“জোরপূর্বক অপহরণ” আশঙ্কাজনক অবস্থানে বাংলাদেশ

আল জাজিরা অবলম্বনে এস মোর্শেদ

একজন বাংলাদেশি সাবেক কুটনীতিককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না গত ৪ ডিসেম্বর থেকে। বাহ্যিক আলামত দেখে সকল প্রত্যক্ষদর্শীই একে “জোরপূর্বক অপহরণ” হিসেবেই দেখছেন।

সেদিন কাতার ও ভিয়েতনামে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান তার মেয়েকে আনতে বিমানবন্দরের উদ্দ্যেশে গাড়ী নিয়ে রওয়ানা হন কিন্তু আর ফেরা হয়নি সাবেক এই রাষ্ট্রদূতের।এর পরদিন সকালে বিমানবন্দর থেকে ৩.৭ কি.মি দূরে খিলক্ষেত থেকে পরিত্যাক্ত অবস্থায় তার গাড়িটি উদ্ধার করা হয়। মি: জামানের ফোনের সিমটি সে স্থান থেকে প্রায় ৩.৮ কিমি দূরে সর্বশেষ সচল ছিল বলে জানায় পুলিশ।

বিগত চার মাসে একই রকম কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা জামানের নিরুদ্বেশকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। যেমন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুবাশ্বের হাসান গত ৭ নভেম্বর থেকে নিখোঁজ আছেন।

উভয় ক্ষেত্রেই পরিবারের কাছ থেকে কোনরূপ মুক্তিপণ চাওয়া হয়নি ।

শিক্ষাবিদ হাসানের অনেকগুলো আর্টিক্যাল ছিল বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও ইসলামী রাজনীতি নিয়ে।

আওয়ামীলীগ সরকার ও শেখ হাসিনাকে কটাক্ষ করে মারুফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই পোস্ট দিতেন।

আর জামান বিএনপি সরকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং তিনি আওয়ামীলীগ সরকার বিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

৬১ বছর বয়সী এই বিপত্নিক মানুষটি মূলত কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না এবং তার অধিকাংশ সময় বাড়িতেই কাটত।

জোরপূর্বক গুম?

মারুফ জামানের ছোট মেয়ে সামিহা জাহান (যাকে আনতে গিয়ে তিনি গুমের শিকার হন) আল-জাজিরাকে জানান যে, তিনি বাড়িতে আসার পর তার বাবার রুম অগোছালো দেখতে পান এমনকি তাদের কাজের মেয়ে দুজনকে বিধ্বস্ত দেখতে পান।

মারুফ জামান সন্ধ্যা ৬ : ২০ এ বের হওয়ার পর ৭ : ৪৫ এ তার কাজের মেয়েকে ফোন দেন এবং বিধ্বস্ত কন্ঠে জানান, “লাকি, কিছু লোক আসবে তাদেরকে আমার ল্যাপটপ ও কম্পিউটার দিয়ে দেবে”। নাম্বারটি ছিল “০০০১২৩৪৫৬” যা বাংলাদেশী কোন মোবাইল কিংবা ল্যান্ড ফোন নাম্বার হতেই পারে না। মোবাইল অপারেটর কোম্পানী একজন কর্মকর্তা জানান সম্ভবত কোন ডিভাইস ব্যবহার করে মূল নাম্বারটি মাস্ক করা হয়েছিল।

৮ : ০৫ এ তিনজন লোক এসে তার তার ব্যাবহারের জিনিস যেমন ল্যাপটপ ও ঘরের কম্পিউটার, তার ঘরে রেখে যাওয়া অতিরিক্ত স্মার্টফোন এবং ক্যামেরা নিয়ে যায়। এবং তারা বিশেষ নিয়মে তার সবগুলো ড্রয়ার খুলে সার্চ করে।

সিসিটিভির ফুটেজ থেকে দেখা যায় তারা কালো শার্ট, জিন্স পরা ছিল। মাথায় থাকা ক্যাপে মুখ ঢেকে রাখায় তাদের পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি। সামিহা জানান পুরো একরাত অপেক্ষা করে পরের দিন তিনি ধানমণ্ডি থানায় একটি নিখোঁজের জিডি করেন।

ধানমন্ডি থানার দায়িত্বরত পুলিশ ওসি মোহাম্মদ আবদুল লতিফ জানান, “আমরা তার ফোন সর্বশেষ এক্টিভ দেখতে পেয়েছি দক্ষিনখানে। আমরা সেদিন কি ঘটেছিল তা জানার চেষ্টা করছি”।

জামানের এপার্টমেন্টে যাওয়া লোকদের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান থানায় করা ডায়েরীতে এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি এবং বিষয়টি তাদের জানা নেই । এবিষয়ে জামানের মেয়েকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান তার এক আত্মীয়ের পরামর্শে তিনি বিষয়টি থানায় উল্লেখ করেননি।

গুম হওয়া ব্যক্তিরা

জামানের বড় মেয়ে সবনম জামান জানান, “পরিস্থিতি এটাই প্রমাণ করে যে এটা পুর্ববর্তী গুম হওয়া ব্যক্তিদেরই ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাই এর জন্য দায়ী। এই কথা বলার পেছনে অন্য আরো অনেক কারণ রয়েছে। যাইহোক, অনেক আগে রিটায়ার্ড করার পরে ও তাকে গুম করার একটাই কারণ তার কিছু দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত। এছাড়া আর কোন কারণ আমার জানা নেই।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার এক বুদ্ধিজীবী বলেন স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে জামানের ঘটনাটি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঘটে যাওয়া “জোরপূর্বক অপহরণ” এরই সর্বশেষ অংশ।

ঢাকা ট্রিবিউনের তথ্য অনুসারে বিগত চারমাসে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে ১৪ জনকে অপহরণ করা হয়েছে কিন্তু মজার বিষয় হল একটি ক্ষেত্রেও মুক্তিপণ দাবি করা হয়নি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গুম হওয়া মানুষ গুলোর ব্যবহৃত জিনিসগুলোই কিডনাপকারীদের কাছে বেশী আকর্ষণের বিষয় ছিল।

এই গুম হওয়া মানুষদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত,রাজনীতিতে সক্রিয় নয় এমন এবং শিক্ষিত পরিবারের মানুষ। তাদেরকে টাকার জন্য অপহরণ করা হয়নি কারণ তাদের কারো জন্য মুক্তিপণ দাবি করা হয়নি। ঐ বিশেষজ্ঞ বলেন “এই ঘটনার মাঝে যোগসূত্র স্থাপন করা কঠিন শুধু একটি সূত্রই তাদের ক্ষেত্রে মিলে যায় তা হল তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জুলাই মাসে দাবি করে বাংলাদেশ সরকার শত শত মানুষকে গোপন বন্দীশালায় বন্দী করে রেখেছে যারা মূলত শেখ হাসিনা সরকারের বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। তারা আরো জানায় শুধু বিগত বছরেই ৯০ জনের বেশী লোককে গোপন কারাগারে বন্দী করা হয়েছে। অধিকাংশকেই আদালত থেকেই গুম করা হয়েছে কিন্তু ২১ জনের ক্ষেত্রে তথ্য পাওয়া যায় যে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে এবং আরো ৯ জনের খোঁজ আজ পাওয়া যায়নি।

উদ্বেগের মূল বিষয়সমূহ

বাংলাদেশী মানবাধিকার সংস্থা আইন ও শালিশ কেন্দ্রের (আশক) তথ্যানুসারে,বাংলাদেশে ২০১০ থেকে জুলাই ২০১৭ পর্যন্ত ৫১৯ জনকে জোরপূর্বক অপহরণ করা হয়েছে এবং আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এদের ৩২৯ জনের এখনো খোঁজ মেলেনি। সংস্থাটি আরো জানায় এ ধরনের গুমের শিকার হওয়া ব্যাক্তিদের অধিকাংশ পরিবারই এর জন্য বারবারই আইন শৃংখলা রক্ষাকারীবাহিনীকে দায়ী করে আসছে। এমনকি যারা গুম হওয়ার পরে ফিরে এসেছে তারাও একই কথা বলছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গুম হওয়া লোকদের লাশ পাওয়া যায়। অন্যদেরকে পরে আইন শৃংখলা রক্ষাকারীবাহিনী বিভিন্ন অভিযোগে আটক দেখায়, আইন ও শালিশ কেন্দ্রের মতে গত সাড়ে সাত বছরে এমন আটকের সংখ্যা ১৯০।

ধানমন্ডি থানার ওসির দেয়া তথ্যানুযায়ী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সর্বশেষ খবর হচ্ছে পুলিশ এখনো জামানের খোঁজ করে যাচ্ছে।

Comments

comments