গরিবের ‘জীবিকার দ্বন্দ্ব’ ও ‘ধর্মীয় রঙ’ লাগিয়ে খবর বিক্রির উপায়

কদরুদ্দিন শিশির

গত ১২ ডিসেম্বর প্রথম আলোর প্রিন্ট সংস্করণে একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘ফসলের মাঠে নারীদের যেতে মানা!’ এরপর এই ঘটনা টক অব দ্য কান্ট্রি। সব গণমাধ্যমে খবর ছাপা হয়েছে। ঘটনাটিকে উপলক্ষ্য করে ফতোবাজির বিরুদ্ধে কলাম লেখা হয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে নিন্দার ঝড় বইছে। বলা হচ্ছে, নারীর বিরুদ্ধে ফতোয়াবাজির একটি দৃষ্টান্ত কুষ্টিয়ার এই ঘটনা।
এই প্রচারণার মাধ্যমে আমরা সবাই জেনেছি, কুষ্টিয়ার এক মসজিদের নারীবিদ্বেষী ইমাম নারীদের ঘরের বাইরে, ক্ষেতের মাঠে যেতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ফতোয়া দিয়েছেন। তার সাথে রয়েছে মসজিদ কমিটি।

কিন্তু আসলেই কি ঘটনাটা এরকম? মানে, ইমাম সাহেব ফতোয়া জারি করেছিলেন, যা মিডিয়ার ভাষায় ‘ফতোয়াবাজি’? ধর্মীয় বিবেচনা, নারীর পর্দা ইত্যাদি বিষয় ইমাম সাহেবের ঘোষণার লক্ষ্য ছিলো?

প্রথম আলোর আরেকটি রিপোর্টই এই ধারণা নাকচ করে দিচ্ছে। মানে, ঘটনাটা ইমাম বা অন্য কারো ধর্মীয় বিচার-বিবেচনাকে কেন্দ্র করে ঘটেনি। এটি পুরোপুরি একটি স্থানীয় কৃষক-শ্রমিকদের ‘জীবিকার দ্বন্দ্ব’। যাতে ধর্মীয় রঙ লাগিয়ে বিক্রি করেছে মিডিয়া।

প্রথমেই প্রথম আলোর প্রথম রিপোর্টটা পড়া যাক। ১২ আগস্টের রিপোর্টের শুরুতে বলা হয়েছে, “ফসলের ক্ষতি’ ও ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’-এর অজুহাতে নারীদের মাঠে যাওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। মাইকে তা প্রচারও করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, নারীদের যাতায়াত বন্ধে ও ফসল রক্ষায় মাঠে চৌকিদার নিয়োগের জন্য গ্রামবাসীর প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।”

প্রথম আলোর প্রথম রিপোর্ট থেকে-১

পরের প্যারায় লেখা হয়েছে– “গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের কল্যাণপুর জামে মসজিদের মাইক থেকে এমন ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আগে নারীদের মাঠে যাওয়া বন্ধ করতে বৈঠক হয়। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তা মাইকে কয়েক দফায় ঘোষণা করা হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কল্যাণপুর জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি আলতাফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান, মসজিদের ইমাম আবদুল মালেক আজাদী, পেশ ইমাম আবু মুছা, সহসভাপতি মজিবর রহমান প্রমুখ। মাইকে কয়েক দফা নারীদের মাঠে যাওয়া বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রচার করেন ওই মসজিদের মুয়াজ্জিনের ছেলে রুহুল আমিন সেখ।”

তৃতীয় প্যারাতেই প্রথম আলো আশ্রয় নিয়েছে একজন ধর্মীয় বিশেষজ্ঞের। প্যারাটি হুবহু তুলে ধরা হলো, “ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘পর্দা শুধু নারীর নয়, পুরুষের জন্যও পর্দা আছে। পর্দার মধ্যে থেকে নারী ও পুরুষের কাজ করার অধিকার আছে। নারী কর্ম করতে পারবে না কোরআন-হাদিসে কোথাও বলা নেই। যাঁরা এ ধরনের নির্দেশ দিয়েছেন তাঁরা অদক্ষ, অযোগ্য আলেম।’ নারীদের কাজের প্রসঙ্গে মহাপরিচালক বলেন, ফাউন্ডেশন বিভিন্ন জেলায় মক্তবে শিক্ষকতা করা ৫০০ নারীকে ঢাকায় এনে প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে।”

পর্দা! মানে ধর্ম, মানে ইসলাম, মানে ইমাম সাহেবের ফতোয়াবাজি। খুবই সোজা ব্যাপার। প্রথম আলো এই এঙ্গেলেই পুরো রিপোর্টটি দাঁড় করিয়েছে; যা পড়ে যে কোনো বোধ সম্পন্ন পাঠক ক্ষেপে যাবে ওই ইমামের ওপর। নারী বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারবে না- এই ফতোয়া জারির অধিকার তাকে কে দিয়েছে? আবার গ্রামের দরিদ্র এই নারীদের অনেকের কাজের ওপরই নির্ভর করে তাদের পরিবারের জীবন-জীবিকা।

চতুর্থ প্যারায় পাঠকের ক্ষোভ আরেকটু জাগিয়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কল্যাণপুর গ্রামেরদুজন নারী প্রথম আলোকে বলেন, পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও কৃষিকাজে সহযোগিতা করেন। এখন তাঁরা মাঠে যাবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন।”

অর্থাৎ, এই ফতোয়ার কারণে এমন সব নারী সমস্যায় পড়েছেন, যারা মূলত মাঠে কৃষিকাজ করে থাকেন। দারিদ্রের কারণে গ্রামে বহু পরিবারের নারীরা পুরুষের সাথে মাঠে কাজ করেন। এটা তারা খুব শখে করেন না। বাধ্য হয়েই করেন। এই বাধ্য হওয়া মানুষগুলোর পেটে লাথি মারলেন ‘উগ্র নারীবিদ্বেষী’ ইমাম সাহেব! যে কারো ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠার কথা।

প্রথম আলোর প্রথম রিপোর্ট থেকে-২

প্রথম আলো তাদের ঘটনাটিতে ‘ধর্মীয় রঙ’ লাগানোর প্রাথমিক পর্যায়ে থামেনি; চুড়ান্ত পর্যায়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, জঙ্গিবাদ পর্যন্ত টেনে নিয়েছে। এই টেনে নেয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা নেয়া হয়েছে আরেকজন বিশেষজ্ঞের।

এই প্যারাটিও হুবুহু ‍তুলে দিলাম– “সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একদিকে উন্নয়নের রোল মডেলের কথা বলছি। অন্যদিকে ব্যাক গিয়ারে চলছি। নীতিনির্ধারকেরা যদি যথাসময়ে ব্যবস্থা না নেন গ্রামগঞ্জে হলি আর্টিজানের মতো ঘটনা ঘটতে সময় লাগবে না। এই ধরনের ঘটনা প্রতিহত করার এখনই সময় এবং তা সরকারকেই করতে হবে। এ ধরনের ঘটনা প্রশমন করা না গেলে, ব্যবস্থা না নিলে অন্যরাও এর সুযোগ নেবে।”

নীতিনির্ধারকরা যদি যথাসময়ে সজাগ না হন, তাহলে কুষ্টিয়ার এই ইমাম সাহেবরা হলি আর্টিজানের মতো জঘন্য জঙ্গিবাদী ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবেন! কী ভয়াবহ উগ্রবাদী কাণ্ডই না ঘটিয়েছেন ইমাম সাহেব।

রাশেদা কে চৌধুরী আরো কিছু কথা বলেছেন। এখানে আর টানছি না। লিংকে গিয়ে পড়ে ফেলতে পারেন।

পাঠক এখন নিশ্চিত হয়েছেন যে, ইমাম সাহেব ‘ধর্মের নামে’ জঘন্য ফতোয়াবাজি করে গ্রামের দরিদ্র মানুষের পেটে লাথি মারছেন, আর জঙ্গিবাদ উস্কে দিচ্ছেন।

এবার দেখা যাক পরের দিন ১৩ ডিসেম্বর প্রথম আলোর ফলোআপ রিপোর্টটি। শিরোনাম “গতকালও মাঠে যাননি নারীরা: নারীদের মাঠে যেতে মানা করার অভিযোগে আটক ৩”। এই রিপোর্টের তথ্য ঘটনাকে ভিন্ন মাত্রা দিচ্ছে। খেয়াল করবেন।

রিপোর্টের মাঝখান থেকে চারটি প্যারা হুবহু তুলে ধরছি–

//
“গতকাল দুপুরে কল্যাণপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জামে মসজিদের সামনে কয়েকটি দোকানে স্থানীয় বাসিন্দারা বসে গল্পগুজব করছেন। তাঁরা জানান, গ্রামে প্রায় ৮০০ পরিবারের ২ হাজার ৪০০ মানুষের বাস। অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাড়িতে থাকা নারীরা দুই থেকে চারটা করে ছাগল ও গরু লালনপালন করেন।

পুরুষেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এসব পশুর খাবারের জন্য নারীরা গ্রামের মাঠে যান। সেখানে গিয়ে তাঁরা ফসল কেটে নিয়ে আসেন। মাঠে থাকা ফসল তছরুপ করেন। তাঁদের বারণ করা যায় না। এসবের সঙ্গে গ্রামের শেখপাড়া ও কামারপাড়ার নারীরা বেশি জড়িত। তবে চুরির ঘটনার সঙ্গে কিছু পুরুষও জড়িত বলে জানান তাঁরা। অতিষ্ঠ হয়ে তাঁরা মসজিদে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেন গ্রামের মাঠে কোনো নারী যেতে পারবেন না।

শেখপাড়া ও কামারপাড়া এলাকায় গিয়ে এই প্রতিবেদক অন্তত সাতজন নারী ও দুজন পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন। নারীরা ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, মাঠে যাওয়া নিষেধ—মসজিদের মাইকে এমন প্রচারের পর থেকে তাঁরা মাঠে যাননি। এতে ছাগলের খাবারও সংগ্রহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমনকি মাঠে থাকা পুরুষদের খাবারও তাঁরা নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী জানান, সব নারীই কি চুরি করেন? দু-একজনের দায় কেন সব নারীর ওপর বর্তাবে। তা ছাড়া পুরুষেরাও তো মাঠে গিয়ে চুরি করে ফসলের ক্ষতি করেন। তাঁদের বেলায় কেন কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি হচ্ছে না?”
//
এই তথ্যগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দরকার নেই। রিপোর্টারকে স্থানীয় নারী ও পুরুষরা যেসব কথা বলেছেন ও তথ্য দিয়েছেন তাতে স্পষ্ট তাদের পারস্পরিক বিরোধে ধর্মীয় কোনো উপাদান নেই। বিষয়টা পুরোপুরি ছাগল পালনকারী শ্রমজীবী নারী ও দরিদ্র কৃষকের জীবিকার দ্বন্দ্ব। এখানে কে অপরাধী, কে ভুক্তভোগী, কিম্বা উভয়েই পরিস্থিতির শিকার কী না- এসব নিয়ে এবং কিভাবে তারা উভয়পক্ষ নিজেদের ফসল আর ছাগলকে রক্ষা করে দুমুটো খাবার জোগাড় নিশ্চিত করবেন- তার উপায় বাতলে দেয়া নিয়ে আলাপ আলোচনা হতে পারে।

কিন্তু কোনোভাবেই এই দ্বন্দ্বের জের ধরে পুরুষপক্ষ কর্তৃক মসজিদের মাইকে দেয়া ঘোষণাকে ‘ধর্মীয় ফতোয়াবাজি’ ‘পদা-বেপর্দার দ্বন্দ্ব’ ‘উগ্র জঙ্গিবাদী মানসিকতার প্রদর্শন’, ‘ইমাম সাহেবের নারীবিদ্বেষ’ বলে চালানোর সুযোগ নেই। কারণ এখানে ‘মসজিদের মাইক’ ধর্মীয় উপাসনার অবলম্বন হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি, হয়েছে ‘ঘোষণার যন্ত্র’ হিসেবে। আর ইমাম সাহেব ‘ধর্মীয় নেতা’ হিসেবে ‘নিজের ইচ্ছায়’ ‘ফতোয়া’ দেননি। বরং, ‘মাইকের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে ‘গ্রামের কৃষক/মাতব্বরদের অনুরোধে’ একটি ‘ঘোষণা’ দিয়েছেন মাত্র।

উপরের আলোচনায় সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, প্রথম রিপোর্টটিতে প্রথম আলো ঘটনার যে ধর্মীয় আবহ তৈরি করেছিলো, দ্বিতীয় রিপোর্টের তথ্য সেটার সাথে সাংঘর্ষিক। কিন্তু প্রথম রিপোর্টটি তোলাপাড় সৃষ্টি করে যে ভুল ধারণাটি ছড়িয়েছে সারাদেশের মানুষের মধ্যে তা ভাঙার কোনো চেষ্টা দ্বিতীয় রিপোর্টে ছিলোনা। অথচ, ফলোআপ তথ্য আগের প্রাপ্ত তথ্যের চেয়ে ভিন্ন হলে নতুন তথ্যটি আগের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা গণমাধ্যমের দায়িত্ব।
কুষ্টিয়ার ঘটনাটাকে আরেকটু পরিস্কারভাবে বুঝতে বাংলাদেশের স্বনামধন্য নারী অধিকারকর্মী ফরিদা আখতারের একটি লেখা (মূলত অনুসন্ধানী রিপোর্ট) পড়ে দেখা যেতে পারে।

১৬ ডিসেম্বর chintaa.com এ “কলা আর ছাগল, ধর্ম নয়: গ্রামে জীবিকার দ্বন্দ্ব” শিরোনামে তার লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে। পাঠকদের পুরো লেখাটিই পড়া উচিত বলে মনে করি। কিন্তু টেক্সট আকারে দিলে এই লেখার কলেবর বড় হয়ে যাবে, তাই স্ক্রিনশট আকারে পুরো লেখা নিচে তুলে দিলাম। এখানে শুধু কয়েকটি লাইন দিচ্ছি।

“এই দুই ভিন্ন জীবিকার লড়াইয়ে কৃষক এবং ভূমিহীন ছাগল পালন কারী নারীদের মূখোমুখি অবস্থান। কৃষক তার কলার বাগান রক্ষা করার জন্যে উদ্যোগ নিয়েছে। এই ঘটনা এবার শুধু নয়, বেশ কয়েকবছর ধরে চলছে। ছাগলকে খাওয়ানোর জন্যে কলার পাতা ও গাছ কাটা প্রতিরোধের জন্য প্রতি বছর সমাজের কিছু মানুষ, বিশেষ করে কৃষক, তাদের ফসল রক্ষার্থে পালাক্রমে ফসলের মাঠ পাহারা দেন। এবং আরো একটু শক্তভাবে বন্ধ করার জন্যে মসজিদের মাইকের সাহায্যে ঘোষণা দেন “আগামী দুই বা এক মাসের মধ্যে কোন নারী ক্ষেতে যেতে পারবে না”। এই ধরণের ঘোষণা আগেও দেয়া হয়েছে। এভাবে কড়াকড়ি ঘোষণা দিলে কিছুদিন কম থাকে। ফসল উঠে যাবার পর আবার নারীরা মাঠে যেতে পারে। গত ৭/৮ বছর ধরে আশে পাশে কয়েকটি গ্রামে এভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়। মোট কথা হচ্ছে বিষয়টা মেয়েদের মাঠে যাওয়া কেন্দ্রিক নয়, কৃষকের কলার বাগান ছাগল পালনকারী নারীদের হাত থেকে রক্ষার জন্যে করা হয়েছে। ঘোষণাটি একেবারে সাময়িক সময়ের জন্যে। ছাগল পালন কারী নারীদের কষ্ট হলেও তারা বিষয়টা বোঝেন এবং গ্রামীণ সমাজের অন্তর্ভূক্ত বলে সংঘাতেরক্ষেত্র সম্পর্কে তাঁরা অবহিত, এর মনে করে এর মীমাংসা তাঁর সমাজেই সম্ভব। কয়েক মাস ছাগল সামলে রাখা সামাজিক মীমাংসার অংশ।”

এই কথাগুলো প্রথম আলোর দ্বিতীয় রিপোর্টে আসা তথ্যের সাথে মিলে যায়। এর সাথে চলতি বছরের শুরুতে সময়টিভির করা একটি রিপোর্ট মিলিয়ে দেখা যেতে পারে।

গত ১১ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনটির শিরোনাম হচ্ছে, “শৈলকূপায় প্রায় অর্ধশত গ্রামে ছাগল পালন নিষিদ্ধ”। ইন্ট্রোতে লেখা হয়েছে, “ঝিনাইদহের শৈলকূপায় প্রায় অর্ধশত গ্রামে ছাগল পালন নিষিদ্ধ করেছে গ্রাম প্রধানরা। ক্ষেতের ফসল খাওয়ার জের ধরে দীর্ঘদিন ধরে এ নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। এতে স্থানীয় বাজারে দেখা দিয়েছে খাসির মাংসের সংকট। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি। বিষয়টি স্বীকার করে জেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলছেন, দ্রুত সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।”

কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ পাশাপাশি জেলা, এবং দুটি জেলাই ছাগল পালনে জাতীয় পর্যায়ে বেশ নামকরা। এ সংবাদটি থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, ছাগল পালন নিয়ে ওই এলাকাগুলোতে সমস্যা বেশ পুরোনো। কুষ্টিয়ার কল্যাণপুর গ্রামেই প্রথম হয়নি।

এবার দেখা যাক স্থানীয় নারী ইউপি সদস্যের বক্তব্য কী?

চিন্তা ডটকমকে “ইউপি সদস্য জাহানারা বেগম বলেন, নারীদের নিয়ে কোন খারাপ মন্তব্য করলে আমি একজন নারী প্রতিনিধি হয়ে ছেড়ে দিতাম না। আমরা নিজেরাও বুঝতে পারছি না এত পুলিশ,এতো সাংবাদিক কিসের জন্য আসছে! এটা শুধু মাত্র ফসল চুরি এবং গাছের ক্ষতির কথা ভেবে ঘোষণা দেওয়া। ইমাম সাহেব নিজের সিদ্ধান্তে তা করেন নি, তাঁর কোন দোষ ছিল না। তাকে এলাকার মানুষ ঘোষণা দিতে বলেছেন তাই দিয়েছেন। ইমাম সাহেবকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় ঐ মসজিদে আর ভয়ে কেউ আযান দিচ্ছে না, মানুষ নামাজ ও পড়ছে না।”

মাঠের বাস্তবতা যখন এই, তখন ঢাকায় বসে প্রথম আলো ১৪ ডিসেম্বর রোকেয়া রহমানের কলাম ছাপিয়েছে “ফতোয়ার নামে স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হবে কবে?” নিজেদের রিপোর্টার মাঠে গিয়ে মানুষের সাথে কথা বলে কথিত ‘ফতোয়াবাজি’র অভিযোগ পেলেন না, তখন ওই ঘটনাকে ‘ফতোয়াবাজি দৃষ্টান্ত’ হিসেবে তুলে ধরে লেখা কলাম ছাপালো প্রথম আলো! সাধারণভাবে পত্রিকাটির মানসম্পন্ন রিপোর্টিংয়ের যে প্রশংসনীয় ধারা তা এই ইস্যুতে একেবারে অনুপস্থিত।

আর প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুসরণ করে বাকিরাও ‘কোপ’ চালিয়েছে সমানতালে! ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনের টুইস্ট করা শিরোনাম, “ফতোয়ার স্টাইল: নারীরা ফসলের জন্য ক্ষতিকর”। কালের কণ্ঠের শিরোনাম “নারীদের কৃষি কাজ করার বিরুদ্ধে ফতোয়া ইমাম সহ গ্রেপ্তার ৬”। সময়টিভির শিরোনাম, “নারীরা জমিতে কাজ করতে পারবে না, ফতোয়া দেয়ায় ইমাম আটক”। এভাবে জাতীয় সব সংবাদমাধ্যমই ঘটনাটিকে ধর্মীয় রঙে রাঙিয়ে ‘ইমামের ফতোয়া জারি’ আকার পরিবেশন করেছে। কেউ মূল ঘটনা কী তা তুলে ধরার প্রয়োজনবোধ করেনি।

লেখক : সাংবাদিক

Comments

comments