ফিরিয়ে দিন, নয় জবাব দিন

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস পালিত: গুমের শিকার ২৯টি পরিবারের সদস্যদের দাবি

‘মায়ের ডাক, সন্তানদের মায়ের কোলে ফিরিয়ে দাও’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশ নেন গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা। এ সময় নিখোঁজ সাজেদুল ইসলামের ছোট মেয়ে আরওয়া ইসলাম বাবার জন্য কান্নায় ভেঙে পড়ে। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে l সাজিদ হোসেন

‘বাবা-মায়ের চোখের সামনে থেকে সন্তানকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো, সন্তানের সামনে থেকে বাবাকে, বোনের সামনে থেকে ভাইকে…। তুলে নেওয়ার সময় কেউ পরিচয় দিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, কেউ এসেছিল সাদাপোশাকে। এখন এসে সরকার বলছে তারা কিছু জানে না। তাহলে কে জানে? আমরা এর জবাব চাই। হয়, আমাদের প্রিয়জনদের ফিরিয়ে দিন, নয় জবাব দিন। আর প্রতীক্ষা করতে পারছি না। পরের বছরও একই দাবিতে একইভাবে আমরা আর সমবেত হতে চাই না।’

গুমের শিকার ২৯টি পরিবারের সদস্যরা গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে সমবেত হয়ে সরকারের কাছে এভাবেই তাঁদের দাবির কথা জানান। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস সামনে রেখে গত কয়েক বছরের মতো এবারও নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা একত্র হয়েছিলেন। ‘মায়ের ডাক, সন্তানদের মায়ের কোলে ফিরিয়ে দাও’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হওয়া সাজেদুল ইসলাম সুমনের বৃদ্ধ মা হাজেরা খাতুন। তিনি বলেন, ‘আমার একটাই চাওয়া, মৃত্যুর আগে একবার ছেলেটাকে দেখে যেতে চাই।’ শোকবিহ্বল পরিবেশে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। সবার হাতে ছিল প্রিয়জনের ছবি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ছোট্ট মেয়ে আদিবা ইসলাম কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমি তো বড় হয়ে যাচ্ছি, আমার বাবা ফিরে আসছে না কেন?’ আদিবার আশা, তার বাবা ফিরবেনই। চার বছর আগে ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর ঢাকার শাহবাগ থেকে নিখোঁজ হন তার বাবা পারভেজ হোসেন।

আলোচনায় লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন পড়ে শোনান ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নিখোঁজ সাজেদুল ইসলামের দুই বোন মারুফা ইসলাম ও আফরোজা ইসলাম। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘আজ আমাদের গুম পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত হতে হচ্ছে। এর মধ্যে গুম হওয়া মুন্নার বাবা ও পারভেজের বাবা মারা গেছেন। এর থেকে পরিত্রাণ চাই। আমাদের স্বজনেরা কোথায়, কী অবস্থায় রয়েছে, তা জানতে চাই। গুমের তালিকায় আমরা আর নতুন নাম দেখতে চাই না।’

২০১৩ সালে মিরপুর পল্লবী থেকে গুম হওয়া বিএনপিকর্মী সেলিম রেজা পিন্টুর বোন বলেন, ‘আমরা পুলিশের কাছে কোনো তথ্য পাই না। সিআইডির কাজেরও কোনো অগ্রগতি নাই।’

অনুষ্ঠানে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী গুমের জন্য সরকারকে দায়ী করে বলেন, ‘গতকাল ফরহাদ মজহারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে আলোচনায় আমি বুঝতে পেরেছি, পুলিশ ও র‍্যাব সক্রিয় ছিল বলে উনি ফিরে আসতে পেরেছেন। এতে বোঝা যায়, তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অন্য কোনো শক্তি কাজ করেছিল। তাই পুলিশ ও র‍্যাবকে সক্রিয় করার জন্য জোর অনুরোধ জানাচ্ছি।’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমি গুমের পরিস্থিতির শিকার। এই কঠিন সময়টি সম্পর্কে আমি জানি। গুম অস্বীকার করার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এসব গুম রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতেই করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) পরিচালক সি আর আবরার বলেন, একটা ভয়ের আবহ ও পরিস্থিতির মধ্য নিখোঁজের স্বজনেরা এখানে এসেছেন। যারা গুমের পেছনে জড়িত, তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক। গুম পরিবারগুলোর যে অভিযোগ রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার জবাব দেওয়া।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘গত চার বছর আমরা নানাভাবে গুমের বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে যাচ্ছি। আমরা এখন আর আবেদন জানাতে চাই না। এই পরিস্থিতিতে আমরা মার্চ মাসের মধ্যে গণশুনানি করতে চাই। ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চাই।’

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের পরিচালক নাসিরউদ্দিন এলান বলেন, ২০১৭ সালের আগে দেখা যেত প্রশাসন পরিচয় দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন উধাও হয়ে যাচ্ছে। নিখোঁজ হলো, না মারা গেল, নাকি গুম, তা বোঝাও যাচ্ছে না। আমরা জানতে চাই কী হচ্ছে?’

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, প্রতি মুহূর্তের অপেক্ষা মৃত্যুর চেয়ে অনেক কঠিন। গুমের শিকার পরিবারগুলো সেই কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

Comments

comments