অসময়ের বৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি

তিন দিনের টানা বর্ষণে বরগুনায় আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গতকাল ছোট বদরখালী এলাকার মাঠে শুয়ে পড়া ধানগাছ দেখান দুই ব্যক্তি l মোহাম্মদ রফিক

বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপের প্রভাবে তিন দিনের বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় বরিশাল, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় আমন ধান ও রবি ফসলের ক্ষতি হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে রোপণকৃত বীজ ও ফসলে পচন ধরেছে। পানি দ্রুত না সরলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকেরা।

বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপের কারণে ৮ ডিসেম্বর থেকে টানা তিন দিন ধরে পটুয়াখালী জেলায় বৃষ্টি হয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৬৭৪ হেক্টর জমিতে আমন ও রবি ফসলের আবাদ শুরু হয়েছে। তিন দিনের বৃষ্টিতে ৩০ হাজার ৯৯৯ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রবি ফসলের মধ্যে খেসারি ডাল, ফেলনা ডাল, তরমুজ ও আলুর ক্ষতি হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের পূর্ব শারিকখালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, আমন খেতে বৃষ্টির পানি জমে রয়েছে। অনেক কৃষক তাঁদের ফসল বাঁচাতে খেত থেকে আগাম ধান কাটা শুরু করেছেন। সুশীল মিস্ত্রি বলেন, ধান পাকতে শুরু করেছে। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে তাঁদের খেতের আমন চারা মাটিতে শুয়ে পড়েছে। এখনো ফসলের খেতের অনেক স্থানে পানি জমে রয়েছে।

কৃষি অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক হৃদয়েশ্বর দত্ত বলেন, বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তবে এখন আবহাওয়া ভালো হয়েছে। খেত থেকে দ্রুত পানি সরে গেলে ক্ষতির পরিমাণ কমবে। এরপর ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হবে।

বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় এবার ১ লাখ ১০ হাজার ৩২ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯ হাজার ৮৬৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। বাকি ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর আবাদি জমির আমন ধান আক্রান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ২ হাজার ২০০ হেক্টর জমির খেসারি ডাল পুরোটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর ১ হাজার ২০০ হেক্টর রবিশস্যের ক্ষতি হয়েছে।

সদর উপজেলার খাজুরতলা গ্রামের নিজাম হাওলাদার জানান, তিন দিনের বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় আমন ধানের গাছ মাটিতে নুয়ে গেছে। সাধারণত এক বছরের ধান মজুত রেখে বাকিটা বিক্রি করেন। কিন্তু এ বছর বিক্রি তো দূরে থাক, খোরাকের জন্য ধান রাখতে পারবেন কি না, তা জানেন না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সাইনুর আজম বলেন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করতে আরও চার-পাঁচ দিন সময় লাগবে। তবে আমন ধানের তেমন ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই।

গতকাল দুপুরে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার বোয়ালিয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আমনের খেতে পাকা, আধা পাকা ধানগাছ নুয়ে মাটিতে পড়ে আছে। খেতে পানি জমে রয়েছে।

কৃষক আলী আকবর বলেন, ‘আমাগো কোমর ভাইঙ্গা দিয়া গ্যাছে অসময়ের বৃষ্টি। সারা বছর এই ফসলটার আশায় থাকি। কিন্তু সব শ্যাষ।’

বাবুগঞ্জ উপজেলার কৃষকেরা জানান, অপেক্ষাকৃত উঁচু জমির কিছু ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন। এটা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ হবে। বাকিটা সপ্তাহখানেকের মধ্যে কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু খেতের সব ধানগাছ এখন বিধ্বস্ত।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিকভাবে বিভাগের ছয় জেলায় এবার আমনের আবাদ হয়েছে ৭ লাখ ২৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে ৭২ হাজার ৫০০ হেক্টরের ধান। এ ছাড়া ২ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৮১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছে। আর ৮ হাজার ১০০ হেক্টর জমির রবি ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে কৃষকেরা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।

কৃষি বিভাগের বরিশাল বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক ওমর আলী শেখ বলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তালিকা ঢাকায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়ার নির্দেশনা তাঁরা এখনো পাননি।

Comments

comments