প্যালেস্টাইনিদের সর্বাত্মক প্রতিরোধ আন্দোলনের সেই ইন্তিফাদা ফের জেগে ওঠছে

৬ ডিসেম্বর হোয়াইট হাউসে ক্রিসমাস সজ্জিত কক্ষের এক পাশে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসাবে ঘোষণা দেন।

ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ মুসলিম ও আরব বিশ্বে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে দিয়েছে এবং সেইসঙ্গে তার এই ঘোষণায় মুসলিম ও আরব বিশ্বের বাইরের অনেকেই শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন যে, শেষ পর্যন্ত তার এই পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই ভঙ্গুর ‘শান্তি প্রক্রিয়া’কে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করবে।

তার এই ঘোষণার পর থেকেই ওয়েস্ট ব্যাংক, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেমের রাস্তায় শত শত ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারী ইসরাইলি সৈন্যদের প্রতিরোধ করছেন। আর ইহুদি সৈন্যরা কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট দিয়ে এর জবাব দিচ্ছেন।

ক্রোধের এই বিস্ফোরণ আরো টেকসই প্রতিরোধে পরিণত হবে কিনা তা এখনো নিশ্চিত নয়। যদিও আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করেছে। স্থানীয় কর্মীরা এতো রাজনৈতিক বিভ্রান্তির মধ্যেও একটি সুসংহত প্রতিক্রিয়া তৈরির জন্য সংগ্রাম করছে।

বিভিন্নভাবে, এই সপ্তাহের ঘটনাগুলো ৩০ বছর আগে ঘটে যাওয়া দখলকৃত অঞ্চলগুলোতে প্রতিরোধের আরেকটি মুহূর্তের প্রতিধ্বনি করছে।

ত্রিশ বছর আগের সেই মুহূর্তটি ছিল সত্যিকার অর্থেই অসাধারণ এক বিপ্লবী ঐক্যের মুহুর্ত। এসময় দখলকৃত অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল এক বিশাল বিদ্রোহের ঢেউ।

১৯৮৭ সালের ৮ ডিসেম্বর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে প্যালেস্টাইন শ্রমিকদের বহনকারী গাড়ির সঙ্গে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। এতে চারজন ফিলিস্তিনি মারা যায় এবং আরো ১০জন আহত হন। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই প্যালেস্টাইনরা স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ প্রকাশ করতে গাজার রাস্তায় নেমে আসে। এটি ছিল দুই দশক ধরে চলা দখলদারিত্বের তীব্র বর্হিপ্রকাশ।

পরের দিন ইসরাইলি সৈন্যরা একজন ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে। ঘটনাক্রমে এই হত্যাকাণ্ড প্রথম ইন্তিফাদার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। খুব শিগগিরই নীরস্ত্র এই বিদ্রোহ বিশাল আকার ধারণ করে অধিকৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

এটা ছিল অবিস্মরণীয় বিপ্লবী ঐক্যের এক মুহূর্ত। হাজার হাজার সাধারণ ফিলিস্তিনি নির্বাসিত পিএলও নেতাদের নির্দেশের অপেক্ষা না করে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।

এই প্রতিরোধকারীদের মধ্যে শুরুর দিকের এবং সবচেয়ে সাহসী ছিলেন গাজার বাসিন্দা এবং রাজনৈতিক সংগঠক লাইলা আয়েশ। জাতীয় এই মুক্তি সংগ্রামে হাজার হাজার সহকারী নারীকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নাইলা আয়শ।

তিরিশ বছর পর জুলিয়া বাকারের নতুন তথ্যচিত্র ‘নাইলা এন্ড দ্য আপরাইজিং’ এ ওঠে এসেছে নাইলার সেই বীরত্বের কাহিনী। পূর্ণ দৈর্ঘ্যের এই ডকুমেন্টারিতে ইন্তিফাদার সাহসী সব নারী কর্মী এবং বর্তমানে ম্লান হয়ে যাওয়া তৃণমূলের ফিলিস্তিনীদের শক্তির বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে।

ডকুমেন্টারিতে ওঠে এসেছে ইসরাইলি জেলে নাইলার আটক থাকার দিনগুলো, ইন্তিফাদার ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর সংখ্যা, মিশরে তার স্বামীর জোরপূর্বক নির্বাসন। আইশ পরিবারের সমান্তরাল বর্ণনা এবং ইন্তিফাদার রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত মধ্যস্থতার প্রদর্শন যা দখলদারিত্বের অধীনে ফিলিস্তিনীদের জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে।

তথ্যচিত্রের প্রধান চরিত্র হচ্ছেন নাইলা আয়শ। আর্কাইভ ছবিগুলো থেকে দেখা যায়, ইন্তিফাদার প্রথম আয়োজকদের সঙ্গে নাইলা টেবিলের উপর বসে আছেন। ১৯৮৮ সালের প্রথম দিকের তৃণমূল নেতৃত্বের নেটওয়ার্ক গঠনে তিনি ও তার স্বামী জামাল মূল খেলোয়াড়ের ভূমিকা পালন করেন।

নির্বাসিত পিএলও নেতাদের অনুপস্থিতিতে ওই সময়ের দিনগুলো কমিউনিটি নেতৃত্বের একটি বিরল মুহূর্তের চিত্র প্রতিফলিত করে।

এই আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় কর্মী জাহিরা কামাল বলেন, ‘প্রথমবারের মতো আমরা প্যালেস্টাইনের বাইরের নেতৃত্বের নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করেনি।’ ত্রিশ বছর পরেও সেই দিনগুলোর স্মৃতি তার চোখে এখনো অমলিন।

এই প্রতিবাদ আন্দোলনে দু’ধরনের কৌশল জড়িত ছিল। একটি হচ্ছে নীরস্ত্র প্রতিরোধ এবং অপরটি হলো আইন অমান্য। এর মধ্যে ছিল সাধারণ ধর্মঘট, গাজা উপত্যকা এবং পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বেসামরিক প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বর্জন, অর্থনৈতিক বয়কট- যার মধ্যে ছিল ইসরাইলি বসতিতে ইসরাইলি পণ্য প্রত্যাখ্যান, ট্যাক্স দিতে অস্বীকার করা, ইসরাইলি লাইসেন্সে ফিলিস্তিনি গাড়ি চালানোয় অস্বীকৃতি, দেয়াল লিখন, ব্যারিকেড সৃষ্টি এবং ফিলিস্তিনি অঞ্চলের মধ্যে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী (আইডিএফ) ও তার পরিকাঠামোয় ব্যাপক পাথর ও পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ।

ইসরাইল প্রায় ৮০,০০০ সৈন্য মোতায়েন করে প্রাথমিকভাবে সরাসরি গুলি ছুঁড়ে ব্যাপক সংখ্যক ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে। প্রথম ১৩ মাসে ৩৩২ জন ফিলিস্তিনি এবং ১২ জন ইসরাইলি নিহত হয়। এই বিরাট সংখ্যক শিশু, যুবক এবং বেসামরিক জনতাকে হত্যা করার পর তারা ‘জবরদস্তি, শক্তি ও আঘাত’-এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের হাড় ভেঙ্গে দেয়ার নীতি অবলম্বন করে। কিশোর বয়সীদেরকে লাঠি দিয়ে প্রহার করা সৈন্যদের ভাবমূর্তি বিশ্বব্যাপী সম্প্রচার হলে তারা আধা-প্রাণঘাতী প্লাস্টিক বুলেট ছোঁড়ার নীতি গ্রহণ করে।

ইন্তিফাদার প্রথম বছরে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী ৩১১ জন ফিলিস্তিনি হত্যা করে, যার মধ্যে ৫৩ জনের বয়স ছিল ১৭ বছরের কম। সেভ দ্য চিল্ড্রেন- এর মতে, প্রথম দুই বছর ব্যাপী ১৮ বছরের কম বয়সী আনুমানিক ৭ শতাংশ ফিলিস্তিনি গুলি, প্রহার বা কাঁদানে গ্যাসের আঘাতে আহত হন।

ছয় বছরে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী আনুমানিক ১,১৬২ থেকে ১,২০৪ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে। প্রথম দুই বছরে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর আঘাতে ২৩,৬০০ থেকে ২৯,৯০০ ফিলিস্তিনি শিশুর চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। ফিলিস্তিনিরা ১০০ জন ইসরাইলি বেসামরিক নাগরিক ও ৬০ জন আইডিএফ কর্মী হত্যা করে এবং ১,৪০০ জনের বেশি ইসরাইলি বেসামরিক নাগরিক ও ১,৭০০ জনের বেশি সৈন্যদের আহত করে।

ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরে সহিংসতা ছিল ইন্তিফাদার লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য, এতে ইসরাইলের সহযোগী হিসেবে ব্যাপক সংখ্যক অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এর মধ্যে আনুমানিক ৮২২ জন ফিলিস্তিনিকে ইসরাইলের সহযোগী হিসেবে হত্যা করা হয় (১৯৮৮-এপ্রিল ১৯৯৪)।

এই প্রতিরোধ আন্দোলনে দুটি ফ্রন্ট থেকে নারীদের সংগ্রাম করতে হয়েছে। যদিও তারা ছিল বিদ্রোহের শুরু দিকের ও সক্রিয় অংশগ্রহণকারী, তবুও নারীরা তাদের পুরুষ সহকর্মীদের কাছ থেকে ভয়ঙ্কর প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছিল।

জাহিরা কামাল নামে একজন আন্দোলনকারী বলেন, ‘দীর্ঘকাল ধরেই নারীরা মুক্তি সংগ্রামে জড়িত হয়েছেন। কিন্তু তাদের ভূমিকা ছিল সীমিত। পুরুষদের সঙ্গে নারীরা অংশগ্রহণ করুক তা লোকেরা চাইত না।’

নিজ কমিউনিটির পুরুষ সদস্যদের কাছ থেকে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ফিলিস্তিনি নারীরা পৃথক কমিটি গঠন করেছিল। এই দলগুলোর অনেক সদস্য সেলাই বা নার্সারির কাজ শেখার ছল করে একত্রিত হতো।

সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে নায়মা আল-শেখ আলী বলেন , ‘এটি ছিল সকল উইন্ডো ড্রেসিং। প্রকৃতপক্ষে, এটি ছিল সকল রাজনৈতিক সংগঠন।’

ইসরাইলি দমনপীড়নে শত শত পুরুষ নেতা-কর্মীর ঠিকানা কারাগার বা নির্বাসন হলে এই নারী সংগঠনগুলো ক্রমবর্ধমান প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতো। আর্কাইভ ফুটেজে দেখা যায়, বয়কট করা ইসরাইলি পণ্য নারী নেতৃত্বাধীন সমবায়ের মাধ্যমে উত্পাদন করা হতো। অন্য নারীরা ফিলিস্তিনি স্কুলগুলোতে ইসরাইলি আগ্রাসন উপেক্ষা করে ঘরের ভিতর কিংবা মাঠে ঘাসের ওপর ছাত্রদের ক্লাস নিচ্ছেন। অন্যরা স্বাস্থ্য ক্লিনিক এবং পেশাগত দক্ষতা কর্মশালায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।

অন্য একজন নারী কর্মী বলেন, ‘একটি স্বাভাবিক সরকারের অনুপস্থিতিতে মহিলা কমিটি এবং ইউনিয়নগুলো সংগঠিত হয়। আমরা সবকিছুতেই যত্ন নিয়েছি।’

এই নারীদের কর্মকাণ্ডে ভীত হয়ে পড়ে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। তাদের দমন করার জন্য এরুপ সকল সংগঠনের অংশগ্রহণকারীকে দোষী সাব্যস্ত করে। সভায় অংশগ্রহণের জন্য তাদেরকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের হুমকি দেয়া হয়।

এই দমনপীড়ন থেকে পুরুষের নারীরাও রেহায় পায়নি। নাইলা তার প্রথম ছেলে সন্তানের জন্ম দেবার অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রেপ্তার হন। সদ্য প্রসব করা সন্তানকে তার আত্মীয়ের কাছে রেখে তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। নাইলার সহকর্মীরা ছেলেটির পক্ষে আক্রমণাত্মক প্রতিবাদ শুরু করে এবং ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ অবশেষে তাকে যেকোনো একটি পছন্দ বেছে নেয়ার সুযোগ দেয়। একটি হচ্ছে কারাগারে তার পুত্রের সঙ্গে একতাবদ্ধ হতে, অথবা তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা।

নাইলা আগের অপশনটি বেছে নেন এবং ৬ মাস বয়সী শিশুটি প্রায় অর্ধ বছর তার মায়ের সঙ্গে জেলখানায় কাটান। শিশুটি অন্যান্য নারী বন্দীদের একটি সান্ত্বনার উৎসে পরিণত হয়। এসব নারীদের অধিকাংশই তাদের সন্তানদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে কারাগারের দিনগুলো পার করছিলেন।

কারাগারে নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করে প্রাক্তন নারী কয়েদীদের একজন বলেন, ‘আমরা সবাই কল্পনা করতাম যে সে আমাদের নিজের সন্তান। তাকে কোলে নেয়া বা নিজের কাছে রাখার জন্য আমরা সবাই প্রতিযোগিতা করতাম।’

ইন্তিফাদা আন্দোলনের কর্মপদ্ধতি
অধিকৃত অঞ্চলসমূহের মধ্যে ইসরাইলের শক্তি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ, কিন্তু ঘরবারি ধ্বংস, যৌথ শাস্তি, কারফিউ ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দমনকারী এবং নির্বাসন বিষয়ে কঠোর নীতি অবলম্বনকারী প্রশাসন আত্মবিশ্বাসী ছিল যে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিক্ষোভ অকার্যকর হয়ে পড়বে বলে তাদের যে মূল্যায়ন ছিল, সেটা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল।

৯ ডিসেম্বর পশ্চিম জেরুজালেমে ইসরাইলি লীগ ফর হিউম্যান অ্যান্ড সিভিল রাইটস এর সঙ্গে বেশ কিছু জনপ্রিয় এবং পেশাদারী ফিলিস্তিনি নেতা পরিস্থিতির অবনতির প্রতিক্রিয়ায় একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। যেখানে তারা বলেন যে জাবালিয়া শিবিরে বিক্ষোভ চলছে এবং ইসরাইলি সৈন্যদের উপর পেট্রোল বোমা ছোঁড়ার পর ১৭ বছর বয়সী এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে রিপোর্ট এসেছে। পরবর্তীকালে সে ইন্তিফাদার প্রথম শহীদ হিসেবে পরিচিতি পায়।

বিক্ষোভ দ্রুত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে ছড়িয়ে পড়ে। যুবকেরা প্রতিবেশিদের নিয়ন্ত্রণ নেয়, ময়লা-আবর্জনা, পাথর এবং টায়ার জ্বালিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে ক্যাম্প বন্ধ করে দেয়, এবং যে সকল সৈন্য পেট্রোল বোমার সাহায্যে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা করছিল তাদের মুখোমুখি হয়। ফিলিস্তিনি দোকানদাররা তাদের ব্যবসায় বন্ধ করে দেয়, এবং শ্রমিকেরা ইসরাইলে কাজ চালিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানায়।

এই সকল কার্যক্রমকে ইসরাইল ‘দাঙ্গা’ বলে চালায়, এবং ‘আইনশৃঙ্খলা’ পুনরুদ্ধারের স্বার্থে দমনকে প্রয়োজনীয় এবং ন্যায়সঙ্গত হিসেবে বর্ণনা করে। কয়েকদিনের মধ্যে অধিকৃত অঞ্চলগুলো অভূতপূর্ব মাত্রায় বিক্ষোভ মিছিল ও বাণিজ্যিক ধর্মঘটে আন্দোলিত হতে থাকে। আক্রমণের জন্য কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ঠিক করা হয়, যেমন: সামরিক যানবাহন, ইসরাইলি বাস এবং ইসরাইলি ব্যাংক। এই প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকে কোন ইসরাইলি বসতিতে আক্রমণ হয় নি, কোন ইসরাইলি গাড়িতে পাথর নিক্ষেপে নিহত হয় নি।

সমানভাবে অভূতপূর্ব ছিল এই বিক্ষোভে সাধারণ জনতার অংশগ্রহণের মাত্রা; নারী, শিশুসহ হাজার হাজার বেসামরিক জনগণ এতে শামিল হয়। ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য লাঠি, কাঁদানে গ্যাস, জল কামান, রবার বুলেট, এবং গোলাবারুদ নিয়ে সবরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু বিক্ষোভ আরো বেগবান হয়।

শিগগিরই পুরো অঞ্চলজুড়ে পাথর নিক্ষেপ এবং টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সহিংসতায় ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়। পরেরদিন বিক্ষোভকারীরা পূর্ব জেরুজালেমের মার্কিন দূতাবাসে একটি পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে, যদিও এতে কেউ আহত হয় নি।

ফিলিস্তিনিদের এই অভ্যুত্থানে ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া ছিল কঠোর। ইন্তিফাদার শুরুর দিকে আইডিএফ অনেক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে, যার মধ্যে বেশিরভাগই ছিল মিছিল ও বিদ্রোহের সময়। যেহেতু প্রথমদিকের বেশিরভাগ নিহত ব্যক্তিই ছিল বেসামরিক ও যুবক, ইতজাক রাবিন পিছু হটে ‘জবরদস্তি, শক্তি ও আঘাত’ নীতি গ্রহণ করে। ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের গণগ্রেফতার এবং যৌথ শাস্তির ব্যবস্থা নেয়, যেমন: পশ্চিম তীরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্দোলনের বছরগুলোতে এবং পশ্চিম তীরের স্কুলগুলো ১২ মাসের জন্য বন্ধ রাখা।

শুধু প্রথম বছরেই ১৬০০ বারের বেশি রাউন্ড-দ্য-ক্লক কারফিউ জারি করা হয়। জনসাধারণ পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সরবরাহ থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়ে। কোন এক সময় ২৫,০০০ ফিলিস্তিনি গৃহবন্দি হয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনি খামারগুলো থেকে গাছপালা উপড়ে ফেলা হয়, এবং উৎপাদিত কৃষিজ পণ্যের বিক্রি অবরুদ্ধ করে দেয়া হয়।

প্রথম বছরে ১,০০০ এর বেশি ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ধ্বংস কিংবা অবরুদ্ধ করা হয়। অধিবাসীরাও ফিলিস্তিনিদের উপর ব্যক্তিগত আক্রমণে জড়িত হয়। ট্যাক্স দিতে অস্বীকারকারী ফিলিস্তিনিদের সম্পদ এবং লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত করা হয়, এবং যেসব পরিবারের সদস্যরা পাথর নিক্ষেপকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল তাদের উপর সাধ্যাতীত জরিমানা জারি করা হয়।

ফলাফল
ইন্তিফাদা কোন সামরিক যুদ্ধ ছিল না, গেরিলা যুদ্ধও নয়। পিএলও- পরিস্থিতির উপর যাদের সীমিত নিয়ন্ত্রণ ছিল- কখনোই আশা করে নি যে এমন একটি তৃণমূল আন্দোলন ইসরাইলি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ কোন অর্জন করতে পারবে। তবে ইন্তিফাদার বেশ কিছু ফলাফল ছিল যা ফিলিস্তিনিরা ইতিবাচক বলে বিবেচনা করতে পারে:

• প্রতিবেশি কোন আরব রাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়াই ইসরাইলের সাথে সরাসরি যদ্ধে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিরা একটি পৃথক জাতি হিসেবে তাদের স্বীয় পরিচয় প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছিল।
• একটি সংযুক্ত ইসরাইলি শহর হিসেবে জেরুজালেমের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছিল।
• পিএলও-র জনপ্রিয়তা ও সমর্থন কুড়ানোর জন্য পশ্চিম তীরে জর্ডান বাড়তি প্রশাসনিক এবং আর্থিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল।
• ‘আয়রন ফিস্ট’ নীতির ব্যর্থতা, ইসরাইলের অধোগামী আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, পশ্চিম তীরের সাথে জর্ডানের ছিন্ন করা আইনি ও প্রশাসনিক বন্ধন, এবং ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে পিএলও-এর প্রতি মার্কিন স্বীকৃতি রাবিনকে পিএলও-এর সাথে আপোস এবং সংলাপের মাধ্যমে এই সহিংসতার শেষ করতে বাধ্য করেছিল।
• ইন্তিফাদার ফলে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মনোযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।
• ফিলিস্তিনিরা প্রথমবারের মত দেখিয়েছিল যে ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে দু’টি দিক রয়েছে।
• অনেক আমেরিকান মিডিয়া এমনভাবে প্রকাশ্যে ইসরাইলের সমালোচনা করেছিল, যা তারা আগে কখনো করে নি।
• ইন্তিফাদার সাফল্য আরাফাত ও তার অণুসারীদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করেছিল, যা তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ছিল। ১৯৮৮ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আলজিয়ার্সে অণুষ্ঠিত ফিলিস্তিন জাতীয় পরিষদের সভায় ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘের দেয়া সমাধান দ্বিরাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করার মাধ্যমে ইসরাইলের বৈধতা স্বীকার করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন।
• জাতিসংঘ, ইউরোপিয়ান কমিউনিটি, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরাইলের সমালোচনা হয়েছিল; এমনকি আরব রাষ্ট্রসমূহ থেকেও- ১৯৮০-র দশকে যাদের মনোযোগ ছিল ইরান-ইরাক যুদ্ধের দিকে।
• ইউরোপিয়ান কমিউনিটি (পরবর্তীকালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন নামে পরিচিত) সদ্যসৃষ্ট ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সহায়ক হয়ে উঠেছিল।
• মাদ্রিদ সম্মেলন এবং অসলো চুক্তির আপোসে ভূমিকা রাখার ব্যাপারে ফিলিস্তিনিদের ক্ষমতায়ন করেছিল ইন্তিফাদা।
• বিদ্রোহটিকে মাদ্রিদ সম্মেলন এবং সেই সূত্রে তিউনিসিয়ার নির্বাসন থেকে পিএলও-র ফেরতের সাথে সম্পর্কযুক্ত করা যায়।
• ইন্তিফাদা আইডিএফ-এর গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলী কার্যক্রমে অনেক সমস্যা প্রকাশ করে দিয়েছিল, এবং পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের দীর্ঘ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারেও সমস্যা উন্মুক্ত হয়েছিল। এই সমস্যাগুলো আন্তর্জাতিক ফোরামে ব্যাপক আলোচিত ও সমালোচিত হয়।

আজকে ফিলিস্তিনিরা তাদের দুর্দশার তিন দশক পার করছেন। এই আদর্শের উপলব্ধি জন্য তারা অবিরত অপেক্ষা করছে। ট্রাম্পের সর্বশেষ নগ্ন পক্ষপাতিত্বমূলক পদক্ষেপ আমেরিকার প্রতারণার একটি ‘সৎ দালাল’ হিসাবে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছে। এদিকে, ইন্তিফাদার বছরগুলোতে প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা এবং দুর্নীতি বহু ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের নিজস্ব সরকার থেকে বিতাড়িত করেছে।

নায়লার মত গল্পগুলো আমাদের তৃতীয় উপায় সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেয় আর সেটি হচ্ছে আত্মনির্ভরশীল, গণতান্ত্রিক, লিঙ্গ-সমতা সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে অহিংস প্রতিরোধ। এটিই একমাত্র এগিয়ে যাওয়ার পথ হতে পারে।

ট্রাম্পের এই ঘোষণা ফিলিস্তিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হামাসের পলিটিক্যাল ব্যুরোর প্রধান ইসমাইল হানিয়া। তিনি ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে আরেকটি গণ-অভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছেন।

গাজায় দেয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, এই ঘোষণার মাধ্যমে ট্রাম্প ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।

হানিয়া আরো বলেন, আমাদের লোকেরা দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ইন্তিফাদা (গণ-অভ্যুত্থান) শুরু করবে। বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে আমরা আত্মবিশ্বাসী। হামাসের সকল ইউনিটকে যে কোন ধরনের হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

-সারা আজিজা

Comments

comments