পরিবারপ্রতি প্রবাসী আয় কমে গেছে

পরিবারের কেউ বিদেশে থাকেন। প্রায় প্রতি মাসেই হয়তো বিদেশ থেকে টাকা পাঠান। এই টাকা দিয়েই পুরো সংসার চলে। সেই ‘বিদেশি টাকা’য় টান পড়েছে। পরিবারপ্রতি রেমিট্যান্স পাওয়া কমে গেছে। এখন একটি পরিবার বছরে গড়ে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৮০ টাকা রেমিট্যান্স পায়। ছয় বছরে আগে ওই সব পরিবারের গড় রেমিট্যান্স প্রাপ্তি ছিল ১ লাখ ৫১ হাজার ৮৯০ টাকা। ছয় বছরের ব্যবধানে পরিবারপ্রতি প্রবাসী আয় প্রায় ১৮ হাজার টাকা কমেছে।

এ তথ্য সরকারি সংস্থার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।

বিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পায় ঢাকা বিভাগের পরিবারগুলো। এই বিভাগের পরিবারগুলো বছরে গড়ে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা পায়। এরপর ময়মনসিংহের পরিবার পায় গড়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স পায় রংপুর বিভাগের পরিবার। বছরে গড়ে পরিবারপিছু প্রায় ৭৩ হাজার টাকা প্রবাসী আয় আসে সেখানে। এ ছাড়া সিলেটের একটি পরিবার গড়ে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা পায়। আর চট্টগ্রামে ১ লাখ ২৮ হাজার, রাজশাহী ১ লাখ ২৫ হাজার, বরিশালে ১ লাখ ১০ হাজার ও খুলনায় ৯২ হাজার টাকা আসে প্রতি পরিবারে।

২০১০ সালের খানার আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ওই সময়ে গড়ে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পেত চট্টগ্রামের পরিবার। টাকার পরিমাণ ১ লাখ ৬৮ হাজার। আর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স আসত বরিশালে, টাকার পরিমাণ ৯৫ হাজার।

বর্তমানে প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন। যাঁদের বড় অংশই থাকেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হয়েছে। ওই সব দেশে থাকা বিদেশিদের ওপর এখন কর বসানো হচ্ছে। সেখানে বাড়িভাড়া, খাবারসহ জীবনযাপনের খরচও বেড়ে গেছে। এসব কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের খরচ বেড়েছে। তাই তাঁরা আগের চেয়ে দেশে কম টাকা পাঠাতে পারেন। তাঁর মতে, মানি লন্ডারিং রোধের অংশ হিসেবে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কঠোরতার কারণে দেশের রেমিট্যান্স আনা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক কমপ্লায়েন্সের মধ্যে যেতে হচ্ছে। তাই অনেক প্রবাসী অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমেই টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছেন; যা হিসাবে আসছে না।

বৈশিষ্ট্য

এবারের খানার আয় ও ব্যয় জরিপে পরিবারগুলোর বৈশিষ্ট্য কেমন, তা তুলে ধরা হয়েছে। ৪৬ হাজারের বেশি পরিবারের ওপর এই জরিপটি করা হয়। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, সাড়ে ৯২ শতাংশ পরিবারের কোনো না কোনো সদস্যের কাছে মোবাইল ফোন আছে। এর মানে, ওই পরিবারে একটি মোবাইল ফোন ব্যবহৃত হয়। গত ছয় বছরে এই মোবাইল ফোন ব্যবহারের প্রবণতা অনেক বেড়েছে। ২০১০ সালের জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৬৩ শতাংশ পরিবারের সদস্যের কাছে মোবাইল ফোন আছে।

কম্পিউটার ব্যবহারে তেমন অগ্রগতি নেই। ছয় বছরের ব্যবধানে কম্পিউটার ব্যবহারের হার একই রকম আছে। মাত্র ৩ শতাংশের মতো পরিবার কম্পিউটার ব্যবহার করে। তবে ই-মেইল ব্যবহারে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। ছয় বছরের ব্যবধানে এই হার দেড় শতাংশ থেকে পৌনে ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এখন পৌনে ৮ শতাংশ পরিবারের কোনো না কোনো সদস্য ই-মেইল ব্যবহার করেন। শহরের ১৫ শতাংশ পরিবারের সদস্যরা ই-মেইল ব্যবহার করেন। মূলত মোবাইল ফোনেই তাঁরা ই-মেইল ব্যবহার করেন বলে বিবিএসের জরিপ বলছে।

জমানো টাকা বিপদের সঙ্গী

এবার আসি, কে কোথায় কীভাবে টাকা রাখেন। এবারের জরিপে দেখা গেছে, মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ পরিবারের একজন সদস্যের হলেও ব্যাংক হিসাব আছে। আর ১৫ শতাংশ পরিবারের সদস্যরা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখেন। ৫ শতাংশের বেশি পরিবার অনানুষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখে। আর বন্ধুবান্ধব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নেয় অন্তত ৩০ শতাংশ পরিবার। প্রতি পরিবারের গড়ে ঋণ আছে ৩৭ হাজার ৭৪৩ টাকা। সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার আওতায় আছে ২৮ শতাংশ পরিবার।

বিপদে পড়লে এ দেশের মানুষ টাকার জন্য কার কাছে হাত পাতে, সেই চিত্রও আছে। বিবিএসের জরিপ বলছে, প্রথমে সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করে। প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিবার জমানো টাকা দিয়ে যেকোনো বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে চায়। এরপর ২১ শতাংশ পরিবার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের মুখাপেক্ষী হয়।

Comments

comments