সব গুমে সরকার দায়ী : রিজভী

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করে বলেছেন, এদেশে চলমান সকল গুমের জন্য দায়ী বর্তমান সরকার। বিচারবহির্ভূত হত্যা আর গুমের কর্মসূচি হচ্ছে অবৈধ ক্ষমতা ধরে রাখার গ্যারান্টি। তাই এই সন্ত্রাসী পথ থেকে সরকার সরে আসতে পারবে না নিজেদের স্বার্থেই। সেজন্যই বাংলাদেশকে লাশের দেশে পরিণত করা হয়েছে।

আজ শনিবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে রিজভী বলেন, গত কয়েকদিন ধরে আবারো বিচারবহির্ভূত হত্যার মাত্রা বৃদ্ধি করা হয়েছে। রক্তপাতের বিভীষিকা টিকিয়ে রাখতে এরা নিজের মর্জি ও প্রয়োজনমাফিক সংবিধান সংশোধন ও আইন রচনা করে চলেছেন। জালিমশাহীর হিং¯্র আঁচড়ে ক্রমাগত জর্জরিত জনগণ যাতে প্রতিবাদমূখর হতে না পারে তার জন্যই ক্ষমতাসীনরা ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বিভৎস তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে।

নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলন হয়। এসময় কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব উন নবী খান সোহেল, অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

লিখিত বক্তব্যে রুহুল কবির রিজভী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গুমের বিষয়ে প্রশ্ন রেখে বলেন, গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন-আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় নিখোঁজরা ফিরতে শুরু করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আমাদের প্রশ্ন-তাহলে কাদের তৎপরতায় নিখোঁজ ব্যক্তিরা গুম হয়েছিল? যারা দীর্ঘ ৯ বছর ধরে ভীতির শিহরণে গোটা জাতিকে রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে গুমের হিড়িক চালিয়েছে তারা কারা? তাহলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী কী আমরা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সাইফুল ইসলাম হিরু, পারভেজ, সুমন, খালেদ হোসেন সোহেল, কাজী ফরহাদ, মোঃ জহির, সুজন, সেলিম রেজা পিন্টু, ছাত্রনেতা জাকিরসহ গুম হওয়া কমপক্ষে ৭৫০ জন বিএনপি নেতাকর্মীদের ফিরিয়ে পেতে অপেক্ষা করবো? নিখোঁজ কয়েকজনকে ফেরত দেয়ায় গুম থাকা ব্যক্তিদের পরিবারগুলো কী তাহলে তাদের ফিরিয়ে পেতে আশায় বুক বাঁধবে? বিএনপি নেতাকর্মীদের বাইরেও সাবেক সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা, আইনজীবী, রাষ্ট্রদূত, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী যারা গুম হয়েছেন তাদের পরিবারও নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় আছে। তাদেরকে ফিরিয়ে দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি প্রশাসনে পদন্নোতির সমালোচনা করে বলেন, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ১৯৬ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতিসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। যা নজিরবিহীন। আওয়ামী লীগের আমলে বলেই তা সম্ভব। এবারো শত শত যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তাকে পদোন্নতি বঞ্ছিত করা হয়েছে। যোগ্যতা থাকার পরও পদোন্নতি না পাওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকেই। গভীর রাতে পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। গভীর রাতে ১৯৬ কর্মকর্তার যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা রহস্যজনক এবং সর্বমহলে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। এসএসবির ফিটলিস্ট অনুযায়ী অনেক যোগ্য ও উপযুক্ত কর্মকর্তাকেও পদোন্নতি দেয়া হয়নি। এ ছাড়া আরো বেশকিছু কর্মকর্তার নাম ফিটলিস্টভুক্ত করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে।

রিজভী বলেন, বর্তমান ভোটারবিহীন সরকার দলীয়করণের মাধ্যমে গোটা প্রশাসনকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। বার বার যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা, অযোগ্য দলীয় লোকদের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়ে রাখা, দলীয় লোকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া এবং পদের তিনগুণের বেশী পদোন্নতি দিয়ে প্রশাসনের ভারসাম্য ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। বার বার পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে যোগ্য কর্মকর্তারা হতাশা থেকে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা আত্মহত্যাও করেছে। যা জাতির জন্য খুবই লজ্জার।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন-আওয়ামী লীগই আগামীতে ক্ষমতায় আসবে। তার উদ্দেশ্যে বলতে চাই-তাহলে কী আপনারা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনের মতো আরেকটি নির্বাচনের নীল নকশা প্রস্তুত করে রেখেছেন? ভোটারবিহীন নির্বাচনে এতটাই মজা পেয়েছেন যে, তারা সেই অবৈধ পথ ছাড়তে চাচ্ছেন না। ওবায়দুল কাদের সাহেবের এই বক্তব্য আগামী নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা ও ষড়যন্ত্রের ক্ষণে ক্ষণে একটা নৈরাজ্যের কালো রাতের আভাস মেলে। কিন্তু এবারেই দু:শাসনের ঘন অন্ধকারের অবসান ঘটবে। মানুষের ঘৃণা-ধিক্কারে অবৈধ ক্ষমতাসীনরা আর টিকে থাকতে পারবে না। ভোটারবিহীন নির্বাচনের স্বপ্ন আর পূরণ হবে না। বিভীষিকাময় রক্তাক্ত প্রান্তর সৃষ্টি করে আর প্রধানমন্ত্রীত্ব করা যাবে না।

এছাড়া গতকাল বরিশালের গৌরনদী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক গাজী আবু বকর এর ওপর একদল সশস্ত্র আওয়ামী দুস্কৃতিকারি হামলা চালিয়ে ভয়ানকভাবে আহত করেছে। হামলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার ডান চোখটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি মূমুর্ষ অবস্থায় বর্তমানে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আমি সরকারী বর্বর দলের কাপুরুষোচিত এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও ধিক্কার জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি করছি।

গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৭ মিথ্যা মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আদালতে হাজিরা শেষে ফেরার পথে তার গাড়িবহরের সাথে থাকা বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায় ও বেধড়ক লাঠিচার্জ করে অসংখ্য নেতাকর্মীকে আহত করে। ঢাকা মহানগরীর দারুস সালাম থানা বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবির এবং দক্ষিণখান থানা বিএনপি নেতা আলী আকবর রাজু গুরুতর আহত হয়ে এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এছাড়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাহবাগ থানা বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেন নওয়াব, রফিকুল ইসলাম স্বপন, আবু সুফিয়ান, মোর্শেদ আলম, সাইফুল ইসলাম, কদমতলী থানা বিএনপি নেতা সাদ্দাম হোসেন, সালাহউদ্দিন গুরুতর আহত হয়েছেন। পুলিশ শুধু লাঠিচার্জ করেই ক্ষান্ত হয়নি অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতারও করে।

গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছেন-ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ওয়ারী থানা বিএনপি নেতা রাহাত এবং সুত্রাপুর থানা বিএনপি নেতা সোনা মিয়া, রমনা থানা বিএনপি নেতা আবদুল মোতালেব, রুবেল, সোহেল, মহিউদ্দিন, রুবেল সারোয়ার, ইব্রাহিম, ইসমাইল হোসেন, আল আমিন, মিজানুর, আবদুর রশীদসহ অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আমি পুলিশের এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের নি:শর্ত মুক্তি দাবি করছি।

Comments

comments