ভারত ছাড়া অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির ঘোষণা শুধু ফাঁপা বুলি!

পেঁয়াজ। যখন এ পণ্যটির দাম বেড়ে যায় তখন বলা হয় ভারতে এর দাম বেড়েছে, তাই এখানেও তার একটি প্রভাব পড়েছে। তাই পেঁয়াজের জন্য শুধু ভারতের ওপর নির্ভরশীল হলে চলবে না। অন্য দেশ থেকেও পেঁয়াজ আমদানি করতে হবে। আর তার জন্য ‘রেডিমেড’ কয়েকটি দেশের নামও বলা হয়। এ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে- চীন, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও তুরস্ক। সর্বশেষ আরেকটি দেশের নাম এর সাথে যোগ করা হয়েছিল।

সেটি হচ্ছে মিসর। পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে গত আগস্ট মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল, বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য মিসর থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হবে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি।

দুই মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও মিসর থেকে কোনো পেঁয়াজ আমদানি হয়নি। শুধু কি মিসর, গত অক্টোবরে বলা হয়েছিল, থাইল্যান্ড ও চীন থেকেও পেঁয়াজ আমদানি করা হবে। কিন্তু সেটিও সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে, পেঁয়াজের দাম এখন রেকর্ড ছুঁয়েছে। দেশী পেঁয়াজের দাম এখন কেজি সর্বোচ্চ ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ভারতীয় পেঁয়াজ কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকার মধ্যে। অতীতে এ দামে দেশের মানুষ কখনো এ পণ্যটি ক্রয় করেননি।

চলতি বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকে। তাই পণ্যটির দাম কিভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় তা নিয়ে আগস্ট মাসের ১০ তারিখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি সভা আহবান করা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে এ বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ছাড়া পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, পেঁয়াজের দাম বাড়ছে কেন সেটা উপলব্ধি করতে হবে। বাংলাদেশে চার লাখ টন পেঁয়াজের ঘাটতি আছে। এ চার লাখ টন ইমপোর্ট করে ঘাটতি মেটাই। এ আমদানি হয় ভারত থেকে, ভারতেও বন্যার কারণে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২২ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।

সেই বৈঠকে বন্যার কারণে দেশে মজুদ পেঁয়াজের প্রায় ৫০ শতাংশ পচে গেছে দাবি করেন পেঁয়াজ আমদানিকারক হাজী মো: মাজেদ। তিনি বলেন, ভারত থেকে পেঁয়াজ আনতে ৪৮ থেকে ৫০ টাকা খরচ পড়ে যাচ্ছে (গত আগস্ট মাসের হিসাবে)। মিসর থেকে পেঁয়াজ আনতে খরচ হয় ৩৬ টাকার মতো। তিনি অভিযোগ করেন, ২০১৫ সালে মিসর থেকে কিছু পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই পেঁয়াজ দেশে আসার পরপরই ভারত তাদের পেঁয়াজের স্টক ছেড়ে দিয়ে দাম কমিয়ে দিয়েছিল। ফলে ব্যবসায়ীরা তখন বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন।

এ দিকে পরিসংখ্যান বলছে, দেশে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে ১৮ লাখ ৬৬ হাজার টন, যা আগের বছরের চেয়ে ১ লাখ ৩১ হাজার টন বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, বিগত অর্থবছরে ১০ লাখ ৪১ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৩ লাখ ৪০ হাজার টন বেশি। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে পেঁয়াজের জোগান এসেছে ২৯ লাখ টন। আর দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ টন।

তাই ৭ লাখ টন পেঁয়াজ উদ্বৃত্ত থাকার কথা থাকলেও পণ্যটির দাম প্রতিদিনই কিছু না কিছু বাড়ছে। কেন বাড়ছে এর কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারছে না। বলা হচ্ছে, ভারত পেঁয়াজের রফতানি মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে যে ৯ লাখ টন উদ্বৃত্ত পেঁয়াজ থাকার কথা তার হদিস কেউ দিতে পারছে না। অনেকে অভিযোগ করেছেন, আসলে, বাইরে যে পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানির কথা বলা হচ্ছে আদৌ সেই পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে কি না। নাকি শুধু এলসি খুলে অর্থ বাইরে চলে গেছে পেঁয়াজ আর দেশে আসেনি। আর ভারত ছাড়া অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুধু মাত্র ফাঁপা বুলিতে পরিণত হয়েছে। কার্যকর কিছু হয়নি।

Comments

comments