মানবিক ঐক্য ও সংহতি যে মিথ্যা রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডিই তার প্রমাণ!

মিয়ানমারে কী ঘটছে, তা নিয়ে এখন আর কেউ তর্ক করছে না। জাতিসঙ্ঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং বিশ্বের রাজধানীগুলোর সব মানুষই একমত, রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ তথা নৃশংসতা চালানো হচ্ছে, তা জাতিগত নিধন এবং গণহত্যার একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ।

আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, রাখাইনে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হত্যা, নির্যাতন ও বর্বরতার কারণে গত অক্টোবর পর্যন্ত ছয় লাখ রোহিঙ্গা তাদের বাড়িঘর থেকে পালিয়ে গিয়ে উদ্বাস্তু বা শরণার্থীতে পরিণত হয়েছে। এই সঙ্কটের ক্রমেই অবনতি ঘটছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে। মিয়ানমার সরকারের অসহিষ্ণুতা এবং তাদের গোষ্ঠীগত ও বর্ণবাদী মনোভাব তথা দেশ থেকে বের করে দেয়ার নীতি; অপর দিকে প্রকৃত ব্যাপার হলো, মিয়ানমারে এখন যা ঘটছে, সে ব্যাপারে খুব একটা গভীরে যাওয়ার জন্য বিশ্বের তেমন কোনো স্বার্থ বা আগ্রহ নেই।

মানবিক ঐক্য
রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি অত্যন্ত বিপজ্জনক যে বিষয়টি উন্মোচিত করে দিয়েছে, তা হলোÑ ‘মানবিক সংহতি বা ঐক্যের’ ধারণা হয়তো নিছক একটি বড় মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। যারা জাতি ধর্ম, বর্ণ অথবা আদর্শ নির্বিশেষে স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের আহ্বান জানাচ্ছে, তারা আজ ব্যাপক বাধাবিপত্তির সম্মুখীন।

এটা কেন ঘটছে? আমাদের চোখের সামনে কেন ব্যাপকভাবে এই মানবহত্যাকাণ্ড চালানো হচ্ছে? কেন বন্ধ করা হচ্ছে না? সেখানে কি কোনো অজানা শর্ত রয়েছে, যা মানবিক সংহতি দেখাতে অবশ্যই পূরণ করতে হবে? আর বিশেষ কোনো জনগোষ্ঠীর দুর্দশার অবসান ঘটানোর জন্য প্রয়োজনীয় কোনো প্রস্তাব কি আছে?

এগুলো হলো প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর আতঙ্কিত করার মতো হবে বলে ভয় পাচ্ছি। যারা শক্তিশালী ও ধনী, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাদের রাজনৈতিক অথবা অর্থনৈতিক ক্ষমতা আছে, কেবল তাদের জন্যই কি মানবিক ঐক্য বা সহমর্মিতা? আমরা বলেছি- স্বৈরশাসক তথা একনায়কেরা তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এবং বিরোধী দল অথবা রাজনৈতিক বিরোধীপক্ষকে ধ্বংস করার জন্য যে ‘সন্ত্রাসবাদ’কে ব্যবহার করে, রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি হচ্ছে তার নিশ্চিত প্রমাণ। অনেকেই বুঝতে শুরু করেছেন মানব ঐক্য বা সংহতির বিস্তৃতি মুসলিমদের দিকে নয়। এই মতামত কতটুকু সঠিক তা বিবেচনা না করেই বলা যায়, কিছু মানুষের মনের গভীরে যে এই সন্দেহ স্থান পেয়েছে- এটা হচ্ছে তার নির্দেশক। আর এটা কোনো ভালো জিনিস নয় এবং রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডির মাধ্যমেই একমাত্র এই ক্ষতি বা বঞ্চনার বিষয়টি বেরিয়ে আসেনি। মিয়ানমার সরকার প্রতিদিন ভয়ঙ্করভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যাচ্ছে এবং এখনো তারা তাদের অপকর্মকে সমর্থন করার মতো মিত্র পাচ্ছে। এটা পরিষ্কার যে, রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার দায় মিয়ানমার সরকারের। মিয়ানমারে যা ঘটছে সে ব্যাপারে তাদের অস্বীকৃতি হচ্ছে মিথ্যাচার।

অধিকার এবং স্বাধীনতার জন্য যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত হলেও নিজের অতীত ভূমিকাকে জলাঞ্জলি দিয়ে স্বৈরাচারী শাসকের সাথে হাত মিলিয়ে মিয়ানমার সরকারের নেত্রী ও নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি ধ্বংসযজ্ঞের প্রধান হোতা হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন।
সত্যিই এটা মর্মান্তিক যে, সু চি বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য এবং ধৃষ্টতার সাথে সহিংসতা ও জাতিগত নিধনের কথা অস্বীকার করছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তার বক্তব্যকে ‘অসত্যের মিশ্রণ এবং নির্যাতিতদের দোষারোপের অপপ্রয়াস’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অং সান সু চি মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম করে জয়লাভ করতে পারেন। কিন্তু তিনি এখন তার ‘জাতি’ এবং তাদের সামরিক লক্ষ্য পূরণে জন্য সংগ্রাম করাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে বহিষ্কার বা বাধাদান, একঘরে করে রাখা এবং বৈচিত্র্যকে প্রত্যাখ্যান করা। যে নারীকে এত সম্মান দেয়া হতো, তার কী মর্মান্তিক পরিণতি!

‘সন্ত্রাসবাদের’ দোহাই
স্বৈরাচারীরা তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশে বিরোধী পক্ষ অথবা রাজনৈতিক বিরোধীদের ধ্বংস বা নির্মূল করার জন্য সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করে থাকে। রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডিও এর ব্যতিক্রম নয়। এই ট্র্যাজেডিকেও সন্ত্রাসবাদের ছদ্মাবরণে ধামাচাপা দেয়ার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে।

বিশ্ববাসী দেখেছে, কিভাবে গ্রামের পর গ্রাম আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে এবং সেখানকার অধিবাসীদের হত্যা করা হয়েছে অথবা তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করে শরণার্থীতে পরিণত হতে বাধ্য করা হয়েছে।

‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ নামে সব ধরনের বর্বরতা চালানো হচ্ছে। কে এই নৈরাজ্যকে মেনে নেবে? এ ব্যাপারে আর চিন্তা করতে পারছি না। প্রকৃত সত্য হলো, ‘সন্ত্রাসবাদ’কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিরোধী পক্ষকে কোণঠাসা করে রেখে স্বৈরাচারী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা এবং তাদের ভিত্তিকে সুদৃঢ় রাখার অপপ্রয়াস চালানো হয়। জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সন্ত্রাসবাদের এ ধরনের ব্যবহার প্রতিরোধ করতে সাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে।

কর্তৃত্ববাদী সরকারকে নিজেদের লক্ষ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ‘সন্ত্রাসবাদ’কে ব্যবহার করার সুযোগ থেকে অবশ্যই বঞ্চিত করতে হবে। শুধু তাই নয়, বরং যেকোনো কারণে কারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে, অবশ্যই তারও হিসাব নিতে হবে।

বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান নানা মহল থেকে ব্যাপকভাবে এসেছে। খুব দেরিতে এই আহ্বান এলেও এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যেতে পারে। মিয়ানমারে মানবতার বিরুদ্ধে যে অপরাধ সঙ্ঘটিত হচ্ছে, সে ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করা পর্যন্ত মিয়ানমার সরকার সম্ভবত এই আহ্বানে সাড়া দেবে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সেখানে হামলা চালাচ্ছে, গুলি করছে। রোহিঙ্গাদের অধিকারকে তারা অস্বীকার করে যাচ্ছে এবং তাদের ওপর নির্যাতন চালাতে গিয়ে এ ক্ষেত্রে তারা কোনো ভুল বা অন্যায় দেখছে না।

রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডির মাধ্যমে দেখা গেল, জাতিসঙ্ঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র কিভাবে নিজের দেশে জাতিগত ও বর্ণগত এবং ধর্মীয় বৈষম্যকে অভ্যন্তরীণ নীতি হিসেবে লালন করছে। কোনো আন্তর্জাতিক শাস্তির পরোয়া না করেই তারা এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। তাই মিয়ানমার সরকারের ওপর অবশ্যই চাপ বৃদ্ধি করতে হবে।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করার এখনই সময়। যে রাষ্ট্র বর্ণবাদী নীতিকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে, তার ব্যাপারে আমাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেয়া উচিত নয়। কয়েক দশক ধরে যে মানবিক বিপর্যয় ও ট্র্যাজেডি ঘটছে- তা বন্ধ করার এখনই সময়।

কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে একটি চুক্তিতে উপনীত হয়েছে। অথচ কয়েক দিন আগেও, এমনকি এখনো তাদের জোরপূর্বক মিয়ানমার থেকে বের করে দেয়া অব্যাহত রয়েছে। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলেও তাদের ফিরে যাওয়ার জন্য তা যথেষ্ট নয়।

রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রত্যাবাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ট্র্যাজেডির অবসান ঘটানোর জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মিয়ানমার সরকার তাদের জাতিগত নির্মূল অভিযানের পুনরাবৃত্তি না করার কী গ্যারান্টি দিয়েছে?

এই চুক্তির প্রস্তাবনায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জঘন্য বৈষম্য অবসানের কথা অবশ্যই থাকতে হবে। তাদের অবশ্যই মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে বেসামরিক ও রাজনৈতিক অধিকার দিতে হবে।

মানবতা এবং ন্যায়বিচারের সঠিক অর্থ না জেনেই দীর্ঘ দিন ধরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে বসবাস করছে। এখন যদি তারা ওইগুলোর কিছুটা হলেও পায়, তা কি বিস্ময়কর হবে না? আমাদের অবশ্যই সব শক্তি দিয়ে শুধু তাদের জন্য নয়, বরং সবার জন্য এই বিষয়টি উপলব্ধি করার জন্য কাজ করতে হবে।

লেখক : ইয়েমেনের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

Comments

comments