চট্টগ্রামে ডিভোর্স প্রতি মাসে ৩৮৪!

ঘটনা-১ : উচ্চাভিলাসী মেয়ে চট্টগ্রামের নামকরা একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে পড়ে। বিলাসিতার সেই খোরাক মেটাতে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে একই মেডিকেল কলেজের চল্লিশোর্ধ এক শিক্ষকের সাথে। যদিও সেই শিক্ষকের স্ত্রী-সন্তান আছে। আর সেই শিক্ষকও পরিবারের কথা ভুলে নীতি-নৈতিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েন সেই শিক্ষার্থীর প্রেমে। যতই দিন যায় গভীর হতে থাকে তাদের সম্পর্ক। এভাবে মাস তিনেক যাবার পর মেয়েটি সিদ্ধান্ত নেয় সেই শিক্ষককে বিয়ে করার। কিন্তু বিয়ে করতে আপত্তি জানান শিক্ষক। ইতোমধ্যে সম্পর্কের গভীর মুহূর্তগুলো নিজের মোবাইলে ধারণ করে রাখে সেই শিক্ষার্থী। সম্পর্ক গড়ায় বিয়ে পর্যন্ত। প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে গোপনে ৩৫ লাখ টাকা কাবিনমূলে অনেকটা বাধ্য হয়ে সেই শিক্ষার্থীকে বিয়ে করেন তিনি। যদিও বিয়ের আগে সেই শিক্ষকের স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে আপত্তি ছিলো না ওই ছাত্রীর। কিন্তু বিয়ের পর আপত্তির বেড়াজালে আটকে পড়েন শিক্ষক। চাপ দিতে থাকে ডিভোর্স দেয়ার জন্য। প্রতিনিয়ত প্রথম স্ত্রীকে বিয়ের ঘটনা জানিয়ে দেবার হুমকি দিতে থাকেন ঐ শিক্ষার্থী। ফলে মানসম্মান রক্ষার্থে নীরবে কাবিনের ৩৫ লাখ টাকা দিয়ে এ যাত্রায় রক্ষা পান সেই শিক্ষক।

ঘটনা-২ : চট্টগ্রামের স্বনামধন্য ধনাঢ্য পরিবারের এক সন্তান । বার এট ল করছেন লন্ডনে। পাশাপাশি পারিবারিকভাবে ঠিক করা হবু স্ত্রী ডাক্তারি পড়ছে অস্ট্রেলিয়ায়। বিয়ের আগে সব ঠিকঠাক। কিন্তু বিপত্তি বাধলো বিয়ের পর, যখন স্ত্রী ডাক্তারি পাশ করলো। স্বামীর ধারণা স্ত্রী পেশাগত দিক দিয়ে তার থেকে এগিয়ে। এ নিয়ে দিন-রাত একধরনের ক্ষোভমিশ্রিত হীনমন্যতায় ভুগতে থাকেন স্বামী। তিনি চান না স্ত্রী ডাক্তারি করুক। শুধু সংসারে সময় দিক এটাই চান তিনি। এদিকে স্ত্রীও স্বাধীনচেতা। স্বামীর এমন অন্যায় আবদারকে প্রশ্রয় দেবে না কোনোভাবেই । ফলাফল বিয়ের দেড় বছরের মাথায় ডিভোর্স।

ঘটনা-৩ : স্বামী থাকেন দেশের বাইরে। বছরে একবার দেশে আসেন। নিয়ম করে স্ত্রীর কাছে টাকা পাঠান প্রতি মাসে। সংসারে দেড় বছরের এক কন্যাসন্তানও আছে। এ অবস্থায় ফেসবুকে যোগাযোগের মাধ্যমে প্রবাসীর স্ত্রীর সাথে পরিচয় হয় এক যুবকের। পরিচয় থেকে প্রণয়, অতঃপর দেড় বছরের কন্যাসন্তানকে রেখে ওই যুবকের সাথে পালিয়ে যায় প্রবাসীর স্ত্রী। পরে ডিভোর্স দেয় প্রবাসী স্বামীকে।

এখানে মাত্র তিনটি ঘটনা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো। চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন হাজারো বিচ্ছেদের করুণ চিত্র। যে চিত্রের ভয়াবহতা জানা গেল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট (যুগ্ম জেলা জজ) জাহানারা ফেরদৌসের কাছ থেকে। শুনতে অবাক করা ব্যাপার হলেও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো- সিটি কর্পোরেশনের দুই আদালতে জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই ১০ মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী শুধুমাত্র বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ডিভোর্সের হার বেড়ে গেছে ভয়াবহভাবে; যা প্রতি মাসে গড়ে ৩৮৪টি। আর এই সংখ্যা কর্পোরেশনের হিসাবে ছাড়িয়ে গেছে অতীতের সব রেকর্ডকেও। দিনের হিসাবে বলতে গেলে প্রতিদিন গড়ে ১৫টি করে আবেদন জমা পড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য।

স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট (যুগ্ম জেলা জজ) জাহানারা ফেরদৌসের সাথে আলাপচারিতায় জানা গেল উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই বিবাহ বিচ্ছেদ হার বেড়ে যাচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে। এরপর রয়েছে মধ্যবিত্ত কিছু পরিবার। পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহুগামিতা, আত্মঅহমিকা, একে অপরকে সময় না দেয়া- এসব বিষয়ের জন্যই মূলত বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ।

এ ব্যাপারে সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন বলেন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চলা, পারিবারিকভাবে সুশিক্ষার চর্চা না করা এসব কারণেই মূলত আজকের এই পরিণতি।

ফাইট ফর উইমেন রির্সাচের প্রেসিডেন্ট এডভোকেট রেহেনা বেগম রানু বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবাধ মেলামেশা, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ না থাকা, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে বেড়েই চলেছে বিবাহ বিচ্ছেদ। তবে এর থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো পারিবারিক ও সামাজিক কাউন্সেলিং।

তবে এতো কিছু ছাপিয়ে আকাশ সংস্কৃতির বিকৃত প্রাদুর্ভাবও এ ধরনের সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্য দায়ী বলে মনে করেন অনেকে। তাই সময় থাকতে সামাজিকভাবে বিশেষ করে দেশের তরুণ প্রজন্মকে বাঙালি সমাজে আবহমানকালের যে পারিবারিক ধারা বহমান ছিলো তার তাৎপর্য তুলে না ধরলে এবং সে সম্পর্কে সচেতন করা না গেলে লাগামহীন ঘোড়ার মতোই বিবাহবিচ্ছেদ বাড়ার আশঙ্কা আছে বলে মনে করেন সমাজের বিজ্ঞজনরা।

Comments

comments