এল ক্লাসিকোয় স্পেন ও কাতালোনিয়ার উন্মাদনা

এল ক্লাসিকো বরাবরই ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এক লড়াই। শুধু দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনার মধ্যে খেলা বলেই নয়, গত কয়েক বছর ধরে লড়াইটা হয়ে গেছে বিশ্ব সেরা দুই ফুটবলারের লড়াই, লিওনেল মেসি আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সম্মানের লড়াই।

‘এল ক্লাসিকো’ জাঁকজমকের মাঝে তাই সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করে থাকে এই দুটি নামই। যাদের মধ্যে সেরার লড়াইটা অমীমাংসিত আছে, থাকবে হয়তো সারাজীবন।

শনিবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ছয়টায় যখন সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে গড়াবে মৌসুমে লা লিগার প্রথম এল ক্লাসিকো, তখন স্পেনের সময় দুপুর একটা। দুপুরের খাবার হাতে নিয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনার খেলা দেখবেন স্প্যানিশ দর্শকরা। খাবার হয়ত হাতে থাকবে, কিন্তু ম্যাচের উন্মাদনায় মুখে তোলার চিন্তাও অনেকে ভুলে যাবেন!

কারণ ম্যাচটার নাম এল ক্লাসিকো। খেলার চাইতেও বেশি কিছু! মাঠের বাইরেও যে ম্যাচকে ঘিরে চলে রাজনীতি। স্পেন তো বটেই, পুরো বিশ্ব ভাগ হয়ে যায় রিয়াল-বার্সার সমর্থনে। কেবল মাত্র তিন পয়েন্ট দখলের লড়াই নয়; স্পেনের রাজকীয় আভিজাত্য বনাম কাতালোনিয়ার শাসিত জনগণের আবেগের মূল্য কত, সেটা নিয়েই চলে আরেক লড়াই। দেখে নেয়া যাক কেন ম্যাচটি খেলার চেয়েও বেশিকিছু-

স্প্যানিশ রাজনীতি ও ফুটবলের লড়াই মিলে যাবে যে বিন্দুতে
শনিবারের এল ক্লাসিকোর ৩৬ ঘণ্টা পরেই স্থানীয় নির্বাচনে ভোটদান ক্ষমতা হারাবে স্বাধীনতার জন্য হাহাকার করতে থাকা কাতালোনিয়ার জনগণ। সেক্ষেত্রে রিয়ালের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যু হতে পারে কাতালানদের প্রতিবাদের মোক্ষম জায়গা। পিকে, ইনিয়েস্তাদের মতো কাতালান খেলোয়াড়রা যে এজন্য তেঁতে থাকবেন সেটা অনুমান করছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পাবলো সিমন।

বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সিমন জানাচ্ছেন, এবারের এল ক্লাসিকো মাঠে জন্ম দিতে পারে বিশেষ কোন মুহূর্তের ‘কাতালানদের খুব শক্তিশালী একটা মতাদর্শ আছে। যে কারণেই বার্সার মূলনীতি হল, ক্লাবের চাইতেও বেশি কিছু! আর রিয়াল মাদ্রিদের ভক্তরা সাধারণত রক্ষণশীল, জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের।’

এস্তেলাদা বনাম ভিভা এস্পানা
এল ক্লাসিকোতে বার্সার মাঠ ন্যু ক্যাম্প আর রিয়ালের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যু যেন পরিণত হয় ভিন্ন দুই রণক্ষেত্রে।

ন্যু ক্যাম্পে পতপত করে ওড়ে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার প্রতীক, পতাকা ‘এস্তেলাদা’। ম্যাচের ১৭ মিনিটে সমস্ত কাতালান সমর্থকরা গেয়ে ওঠে গান। ১৭১৪ সালে স্পেনের কাছে নিজেদের স্বাধীনতা হারানোর কথা মিশে থাকে যে গানের সুরে।

চলতি অক্টোবরে যখন স্বাধীনতার দাবিতে পুলিশের হাতে মার খাচ্ছে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাকামীরা, তখন বার্নাব্যুতে উড়েছে স্পেনের পতাকা। স্টেডিয়ামজুড়ে বেজেছে জাতীয় সঙ্গীত ‘ভিভা এস্পানা’। এবারের ২৩ ডিসেম্বর এল ক্লাসিকোতেও ঘটতে পারে এরকম কিছুই।

স্পেনকে থমকে দেয়া এক ম্যাচ
‘এ এমন এক ম্যাচ, যেটা স্পেনের সমস্ত কার্যক্রম স্থবির করে দেয়। এজন্য এই সময়টাতে আমরা থিয়েটার কিংবা সিনেমা হলে যাওয়ার জন্য বলি। কারণ, টিভির সামনে আর মাঠ ছাড়া সবকিছু তখন থাকে ফাঁকা।’

এল ক্লাসিকোর প্রভাব বোঝাতে এমন উদাহরণ টেনেছেন পাবলো সিমন। শুধুমাত্র স্পেন নয়, পুরো বিশ্বজুড়ে এই ম্যাচ উপভোগ করেন ৬০০ মিলিয়নেরও বেশি দর্শক। লড়াই কেবল ক্লাবে ক্লাবে নয়, বিশ্বের সেরা দুই ফুটবলার রোনালদো বনাম মেসিরও।

রিয়াল মাদ্রিদের ঘরের মাঠ, অথচ লিওনেল মেসির প্রিয় জায়গা স্যান্তিয়াগো বার্নাব্যু! একটু খটকা লাগছে তো? না, মেসি নিজের মুখে এমন কথা বলেননি। তবে বার্সেলোনা প্রাণভোমরা বরাবরই বার্নাব্যুর মাঠে সফল, এই মাঠে রিয়ালের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নও তিনিই।

পরিসংখ্যান বলছে, রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ২৪টি গোল আছে লিওনেল মেসির। এর সিংহভাগ গোল কোথায় জানেন? বার্নাব্যুতে। ২৪ গোলের মধ্যে ১৪টিই এই ভেন্যুতে করেছেন মেসি। নিজের মাঠ ন্যু ক্যাম্পেও রিয়ালের বিপক্ষে এতো গোল পাননি।

Comments

comments