মালিক পদত্যাগকারী মো. মাহাবুবুল হক বাবুল চিশতীর স্ত্রী রোজি চিশতী। এছাড়া ব্যাংকটির ময়মনসিংহ ও জামালপুরে স্থাপন করা দুটি এটিএম বুথের জায়গা বাবুল চিশতীর কাছ থেকে ভাড়া নেয়া হয়েছে।

গোপালগঞ্জ শাখার জন্য পাঁচ হাজার বর্গফুট জায়গা ভাড়া করেছে ফারমার্স ব্যাংক। ভাড়া করা ভবনটির মালিক সাজেদা সারাফাত। তিনি ব্যাংকটির উদ্যোক্তা-পরিচালক চৌধুরী নাফিজ সারাফাতের মা।

ব্যাংকটির গুলশান সাউথ এভিনিউ শাখার জন্য ভাড়া করা হয়েছে ৪ হাজার ৩৪৫ বর্গফুট জায়গা। ভাড়া করা ওই জায়গার মালিক ব্যাংকটির উদ্যোক্তা পরিচালক আঞ্জুম আরা শহীদ। তিনি ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালক চৌধুরী নাফিজ সারাফাতের স্ত্রী।

পরিচালকদের ভবনে খোলা এসব শাখার ভাড়া বাবদ বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে বলে স্বীকার করেছে ব্যাংকটির বর্তমান পর্ষদ। ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাসুদ এ প্রসঙ্গে বলেন, উত্তরাসহ কয়েকটি শাখার ভাড়া কমানোর বিষয়ে এরই মধ্যে আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পরিচালকরাও বিষয়টি ভালোভাবে নিয়েছেন। সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে তারা এগিয়ে এসেছেন।

ফারমার্স ব্যাংকের তথ্যমতে, শুধু অফিস ভাড়া বাবদ ২০১৬ সালে ব্যাংকটি পরিশোধ করেছে ১৬ কোটি টাকা। ভাড়াসংক্রান্ত অন্যান্য ব্যয়সহ গত বছর ব্যাংকটি সাড়ে ২৪ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। চলতি বছর এ খাতে ব্যাংকটির ব্যয় আরো বেড়েছে।
অতিরিক্ত ভাড়ার পাশাপাশি আপত্তি আছে এসব শাখার অবস্থান নিয়েও। সুবিধাজনক অবস্থান না হওয়া সত্ত্বেও শুধু পরিচালকদের স্বার্থরক্ষায় এসব স্থান বেছে নেয়া হয়েছে বলে জানান ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা।

মোহাম্মদ মাসুদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ব্যাংকের কিছু শাখার অবস্থান নিয়ে আপত্তি এসেছে। এমন জায়গায় শাখা স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে গ্রাহক যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। এ ধরনের শাখা আমরা চিহ্নিত করে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেব।

গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে এ মুহূর্তে চরম সংকটে রয়েছে নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংক। অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে সংশয়ে পড়েছেন ব্যাংকটির আমানতকারীরা। অর্থ ফেরত পেতে প্রতিদিনই ব্যাংকটিতে ভিড় করছেন আমানতকারীরা। যদিও খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে তাদের।

Comments

comments