জাফর ইকবালের খন্ডিত ইতিহাস চর্চার নেপথ্যে

ইমতিয়াজ মির্যা

জাফর ইকবালের কাউন্টার ইতিহাস বিশ্লেষণ আর বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা ধরা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বরঞ্চ এইটাই ইতিহাসের এই সময়ে সাহসী কাজ হিসাবে উল্লেখ করা থাকবে।

জাফর ইকবাল আর তার অনুসারীরা একটা আবহ তৈরি করেছে যে জাফর ইকবালের ন্যারেটিভ বিরোধীতা করা কিংবা তার মোসাহেবী ধরিয়ে দিলে সেটা রাজাকারী। এইগুলা হচ্ছে পশ্চিমা পিসি পুলিশ, সোস্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়রদের বাংলাদেশী ভার্শন।

সে ব্যাখায় পড়ে আসি। জাফর ইকবালের লেখালেখির বিশ্লেষণটা খুব দরকার কারণ ছোট ছোট বাচ্চারা জাফর ইকবাল পড়ে বড়ো হয় তাদের কোন ধারণা থাকবে না এই পরম পূজনীয় শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিটি কি পরিমাণ মিথ্যাচার করতে পারে। সেটা ধরিয়ে দেয়াই আমাদের কাজ। এইভাবে সে আমাদের প্রজন্ম আর পরের প্রজন্মের ব্রেইনওয়াশ করেছে চেতনা দিয়ে। এই মিথ্যাবাদীতা আর ছলচাতুরী আর আওয়ামী গোলামি রোখার সময় এখনই।

জাফর ইকবাল যেভাবে লেখা শুরু করেন প্রথমে সবকিছুর আগে বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে আসেন, আবেগ ভরে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনান, মানুষের দেশপ্রেমের ফাপা বেলুন ভরেন মিথ্যা গর্ব দিয়ে।

অর্ধেক ইতিহাস বয়ান করেন। এরপর তিনি দেখান কিভাবে কিভাবে পাকিস্তান খারাপ (সাথে পাকিস্তান চাওয়া মুসলমানরা খারাপ)।
জাফর ইকবালকে বাচ্চাদের বাচ্চা বুদ্ধিজীবি বলার কারণ তিনি কখনো পাকিস্তান জন্মের আগে ভারতীয় উপমহাদেশের রিয়ালিটি নিয়ে কথা বলেন না। তার সব কথা শুরু হয় ১৯৪৭ থেকে, যেখানে মুসলমানরা সব হিন্দুদের মেরে সাফ করে দিয়েছিলো সেখান থেকে শুরু হয় ইতিহাস। এইপর তিনি শেখ মুজিবর রহমান কতবড়ো নেতা ছিলেন যে শহীদ সোহরাওয়ার্দি, ফজলুল হকদের সাথে আন্দোলনেও তাকে শামিল করান। মূলত সে সময় শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন ছোটখাট নেতা। আর শেখ মুজিবর রহমান যে পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য আন্দোলন করেছেন সে ইতিহাসটুকু ভুলে যান তিনি।

পাকিস্তান-ভারতের জন্মের সময়কার ইতিহাস, ব্রিটিশবিরোধী বয়ান কখনো চেতনাপন্থী বা জাফর ইকবাল বয়ান করেন না। কারণ সংখ্যালঘুদের রাজনীতির কথা বললেও তারা মুলত ভারতের নিজস্ব ন্যারেটিভ – হিন্দুত্ববাদী ন্যারেটিভ বয়ান করে।

জাফর ইকবাল কখনো হিন্দু তথা সংখ্যালঘুদের ভালো চাইতে পারেন না, কারন খন্ডিত ইতিহাস যারা বলে তারা আসলে একটা নির্দিষ্ট মতবাদের গোলাম। মুসলমানরা যে উপমহাদেশে সংখ্যালঘূ ছিলো, তারা যে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছিলো, জিন্নাহ যে প্রধানমন্ত্রীত্ব আর মুসলমানদের জন্য অটোনমি চেয়েছিলো, নেহেরু আর কংগ্রেস নেতাদের কারণেই যে দ্বিজাতিতত্ত্বের জন্ম হয় সেটা তারা কখনো উল্লেখ করেন না।

১৯৪৭ দাঙ্গার মধ্যে দিয়ে মুসলমানদের হিন্দু নিধনের মধ্য দিয়ে দেশ ভাগ হয় এইভাবে তারা ইতিহাস বয়ান করেন। অথচ প্রকৃত ইতিহাস হলো, মুসলমানরা ছিলো সংখ্যালঘূ, তাদের নিরাপত্তার চাহিদা ছিলো বাস্তব, কংগ্রেসের হিন্দু নেতারা ক্ষমতাভাগাভাগির ব্যাপারে অনড় ছিলো, মুসলমানদের অধিকারে ব্যাপারে কথা বলা জন্য নথুরাম গডসে ভারতের জাতির জনক গান্ধিকে খুন করে। নথুরাম গডসে আজকের বিজেপির হিরো। গান্ধিকে ব্রিটিশদালাল হিসাবে বিবেচেনা করা হয় ভারতে ।

জাফর ইকবাল আর তার দলবলের খন্ডিত ইতিহাস বলার কারণ আছে। খন্ডিত ইতিহাস বললে একদলকে ভালো আরেকদলকে খারাপ বলতে সুবিধা হয়। পাকিস্তানকে জাফর ইকবালরা সবচেয়ে খারাপ বলে উল্লেখ করেন অথচ পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙ্গালীরাই ছিলো অগ্রগামি তাদের কারণে পাকিস্তান আলাদা রাষ্ট্র হিসাবে আবির্ভুত হয়। মুসলিম লীগকে খারাপ হিসাবে দেখানো হয়। কিন্তু মুসলিম লীগের জমিদারী প্রথা বিলোপে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, যেটা সরাসরি এইদেশের ভূমিপুত্রদের জীবনে সবচেয়ে বেশী ভূমিকা রেখেছে।

ব্রিটিশরা চলে যাওয়াও কারো কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হয় নাই, সাধারণ মানুষ যেমন ছিলো তেমনই আছে, জমিদারী রদ করার কারণে ভূমিপুত্ররা নিজেদের জমি বুঝে পেয়েছে। মুসলিম লীগের পাকিস্তান হওয়ার পরের ভূমিকা যেমন আলোচনা করা উচিত, ৭১ এর ভূমিকা যেমন আমলে নেয়া উচিত, তেমন ব্রিটিশ বিরোধী মুসলিম লীগের ইতিহাস আমলে নিতে হবে। জাফর ইকবালরা কখনো পরিপূর্ণ ইতিহাস তোলে না।

জাফর ইকবালরা আরো অনেক কিছুর ইতিহাসই ভুলে যায়, যেমন পুর্ব পাকিস্তানের দুর্নীতির হিসাব, স্বাধীন বাংলাদেশের দুর্নীতির হিসাব। বাংলাদেশের জন্ম হবার আকাংখাটা ছিলো মূলত সিস্টেমেটিক শোষণের বিরুদ্ধে, অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে, বঞ্চনার বিরুদ্ধে। এমনকি ভোটে জিতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পাকবাহিনী গণহত্যা চালায় তার মূল কারণ ছিলো সুষ্ঠু নির্বাচন আর বাঙ্গালীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। এইসব ইতিহাস ধরে টান দিলে দেখা যাবে পাকিস্তানীরা যেসব লুটপাট দুর্নীতি আর অন্যায় অবিচার চালাতো, আমাদের বাংলাদেশে পাকিস্তানী প্রেতাত্মা যারা অর্থ্যাৎ বর্তমানের শাসকদল সে একই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে।

জাফর ইকবালের সাম্প্রতিক লেখাটায় মুক্তিযুদ্ধের গর্বোজ্জল ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধের আবেগঘন দিনলিপি ইত্যাদি বলার উদ্দেশ্য আসলে আপনাকে তৈরি করা শেষ পাঞ্চ লাইনটার জন্য। এই লেখার উদ্দেশ্য একটা লোক, তিনি হচ্ছে বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান।
জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া কোন অন্যায় ছিলো না আওয়ামী বুদ্ধিজীবিদের কাছে। সমস্যা বাধে যখন জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করেন আর সাফল্যের সাথে দেশ শাসন করে। ব্যক্তিগত জীবনে সৎ হওয়ার কারণে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা অনেক বেশী ছিলো। জাফর ইকবাল আওয়ামী লীগের বাটপার মন্ত্রী আর চাটুকারদের মতো বলে বসেন যে কেউ একজন ঘোষণা দিলেই, কোন মেজর ঘোষণা দিলেই স্বাধীনতা এসে যায় না।

ইতিহাস বয়ানের সময় একজন বুদ্ধিজীবির লেখা দরকার কিভাবে কিভাবে বিজয় অর্জিত হলো, কিভাবে কিভাবে সে সময় থেকে এই সময়ের পার্থক্য তৈরী হয়েছে। কিন্তু জাফর ইকবালের উদ্দেশ্য তা নয়। জাফর ইকবালের লক্ষ্য হচ্ছে জিয়াউর রহমানের অবদান ছোট করা, শেখ মুজিবর রহমানের অবদান বড়ো করে দেখানো।

জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা, উই রিভোল্ট বলে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়া, সেক্টর কমান্ডার হওয়া, জেড ফোর্সের নেতৃত্ব দেয়া এসব ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না। জিয়াউর রহমানকে ছোট করা একমাত্র কারণ জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা আওয়ামী লীগের ক্ষমতা দখল করে লুটপাট, তাদের দুর্নীতি আর অজনপ্রিয়তাকে আগেও চ্যালেঞ্জ করেছে আজো চ্যালেঞ্জ করছে। এই কারণে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া ব্যক্তিকে ছোট করে দেখাতে হয়। জাফর ইকবাল সৎ হলে শেখ মুজিবর রহমানের পাশাপাশি তাজুদ্দিন আহমেদ সহ সে সময় ছাত্র নেতা, সব সেক্টর কমান্ডার সর্বোপর জনসাধারণের আত্মত্যাগকে উঁচুতে তুলে ধরতেন।

শেখ মুজিবর রহমান এখন একজন কাল্ট লিডার। অথচ তার অবস্থান হবার কথা ছিলো দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে। জাফর ইকবালরা তাকে কাল্ট লিডার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে আওয়ামী লুটপাটের সহায়তার জন্য। এই কারণে শেখ মুজিবর রহমানের ভুলত্রুটি গুলো আলোচনা হয় না। ৭ই মার্চের ভাষণের আলোচনা হয় শেষ হয় কিন্তু এরপর পাকি কর্তৃপক্ষ সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে অস্বীকার করা ইত্যাদি আলোচনা হয় না।

এসব ঐতিহাসিক ভুল ছিলো কিন্তু শেখ মুজিবর রহমানের ভূমিকাকে বাংলাদেশের সৃষ্টির পিছনে ছোট করা হয় না। শেখ মুজিবর রহমানকে টোটেম ধরেই দেশের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশ চেয়েছিলো এটা মিথ্যা নয়। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাও ছিলো শেখ মুজিবর রহমানের পক্ষে।

জাফর ইকবালরা কেন মিথ্যা ইতিহাস বলে, ভারতীয় ন্যারেটিভ, ভারতীয় ভিজায় দিওসকে কেন চ্যালেঞ্জ করে না সেটা জানতে হবে বুঝতে হবে। ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে সাহায্যে করেছে স্ট্রাটেজিক্যাল কারণে। জাফর ইকবালরা এখনো ভারতের সেই স্ট্রাটেজিক ডিসিশনের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ভারতের বিরুদ্ধে একটা কথাও উচ্চারণ করে না। ভারতের মতো বন্ধুবেশী শত্রুর বিরুদ্ধে চুপ থাকা একজন দেশপ্রেমে গর্বিত মানুষের পক্ষে আশ্চর্যজনক ব্যাপারই বটে।

দলীয় বুদ্ধিজীবি হিসাবে জাফর ইকবাল ইনু, হাসান মাহমুদ এবং অন্যান্য ইডিয়টদের কাতারে নেমে আসছে। এটা ভালো লক্ষণ।
আওয়ামী লুটপাট আর ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতা দখল করা যারা নৈতিক সমর্থন দেয় তাদের মুখোশ যতো খুলবে ততো মানুষের কাছে সত্যটা প্রতিভাত হবে।

( ফেসবুক থেকে )

Comments

comments