কেন বামপন্থীরা জাতিকে মূর্খ বানাতে চায়?

ইবনে ইসহাক

২০১০ সাল থেকে শুরু করি। তখন শিক্ষামন্ত্রী নাহিদকে নিয়ে সবাই খুব উৎফুল্ল। আওয়ামী মিডিয়াগুলো বটেই সকল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে উৎসাহের শেষ নেই। সেসময়ের পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশন মিডিয়ার কথা যদি মনে করতে পারেন তাহলে দেখবেন সেসময় আওয়ামী সরকারের সবচেয়ে সফল মন্ত্রীর নাম নাহিদ। সে যথাসময়ে বই দিতে পেরেছে। যথাসময়ে পরীক্ষা শেষ করতে পেরেছে। এসব কমন বিষয় নিয়ে শুধুশুধুই মিডিয়া কাভারেজ করেছে। অথচ এসব কাজ আগের সরকারগুলোও ঠিকঠাকমতই করেছে। এটা ছিল মূলত একটা গেইমপ্ল্যানের অংশ। প্রথমেই সে বিতর্কিত হতে চায়নি। অযথা লোক দেখানো কর্মকান্ড করে নিজেকে জনগণের কাছে পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করেছে। মূলত বামপন্থীরা চায় দেশে একধরণের মূর্খ প্রজন্ম গড়ে উঠুক। এরপর সেই মূর্খ জনগনকে একটি নির্দিষ্ট ধাঁচে শিক্ষিত করা যাবে। পৃথিবীর সব বামরাষ্ট্রে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। নাহিদও সে পথেই এগিয়েছে।

ভবিষ্যত প্রজন্মকে মূর্খ ও অপদার্থ হিসেবে তৈরী করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা নতুন কোন পদ্ধতি নয়। ফেরাউনও একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। এদেশে ইংরেজরাও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বামপন্থি নাহিদও সে পথই অনুসরণ করেছে। একটা ভাইরাল হওয়া ভিডিও দেখেছি যেখানে ছাত্ররা খুব কমন ও সহজ কিছু প্রশ্নের উত্তর জানেনা। অথচ তারা বোর্ড পরীক্ষার সর্বোচ্চ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। এটা দুঃখজনক। শিক্ষার মান ক্রমেই কমছে। এটা বড় একটা ষড়যন্ত্রের অংশ। একের পর এক প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও পাশ করানো হচ্ছে শিক্ষকদের চাপ দিয়ে। এর কিছু ফলাফল দেখা গিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষাতে।

অনেক আগে ফেরাউন যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলো, তখন সে তার মন্ত্রী হামানকে তার ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেছিল। হামান তাকে ধৈর্য্য ধরতে বলেছিল এবং পরামর্শ দিয়ে বলেছিল আপনি এখনি যদি নিজেকে সর্বশক্তিমান দাবী করেন তাহলে জনগণ তা মেনে নিবে না। কারণ তারা লেখাপড়া জানে, যুক্তি জানে, তাদের কাছে ধর্মীয় বিধান আছে। আপনি প্রথমে সকল বিদ্যালয় বন্ধ করে দিন। তাহলে এখনকার কিশোরেরা সব মূর্খ হয়ে বড় হবে। কিছু বছর পর তারা যুবক হবে। তখন তারা আপনি যা বলবেন তাই শুনবে।

ফেরাউন তাই করলো। মন্ত্রী হামানের পরামর্শ মতো ফেরাউন সমগ্র রাজ্যের মাতব্বর প্রজাদের ডেকে একটা বড় সভা করলেন। সেই সভাতে তিনি তাদের বুঝিয়ে দিলেন যে, লেখাপড়া শিখে মিছামিছি সময় নষ্ট করবার আর প্রয়োজন নেই। কারণ, লোকের পরমায়ু অতি অল্পকাল। এই সংকীর্ণ সময়ের মধ্যে জীবনের বেশির ভাগ দিনই যদি মক্তবে এবং পাঠশালায় গমনাগমন করে এবং পড়ার ভাবনা ভেবে ভেবে কাটিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে আমোদ আহলাদ এবং স্ফুর্তি করবার অবসর পাওয়া যাবে না। সুতরাং সারাজীবন ভরে আমোদ করো, মজা করো। তাহলে মরবার সময়ে মনে বিন্দুমাত্র অনুতাপ আসবে না।

প্রজারা ফেরাউনের ও হামানের এই উপদেশ সানন্দে গ্রহণ করলো এবং বংশধরদের কাউকে আর বিদ্যালয়ে প্রেরণ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলো।অতঃপর হামান পাঠশালা ও মক্তব রাজ্য থেকে উঠিয়ে ঢাক পিটিয়ে দেশময় প্রচার করে দিলো যে, কেউ আর লেখাপড়া শিখতে পারবে না। রাজার আদেশ অমান্য করলে সবংশে তার গর্দান যাবে।

প্রজারা ফেরাউনের আদেশ মতো চলতে লাগলো। লেখাপড়া আর কেউ শিখতে চেষ্টা করলো না। সারাদেশে কিছুকালের মধ্যে একেবারে গণ্ডমুর্খতে পূর্ণ হয়ে গেল। মূর্খের অশেষ দোষ। কোন ধর্মাধর্ম, হিতাহিত জ্ঞান তার থাকে না। তারা হয় কাণ্ডজ্ঞানবিবর্জিত এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন। দুনিয়ার এমন কোন অসৎ কাজ নেই যা মূর্খরা না করতে পারে! যখন তার রাজ্যের প্রজাদের এই অবস্থা ফেরাউন মনে মনে হাসতে লাগলো। তার উদ্দেশ্য এতদিনে সিদ্ধ হয়েছে। তিনি প্রত্যেককে একটা করে নিজের প্রতিমূর্তি দিয়ে তাকে সৃষ্টিকর্তা এবং উপাস্য বলে পূজা করতে হুকুম দিলেন। মূর্খ ও অপদার্থ প্রজন্ম ফেরাউনের আনুগত্য করতে লাগলো।

বাম আদর্শে বড় হওয়া নাহিদরা ভালো করেই জানে এদেশবাসী যখন ভালো শিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠবে তখন তাদের বস্তাপঁচা আদর্শ তারা গ্রহন করার প্রশ্নই আসে না। বরং তাই হচ্ছে। এদেশে যখন বাম আদর্শ বিস্তার শুরু করছিলো তখন তাদের চটকদার কথা শুনে অনেক জ্ঞানী মানুষ তাদের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করেছিলো। কিন্তু কালক্রমে তাদের আদর্শের অসারতা বড় হয়ে ধরা পড়ে সকলের সামনে। বড় দলগুলো ক্রমেই ছোট হয়ে আসতে শুরু করে।

নতুন করে তারা আবার দলভারী করতে চায়। বস্তাপঁচা আদর্শ গিলাতে চায় এই জাতির ভবিষ্যত প্রজন্মের মগজে। তাই তাদের দরকার একটা অপদার্থ প্রজন্ম। সেটাই নাহিদ তৈরী করতে সক্ষম হচ্ছে। এজন্য তারা পলিসি গ্রহন করেছে প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন না দেয়া। ভালো ও খারাপের ক্যাটাগরি সমান করে দিয়েছে। ছেলেরা আরো ভালো কিছু করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। নকলের প্রসার, প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ আরো এমনসব পলিসি গ্রহন করেছে যাতে একটা নির্বোধ জাতির সৃষ্টি হয়।

প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ও ফলপ্রকাশে যেসব অনিয়ম হচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাই তা জানেন। দেশের প্রাইমারী স্কুলগুলোর সিংহভাগ স্কুলগুলোতেই কোন লেখাপড়া নেই। এর মূল কারণ ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাধিক্য, শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাব, তদারকির অভাব। অধিকাংশ স্কুলেই এক একটি শ্রেণীতে এক-দেড়শ শিক্ষার্থী। সেখানে একজন শিক্ষকের পক্ষে কিছুতেই পাঠদান সম্ভব নয়। রোল কল করে ও অন্যান্য কাজ করতে করতেই নির্দিষ্ট সময় চলে যায়। এটা উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ থেকে নিন্মতম পর্যায় পর্যন্ত সবাই জানে। তবু পরীক্ষার সময় টার্গেট নির্ধারণ করে দেয়া হয়, যাতে কেউ পরীক্ষায় ফেল না করে।

আর সমাপনী পরীক্ষায় নাকি এমন ও নির্দেশ দেওয়া থাকে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারুক বা না পারুক বা কম পারুক যেভাবেই হোক লিখিয়ে শতভাগ পাশ নিশ্চিত করতে হবে। এমন কথাও চালু আছে, পরীক্ষার খাতায় পাশ মার্ক না ওঠলে সেখানে খাতা মূল্যায়নকারীরাই লিখে পাশ মার্ক দিতে হবে। তারপরও যদি পাশের হার না বাড়ে তা হলে ফলাফল প্রকাশের সময় এভারেজ গ্রেস মার্ক দিয়ে পাশের হার বাড়ানোর অলিখিত নির্দেশতো আছে। তাই পাশের হার বাড়লেও এসব ছাত্র-ছাত্রীরা যখন হাইস্কুলে ভর্তি হয় তখন দৈন্যদশা প্রকটভাবে ধরা পড়ে। এ কথাটা পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। স্কুল-কলেজ পাশ করা লক্ষ লক্ষ ছাত্ররা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় একযোগে ফেল করে তখন সহজেই অনুমান করা যায় শিক্ষার অবস্থা কোন তলানী গিয়ে ঠেকছে।

ধীরে ধীরে বামপন্থী নাহিদরা তাদের পথে অনেকদূর এগিয়েছে। বাংলাদেশের যুব সমাজ নিজেদের তৈরী করছে ভোগবাদী হিসেবে। যেখানে মানবিকতা, নৈতিকতার স্থান নেই। অন্যকে ছাপিয়ে অর্থশালী হওয়া, অন্যকে শোষণ করা, নিজে ভোগ করতে পারাই সফলতার মূল কথা। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব আছে বলে তারা জানে না। আমিত্ব নিয়ে পড়ে আছে সবাই। ইয়াবা, মাদক, ক্রিকেট, ভার্চুয়াল গেম, মুভি, নাটকে বুঁদ হয়ে আছে যুবসমাজ। তাদের কাছে একটি ভবিষ্যত সমৃদ্ধ জাতির আশা করা বৃথা। ক্রমেই বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হচ্ছে। আমাদের সচেতন হতে হবে এখনই। নইলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

Comments

comments