ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে চাকরিতে রাখতে সরকারের আইন কর্মকর্তাদের এত চেষ্টা?

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা চাকরিতে ঢোকার সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দেননি, যদিও প্রত্যেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরিতে ঢোকার সময়ই তিনি মুক্তিযোদ্ধা কিনা এটা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্য যে সকল ক্রাইটেরিয়া থাকার কথা সেটিও দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার নেই। কিন্তু, ২০০৯ সালে সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির বয়স ২ বছর বাড়ানোর ঘোষণা দিলে দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা ভুয়া সার্টিফিকেট যোগাড়ের মিশনে নেমে পড়েন এবং অবশেষে সফলও হন। ২০১১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি নানা রকমের জাল-জালিয়াতি করে একটি সাময়িক মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র যোগাড় করতে সক্ষম হন এবং এটিকে ব্যবহার করেন চাকরির বয়স বৃদ্ধির কাজে।

অথচ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রজ্ঞাপন ও আদেশে এই মর্মে নির্দেশনা রয়েছে যে, চাকরিতে ঢোকার সময়ই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় চাকরির বয়স বৃদ্ধির সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এটিকে প্রধান ক্রাইটেরিয়া হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এরসঙ্গে আরও তিনটি ক্রাইটেরিয়ার কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো- মুক্তিবার্তায় নাম অথবা গেজেটে নাম অথবা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরযুক্ত সনদ। অবাক ব্যাপার হলো, এর কোনোটিই দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার নেই। তারপরও সেটিকে অমান্য করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে চাকরির বয়স বাড়িয়েছে। এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়েরও একটি চক্র মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে হানজালার অবৈধভাবে চাকরির বয়স বৃদ্ধির প্রত্যয়নে সহযোগিতা করেছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ইতিপূর্বে সড়ক বিভাগসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং দফতর-পরিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যয়নের আবেদন প্রত্যাখান করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই ক্রাইটেরিয়া পূরণ না করার কারণে। অথচ দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা ভুয়া সার্টিফিকেট যোগাড় করে সরকারকে ধোঁকা দিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থার শীর্ষপদে অতিরিক্ত ১ বছর চাকরি করে গেছেন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে তিনি অবৈধভাবে ওই অতিরিক্ত সময় চাকরি করার সুযোগ পেয়েছেন। এরপর এই যোগ্য (!) কর্মকর্তা আবার সরকারের কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও বাগিয়ে নিয়েছেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত হানজালার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চাইলেও পারছে না সরকারের আইন কর্মকর্তাদের নিয়মবহির্ভুত কার্যকলাপের কারণে।

জানা গেছে, উচ্চ আদালত ইতিমধ্যে দুই দফায় দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালাকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী পদে চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি স্থগিতের আদেশ জারি করেন। কিন্তু সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা, এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম চেম্বার জজ আদালতে নিজে গিয়ে জেরা করে আদালতের এই আদেশ স্থগিতের ব্যবস্থা করেন। অথচ সরকারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলায়ও এটর্নি জেনারেলকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠিতে মুক্তিযোদ্ধা ক্রাইটেরিয়া সম্পর্কে যা আছে
২০০৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর সরকার ১৯৭৪ সালের গণকর্মচারী আইন সংশোধন করে মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীদের অবসরের বয়স ৫৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৫৯ বছর করার ঘোষণা দেয়। আর তখন থেকেই সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট সংগ্রহের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। এরমধ্যে দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তারা অনেকেই ঘুষ দিয়ে, মোটা অংকের অর্থ খরচ করে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট যোগাড় করতে থাকে। পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ এবং সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্ত রিপোর্টে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা থামাতে সরকার এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করে দেয়। ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সচিবের স্বাক্ষরে সংস্থাপন সচিব বরাবর একটি চিঠি ইস্যু হয়। ‘মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীদের চাকরি হতে অবসর গ্রহণের বয়স বৃদ্ধি’ শিরোনামে ইস্যু করা ওই চিঠিতে মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীদের চাকরির বয়স বৃদ্ধির বিষয়ে ৪টি ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করে দেয়া হয়।

চিঠিতে বলা হয়, “বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, সরকার কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির বয়সসীমা ২ (দুই) বৎসর বৃদ্ধির আদেশ জারি হওয়ার পর এ সুবিধা নেয়ার জন্য অনেকেই নানা ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সনদ (সার্টিফিকেট) নেয়ার চেষ্টা করে।

২। নিম্নে বর্ণিত মানদণ্ডের আলোকে কোন সরকারি কর্মকর্তা/ কর্মচারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করা হবে:
যেসব কর্মকর্তা/ কর্মচারী সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন;
অথবা
যাঁদের নাম মুক্তিবার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল;
অথবা
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাদের নাম গেজেটে প্রকাশিত হয়েছিল;
অথবা
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাঁরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরযুক্ত সনদ (সার্টিফিকেট) গ্রহণ করেছেন।

৩। বর্ণিত অবস্থায়, সরকার এ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে, যেসব কর্মকর্তা/ কর্মচারী চাকরিতে প্রবেশের সময় বা আবেদন করার সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেননি অথবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরযুক্ত সার্টিফিকেট নেননি বা মুক্তিবার্তায়/ গেজেটে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি- কিন্তু, বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন বা সার্টিফিকেট নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে ৫৭ বছর চাকুরিকাল পরবর্তী অতিরিক্ত দুই বছর বর্ধিত চাকুরিকাল প্রযোজ্য হবে না।

৪। উপর্যুক্ত সিদ্ধান্ত অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।”

দুদকের তদন্তে অভিযোগ খন্ডন করতে পারেননি হানজালা
প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটে সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ জমা পড়ে। দুদকের পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ২০১৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এসব অভিযোগের কথা জানিয়ে জবাব চাওয়া হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৪ এপ্রিল, ২০১৬ এক চিঠিতে দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার কাছে বক্তব্য চায়। দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা ২০১৬ সালের ৯ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যে জবাব দাখিল করেন তাতে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো তিনি মোটেই খন্ডন করতে পারেননি। চাকরিতে প্রবেশের সময় তিনি কেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দেননি, এ ব্যাপারে হানজালা বলেছেন, ১৯৮১ সালে চাকরির আবেদনের সময় যে সকল তথ্য চাওয়া হয়েছিল তারমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার কোনও তথ্য চাওয়া হয়নি। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের মতে, দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, ১৯৭৩ সাল থেকে সরকারি চাকরিতে বায়োডাটার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা ঘোষণার প্রভিশন রাখা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা সকলেই এ ঘোষণা নিজে থেকেই দিয়েছেন। তাছাড়া হানজালা চাকরিতে ঢুকেছেন ১৯৮১ সালে। অথচ ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার বিষয়ে সরকারের কোনও দফতরে আবেদন করেছেন মর্মে দালিলিক প্রমাণ নেই। বরং তাকে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি হিসেবে সবাই বিবেচনা করতো।

দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরযুক্ত সনদ প্রাপ্তিতে ব্যর্থতা প্রসঙ্গে হানজালা বলেছেন, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার কারণে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরযুক্ত সনদ নিতে পারেননি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন হলো, ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পরই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। নতুন করে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাও তৈরি করা হয়। সেই তালিকা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের স্বাক্ষরযুক্ত সার্টিফিকেট ইস্যু করেন। মুক্তিযোদ্ধারা তা অর্জনও করেন। দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা যদি মুক্তিযোদ্ধা হতেন তাহলে অবশ্যই তখনকার তালিকায় তার নাম উঠতো এবং তা লাল মুক্তিবার্তায় ছাপা হতো। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরযুক্ত সার্টিফিকেটও পেতেন।

গেজেটভুক্তি সম্পর্কে দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা বলেছেন, তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ২২ জুলাই, ২০১৩। অথচ মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে ৪টি ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠিটি ইস্যু হয়েছে ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর। দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার বক্তব্য অনুযায়ীই, ওই চিঠি ইস্যু হওয়ার সময় পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে তার নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। মুক্তিবার্তায়ও দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার নাম ছিল না। পরবর্তীতে তদবির করে, অর্থ খরচ করে গেজেটে নাম তুলেছেন এবং এখন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করার ব্যবস্থা করেছেন। ওয়েবসাইটের এই তালিকার মধ্যে লেখা হয়েছে, ‘লাল মুক্তিবার্তা’। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এ ধরনের লেখা সম্পূর্ণ অবৈধ। কারণ, ‘লাল মুক্তিবার্তা’ বলতে শুধুমাত্র সেগুলোকেই বোঝায় যা ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল।

বস্তুত দেখা যাচ্ছে, সরকার কর্তৃক ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে চাকরির বয়স বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়ার সময় পর্যন্ত দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার কাছে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনও প্রমাণপত্র বা কাগজপত্র ছিল না। তিনি যে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এটাও কেউ জানতো না। বরং এলাকায় এবং চাকরিক্ষেত্রে তাকে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি হিসেবেই দেখা হতো। ২০০৯ সালে চাকরির বয়স বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়ার পর হানজালা রাতারাতি মুক্তিযোদ্ধা বনে যান। কীভাবে মুক্তিযোদ্ধা সনদ পাওয়া যায়, এ ব্যাপারে চেষ্টা-তদবির শুরু করেন। যিনি মুক্তিযুদ্ধের ধারে-কাছেই ছিলেন না এবং যার এ সংক্রান্ত কোনও কাগজ বা প্রমাণপত্রই নেই তিনি পেতে চান মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট, অত্যন্ত অস্বাভাবিক কাজই বটে! অবশেষে এই অস্বাভাবিক কাজে সফলও হলেন মানিকগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটিকে ম্যানেজ করে এই কাজে তাদের সহযোগিতা নিয়ে। তবে সবকিছু ম্যানেজ করে মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত করতে প্রায় সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় লেগে গেলো তার। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, জাল-জালিয়াতি করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করতেই এতোটা সময় লেগেছে।

অন্য একটি সূত্রে জানা গেছে, দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা দাবি করছেন, ২০০১ সালে সম্পাদিত (প্রকাশিত নয়) মুক্তিযোদ্ধা তালিকা এবং মুক্তিবার্তায় তার নাম ছিল। ‘সম্পাদিত’ শব্দটি এক্ষেত্রে ভৌতিক। কারণ, এটির কোনও দালিলিক প্রমাণ নেই। যে তালিকার কথা বলছেন সেটি আদৌ প্রকাশ হয়নি বলে হানজালা-ই জানিয়েছেন। তিনি এর সম্পর্কে যে কাগজ জমা দিয়েছেন তাতে দেখা যাচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আবদুল আহাদ চৌধুরীর নাম আছে নিচে স্বাক্ষরের জায়গায়, কিন্তু তাতে অধ্যক্ষ আহাদ চৌধুরীর স্বাক্ষর নেই। স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমা- কাউন্সিলের একজন কর্মচারীর, যার নাম খোন্দকার নুরুল ইসলাম, পদবী- প্রশাসনিক কর্মকর্তা। এই কাগজে তারিখ দেওয়া হয়েছে ২০১০ সালের ৯ মার্চ। অর্থাৎ পুরো বিষয়টিই ভুয়া।

বাস্তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার মতো আরও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ২০০৯ সালে ভুয়া সার্টিফিকেট যোগাড়ের ধান্দায় নামেন। এরাই ‘সম্পাদিত’ শব্দটি আবিষ্কার করেন। মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমা- কাউন্সিলের কিছু লোককে ম্যানেজ করে এরা এই মর্মে প্রচারণা চালান যে, ২০০১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু তালিকা ‘সম্পাদিত’ হয়েছিল, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসে যাওয়ার কারণে তা আর প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু এ ধরনের প্রচারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। বাস্তবে মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমা- কাউন্সিল সূত্রে জানা গেছে, কাউন্সিল যেসব তালিকা তৈরি করেছিল তা সবই প্রকাশিত হয়েছে ওই সময়ের লাল মুক্তিবার্তায়।

এটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের তৎপরতা, দুই মামলায় স্থগিতাদেশ
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার সাময়িক মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটকে চ্যালেঞ্জ করে গত ২৮ মে, ২০১৭ মুক্তিযোদ্ধা লীগের সহসভাপতি জিএম সাহেব আলী এবং মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল্লাহ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় আদালত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী পদে দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। কিন্তু, দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার পক্ষ হয়ে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নিজে উদ্যোগী হয়ে চেম্বার জজ আদালতে জেরা করে হাইকোর্ট বিভাগের আদেশ স্থগিতের ব্যবস্থা করেন।

পরবর্তীতে জনৈক মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহান খানও একইভাবে দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটকে চ্যালেঞ্জ করে আরেকটি রিট মামলা দায়ের করেন। এই মামলায়ও হাইকোর্ট প্রধান প্রকৌশলী পদে দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ তিন মাসের জন্য স্থগিতের আদেশ দেন। এ আদেশটি জারি হয় গত ২ আগস্ট, ২০১৭। অবাক ব্যাপার হলো, এক্ষেত্রেও এটর্নি জেনারেল নিজে উদ্যোগী হয়ে চেম্বার জজ আদালতে জেরা করে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিতের ব্যবস্থা করেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট সংক্রান্ত এ মামলাগুলো সম্পূর্ণই হানজালার ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট। এখানে সরকারের কোনও স্বার্থ জড়িত নেই। তিনি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী পদে না থাকলেও এ প্রতিষ্ঠানটি অবশ্যই চলবে। হানজালার চেয়ে আরও ভালো, মেধাবী, যোগ্য ও সৎ অফিসার বা প্রকৌশলী শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরসহ সরকারের বিভিন্ন দফতরে বর্তমানে কর্মরত আছেন। বরং হানজালা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী পদে থাকাকালে সংস্থাটির কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। দুর্নীতি প্রসারিত হয়েছে, অতীতে কখনও এতো অভিযোগ উঠেনি। সরকারের ভাবমুর্তি এতে ক্ষুণœ হয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী হানজালার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটের কথা প্রকাশ হওয়ার পর তিনি এই ভুয়া সার্টিফিকেটে চাকরি করার কারণে সরকার আরও বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ তাকেই এ পদে বহাল রাখার জন্য সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা অর্থাৎ এটর্নি জেনারেলের অফিস অতি মাত্রায় তৎপর। আর তা নিয়েই সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

[ সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ২০১৭ সালের, ২০ নভেম্বর প্রকাশিত ]

Comments

comments