থেমে নেই গুম-খুন ॥ উদ্বেগ-আতংকে প্রতিটি মানুষ

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ৫২ জন গুম ও ৯৮৪ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। আইনশৃংখলা বাহিনীর কথিত বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন আরো অন্তত ৮৭ জন। এ ছাড়া সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী নাগরিক হত্যাসহ মানবাধিকার লংঘনের বহুমাত্রিক ও বিভীষিকাময় ঘটনা অব্যাহতভাবে ঘটছে। দেশে বিরোধী মতাদর্শকে একদমই বরদাশত করা হচ্ছে না। বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরকে কোনো রকম কর্মসূচি করতে দিচ্ছে না। দুই মাস পেরুলেও সন্ধান মেলেনি তরুণ সংবাদকর্মী উৎপল দাসের। এরই মধ্যে কয়েক দিন আগে নিখোঁজ হয়েছেন রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। এ অবস্থায় উদ্বেগ-আতংকে কাটাতে হচ্ছে প্রতিটি মানুষকে। সরকারের অংশীদার এরশাদও এ বিষয়টির দিকে প্রকাশ্যে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দিয়েছেন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তথ্য মতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গুম হয়েছেন ৫২ জন ও অপহরণের শিকার ১৯৩ জন। কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন ৮৭ জন। একই সময়ে হত্যাকান্ড ঘটেছে ৮৫৫টি। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩০৬ নারী। নানা কারণে ১২৯ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ২৯৯টি। শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১২৩টি। পুলিশ কর্তৃক মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটেছে ১২৬টি। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৮৫৩ জন।

বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এর তথ্য মতে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ৮৫ জনের মধ্যে ৭৯ জন কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। বন্দুকযুদ্ধকে আইনশৃংখলা বাহিনী ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘এনকাউন্টার’ বলতে বিব্রতবোধ করে থাকে। ক্রসফায়ারে নিহতদের মধ্যে পুলিশের হাতে ৬৭ জন, র‌্যাবের হাতে ১১ জন, সেনাবাহিনীর হাতে ১ জন নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে ২২ জন কারা হেফাজতে অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন।

অধিকার বলছে, গণমাধ্যমের ওপর বর্তমানে যে হস্তক্ষেপ চলছে তা ব্যাপকভাবে শুরু হয় ২০১৩ সাল থেকে। ওই বছর আমার দেশ, দিগন্ত টিভি এবং ইসলামিক টিভি বন্ধ করে দেয়া হয়, যা এখনও বলবৎ আছে। গত ১৯ জুন অনলাইন সংবাদমাধ্যমকেও সম্প্রচার কমিশনের অধীনে এনে ‘জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা ২০১৭’ এর খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। সম্প্রচার আইনের ১৯ ধারা লঙ্ঘন করলে অনধিক সাত বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ডর করা যাবে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। এই নিবর্তনমূলক আইনের মাধ্যমে সরকার অনলাইন সংবাদমাধ্যমকেও নিয়ন্ত্রণ করবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এছাড়া পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে সরকারিদলের সমর্থক দুর্বৃত্তদের হামলায় সাংবাদিকদের নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনা অব্যাহত আছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে তাদের গ্রেফতার করার ঘটনাও ঘটেছে। অধিকার’র সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে ১ জন নিহত, ১০ জন সাংবাদিক আহত, ২ জন লাঞ্ছিত, ৯ জন হুমকির সম্মুখীন এবং ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে ২১ ব্যক্তি গণপিটুনীতে মারা গেছেন বলে জানা যায়। ১২৮ জন নারী যৌতুক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। মোট ৩৭১ জন নারী ও মেয়ে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে ১০৫ জন নারী, ২৬৩ জন মেয়ে শিশু এবং ৩ জনের বয়স জানা যায়নি। মোট ১২৪ জন নারীযৌন হয়রানীর শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে ৫ জন আত্মহত্যা করেছেন, ১ জন নিহত, ২৪ জন আহত, ২০ জন লাঞ্ছিত, ১ জন অপহৃত ও ৭৩ জন বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে বখাটে বা তাদের পরিবারের সদস্যদের আক্রমণে ৫ জন পুরুষ নিহত হয়েছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির অস্বচ্ছ, বিতর্কিত ও প্রহসনমূলক নির্বাচনের পর থেকে সরকার সরকারী প্রতিষ্ঠানসহ জাতীয় ও স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে চরমভাবে দলীয়করণ করেছে। সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দল বিশেষত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এবং মানবাধিকার সংগঠনসহ প্রতিবাদী কণ্ঠগুলোকে নির্মমভাবে দমন-পীড়নের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে। ২০১৭ এর প্রথম ছয় মাসে ও সরকারের দমন-পীড়ন লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৪ এর নির্বাচনের পর থেকে অনুষ্ঠিত সবগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, সহিংসতা এবং ভোট জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে, যা এই ছয় মাসে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অব্যাহত ছিল।

সরকার গুমের বিষয়টি সম্পূর্নভাবে অস্বীকার করলেও ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে সাত ব্যক্তিকে গুম করার পর হত্যা করার অপরাধে র‌্যাব-১১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাইদসহ ১৬ জন র‌্যাব কর্মকর্তা ও সদস্যসহ ২৬ জন অভিযুক্তকে ফাঁসির আদেশ দেন।

বর্তমান সরকার এর আমলে বেশ কিছু নিবর্তনমূলক আইন প্রনয়ন ও আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে এবং কিছু নিবর্তনমূলক আইনকে আরও কঠোর করা হয়েছে। যেমন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০০৯ ও ২০১৩)। এই নিবর্তনমূলক আইনগুলো প্রয়োগের মাধ্যমে ভিন্নমত ও ভিন্নমতাবলম্বীদের চরমভাবে দমন করছে সরকার। কোন নাগরিক সরকারের সমালোচনামূলক কিছু প্রকাশ বা ফেসবুকে কোন মন্তব্য দিলে এবং তা সরকারের বিরুদ্ধে গেলেই সরকার ও ক্ষমতাসীনদলের নেতা-কর্মীরা বিদ্বেষবশত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করছে। গত ছয় মাসেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ব্যাপকভাবে সরকারি নজরদারী বলবৎ ছিল। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তি বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সমালোচনাকারীসহ সরকারের বিরুদ্ধে যায় এমন যে কোন তথ্য প্রকাশের ফলশ্রুতিতে নিবর্তনমূলক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০০৯ ও ২০১৩) প্রয়োগ করা হয়েছে।

মানবাধিকার কর্মী ও সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, সুশাসন না থাকায় মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দুর্নীতি যত বেশী হচ্ছে ততই এই ধরনের প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমান টাকাও বিদেশে পাচার হচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) ২৯ জুন তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ২০১৬ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশী নাগরিকদের সঞ্চয়ের পরিমান দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশী নাগরিকদের সঞ্চয়ের পরিমান ছিল ৪ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। গত ছয় মাসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী যৌতুক, ধর্ষণ, এসিড সন্ত্রাস যৌন হয়রানি এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩), এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০২,এসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইন ২০১০ বলবৎ থাকলেও আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটছেই। অন্যদিকে বাল্য বিয়ে নিরোধ আইন ২০১৭ এর বিশেষ ধারা বাল্য বিয়ের পথ প্রশস্ত করেছে।

অধিকার তথ্য-প্রমাণ দিয়ে বলছে, এ বছরের প্রথম ছয় মাসেও সরকারিদলের নেতা-কর্মীদের দুর্বৃত্তায়ন ও সহিংসতা অব্যাহত থাকে। এ সময় সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এইসময় এরা চাঁদাবাজি, টেন্ডার ও জমি দখল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতাসহ বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটায় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়মুক্তি লাভ করে। অধিকার এর প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট ৪৭ জন নিহত ও ২৪৬৫ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া এই সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ১৬৫টি এবং বিএনপি’র ১০টি অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ৪০ জন নিহত ও ১৮০৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। অপরদিকে, বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ১৩৮ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিরোধী মতাদর্শ দমনের অংশ হিসেবে গত সাড়ে তিন বছরে ৩৮১ জন জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত দেখিয়ে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্তের তালিকায় গাজীপুর, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়ররা রয়েছেন। এর মধ্যে সিলেট ও রাজশাহীর মেয়রকে দ্বিতীয় দফা বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তকৃত জনপ্রতিনিধিদের অধিকংশই বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

গত ২৮ মার্চ জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি গুমের ‘উচ্চহার’, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর অত্যাধিক বল প্রয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সমালোচনা করেছে। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি এইসব অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না থাকায় কমিটি মন্তব্য করে যে, এর ফলে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারগুলো বিচার পাচ্ছে না। দেশের আইনে গুমের স্বীকৃতি না থাকা এবং তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত না হওয়ায় তারা আরও বেশী উদ্বিগ্ন বলে মন্তব্য করেছেন। গুম বন্ধের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিস্অ্যাপেয়ারেন্সেস।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত ফিরে আসেনি তারা হলেন, রংপুরজেলার শফিকুল ইসলাম মধু, ঢাকাজেলার মোহাম্মদ হাসান, চট্টগ্রাম জেলার এস এম শফিকুর রহমান এবং তাঁর দুই শ্যালক মো. হাসান তারেক ওমোয়াজ্জেম হোসেন সাথী, রাজশাহীজেলার আব্দুল কুদ্দুস, ঝিনাইদহ জেলার এনামুল হক, নরসিংদি জেলার মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান নাহিদ, টাঙ্গাইল জেলার আব্দুল মান্নান, শমসের ফকির ও জহুরুল ইসলাম, এবং আরও ১৫ জন। এছাড়াও গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে পরবর্তীতে যাঁদের লাশ পাওয়া গিয়েছে তাঁরা হলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলারমোহাম্মদ হানিফ মৃধা, চট্টগ্রামজেলার নুরুল আলম নুরু, কুষ্টিয়া জেলার রফিকুল ইসলাম, যশোর জেলার মইদুল ইসলাম ওরফে রানা এবং আলিমুদ্দিন এবং চুয়াডাঙ্গা জেলারমোহম্মদ আরজুল্লাহ।

মত প্রকাশ ও রাজনৈতিক অধিকারও ভূলুন্ঠিত : অধিকার’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে ২০ মে ভোরে ঢাকার গুলশানে অবস্থিত বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়েকোন প্রকার পূর্ব নোটিশ ছাড়াই পুলিশ তল্লাশি চালায়। এই বিষয়ে পুলিশ বলেছে, সেখানে কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড চলছিল কিনা, কোনো ডকুমেন্ট রয়েছে কিনা তা দেখতেই এই তল্লাশী অভিযান চালানো হয়। তবে তেমন কিছু পাওয়া যায় নাই।

ক্ষমতাসীনদল নিজেরা নির্বিঘ্নে সভা-সমাবেশ করলেও গত ছয় মাসে সরকারদলীয় কর্মী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা বিরোধীদল বা বিভিন্ন দাবি দাওয়া আদায়ের জন্য আন্দোলনরত সংগঠন বা গোষ্ঠীর সভা-সমাবেশে বাধা দিয়েছে এবং হামলা করেছে। জুন মাসে রমজানের সময় মসজিদেরভেতরে হামলা করে বিরোধীদল বিএনপি আয়োজিত ইফতার মাহফিল পণ্ড করে দিয়েছে ক্ষমতাসীনদলের নেতা-কর্মীরা। পাহাড় ধ্বসে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের সমবেদনা ও সহায়তার জন্য রাঙ্গামাটিতে যাওয়ার পথে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়ি বহরে ক্ষমতাসীনদলের সমর্থকরা হামলার ঘটনা ঘটে।

রামপালে ভারতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনবিনাশী সব চুক্তি বাতিলসহ সাতদফা দাবিতে হরতাল চলাকালে হরতাল সমর্থকদের ওপর পুলিশ পানিকামান ব্যবহার ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পুলিশের হামলায় দু’জন সংবাদকর্মীসহ শতাধিক হরতাল সমর্থক আহত হন। ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত সারাদেশে কালো পতাকা মিছিলে পুলিশ বাধা দিয়েছে এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলায় অনেক জায়গায় মিছিল-সমাবেশ পণ্ড হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলা শাখা এক সভা করার সময় বাঞ্ছারামপুর উপজেলা যুবলীগ কর্মীরা সেই সভায় হামলা চালিয়ে সভা প- করে দেয়। জনগণতান্ত্রিক আন্দোলন নামে একটি সংগঠনের গুলশানের স্পেকট্রা কনভেনশন সেন্টারে ‘সীমান্ত হত্যাঃ রাষ্ট্রের দায়’ শীর্ষক একসেমিনার পুলিশের বাধার মুখে প- হয়ে যায়।সেমিনারে সভাপতিত্ব করার কথা ছিল কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করার কথা ছিল আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের ঢাকা শহরে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হরতাল চলাকালে শাহবাগে প্রগতিশীল ছাত্র জোটের নেতা-কর্মীদের ওপর পুলিশ হামলা চালায় এবং টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে।

ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়নে বিএনপির চেয়ারপরসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমানের বাড়ির পাশে বায়তুল আমান জামে মসজিদের ভেতরে বিএনপি আয়োজিত ইফতার মহফিলে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগেরনেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে ইফতার মহফিল প- করে দেয়। এই ঘটনায় দায়ি ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আমানউল্লাহ আমানসহ ১৭৯ জনের বিরুদ্ধে হযরতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহের আলী কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন। এই মামলায় আরো অজ্ঞাত ৩শ’-৪শ’ জনকে আসামি করা হয়েছে।

ফেসবুকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তি ও তাদের পরিবার এর বিরুদ্ধে লেখার জন্য নিবর্তনমূলক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০০৯ এবং ২০১৩) ব্যবহার করে ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ১৩ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আফসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে অসত্য বক্তব্য দেয়ার অভিযোগ এনে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ চৌধুরী ৫ জুন গুলশান থানায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন।

গণমাধ্যমের কন্ঠও মুক্ত নয় : অধিকার বলছে, গণমাধ্যমের ওপর বর্তমানে যে হস্তক্ষেপ চলছে তা ব্যাপকভাবে শুরু হয় ২০১৩ সাল থেকে। ওই বছর আমার দেশ, দিগন্ত টিভি এবং ইসলামিক টিভি বন্ধ করে দেয়া হয়, যা এখনও বলবৎ আছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় আরও অনেকগুলো নতুন বেসরকারি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার অনুমোদন দিয়েছে সরকার, যেগুলোর মালিকরা সবাই সরকারের সমর্থনপুষ্ট ব্যক্তি। ১৯ জুন অনলাইন সংবাদমাধ্যমকেও সম্প্রচার কমিশনের অধীনে এনে ‘জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা ২০১৭’ এর খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রীসভা। সম্প্রচার আইনের ১৯ ধারা লঙ্ঘন করলে অনধিক সাত বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ডর করা যাবে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। এই নিবর্তনমূলক আইনের মাধ্যমে সরকার অনলাইন সংবাদমাধ্যমকেও নিয়ন্ত্রণ করবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এছাড়া পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে সরকারিদলের সমর্থক দুর্বৃত্তদের হামলায় সাংবাদিকদের নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনা অব্যাহত আছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে তাদের গ্রেফতার করার ঘটনাও ঘটেছে। অধিকার’র সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে ১ জন নিহত, ১০ জন সাংবাদিক আহত, ২ জন লাঞ্ছিত, ৯ জন হুমকির সম্মুখীন এবং ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

মানবাধিকার কর্মকাণ্ডে প্রতিবন্ধকতা : বর্তমান সরকার অধিকার এর ওপর হয়রানি অব্যাহত রেখেছে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার অধিকার’র বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনের কারণে এর ওপর হয়রানি শুরু করে। এরপর ২০১৩ সালে ৫ ও ৬ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের ঘটনার ওপর অধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর ২০১৩ সালের ১০ অগাস্ট রাতে অধিকার এর সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খানকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)’র সদস্যরা তুলে নিয়ে যেয়ে পরবর্তীতে আদিলুর এবং অধিকার এর পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলানকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ (সংশোধিত আইন ২০০৯ এর ৫৭/১ ধারায়) এ অভিযুক্ত করে। আদিলুর এবং এলানকে যথাক্রমে ৬২ ও ২৫ দিন আটক রাখা হয়। অধিকার এর সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খান, অধিকার এর কর্মীবৃন্দ এবং অধিকার এর কার্যালয়ের ওপর গোয়েন্দাদের নজরদারি চলছে এবং অধিকার এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সারাদেশের মানবাধিকার কর্মীদের ওপর নজরদারিসহ মানবাধিকার কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদান অব্যাহত আছে।

আগের বছরগুলোর মতই ২০১৭ সালের প্রথম ছয় মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় বিএসএফ কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফ সীমান্তে নির্বিচারে বাংলাদেশী নাগরিকদের নির্যাতন ও হত্যা করছে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বাংলাদেশী নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। অধিকার এর তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে বিএসএফ ১০ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। তাদের মধ্যে ৭ জনকে গুলিতে, ১ জনকে নির্যাতন করে, ১ জনকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা হয়েছে ও বিএসএফ’র ধাওয়া খেয়ে পদ্মা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ১ জন মারা যান। এছাড়া ২৪ জন বাংলাদেশীকে বিএসএফ আহত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে ৫ জন বিএসএফ’র গুলিতে, ১০ জন নির্যাতনে, ৬ জন পাথর নিক্ষেপের কারণে এবং ৩ জন সাউন্ড গ্রেণেড বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন। এই সময়ে বিএসএফ কর্তৃক অপহৃত হন ১৪ জন বাংলাদেশি।

অধিকার বলছে, সরকারকে অবশ্যই জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির ১১৯তম সভার সুপারিশগুলো মানতে হবে। অবিলম্বে গুম হওয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর গৃহীত সনদ ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দি প্রোটেকশন অফ অল পারসনস্ ফ্রম এনফোর্সড ডিসএপিয়ারেনস্’ অনুমোদন করার দাবী জানাচ্ছে সংস্থাটি। সরকারকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গুলোর সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।সেই সঙ্গে তাদেরও বিচার করতে হবে যারা হয়রানী এবং চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত। দমনমূলক অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ড থেকে সরকারকে বিরত থাকতে হবে। বিরোধীদল ও ভিন্নমতালম্বীদের সভা-সমাবেশ করার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। সাংবাদিকসহ সমস্ত মানবাধিকার কর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের করা সবগুলো মামলা প্রত্যাহার করতে হবে এবং তাঁদের ওপর হামলার ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষী ব্যক্তিদের বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। আমার দেশ পত্রিকা, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি ও চ্যানেল ওয়ান টিভির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। নির্বতনমূলক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ (সংশোধনী ২০০৯ ও ২০১৩) ও বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যাহতকারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নজরদারী বন্ধ করতে হবে। সরকারকে বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের হয়রানি করা বন্ধ করতে হবে।

Comments

comments