খালি মাঠে গোল দেয়ার খায়েশ

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

গণবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক শক্তি সব সময়ই জনতার শক্তিকে ভয় পায়। পৃথিবীর যেসব দেশে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, তারাও গণতন্ত্রের নামাবলি ধারণ করতে চায়। গণতন্ত্রের আগে যখন আরেকটি বিশেষণ সংযোজিত হয় যেমন মৌলিক গণতন্ত্র, শোষিতের গণতন্ত্র, উন্নয়নের গণতন্ত্র, নয়া গণতন্ত্র অথবা নির্দেশিত গণতন্ত্র- তখনই বুঝতে হবে ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’। আমাদের দেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। এ দেশে বাকশালের নাম দেয়া হয়েছিল শোষিতের গণতন্ত্র আর সামরিক শাসনের নামকরণ হয়েছিল নয়া গণতন্ত্র। সবশেষ সামরিক নেপথ্যের নায়ক মইন ইউ আহমেদ ইউনিক ডেমোক্র্যাসির স্বপ্ন দেখেছিলেন। এখন আমাদের উন্নয়নের গণতন্ত্রের গুণকীর্তন শুনতে হচ্ছে। এ ধরনের গণতন্ত্রীরা নির্বাচনের নামে প্রহসন করে। দেশে ও বিদেশে এই প্রহসন করে তারা বৈধতা নেয়ার চেষ্টা করে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যখন এরা বোগাস নির্বাচন করে, তখন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা শোনা গিয়েছিল। এখন নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আাসছে ততই শাসক দলের আদি নেতা, পাতিনেতা ও হাইব্রিড নেতাদের মুখে গণতন্ত্রের জয়গান বেশি বেশি করে শোনা যাচ্ছে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক এতিম বলে পরিচিত একজন বাম নেতা নেত্রীর অনুগ্রহে মন্ত্রী হয়েছেন। তিনি সেদিন বলেছেন- ‘খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে দেখতে চাই।’ সে লক্ষ্যে তিনি এবং তার রাজনৈতিক প্রভুরা নানা ধরনের কলকব্জা আঁটছেন। এটা সত্যি কথা যে, খালেদা জিয়া এবং তার দলকে নির্বাচনের বাইরে না রাখতে পারলে তাদের গদি রক্ষার কোনো সম্ভাবনা নেই। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনে তিনি ‘বিপুল ভোটে’ নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপি প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করার কৃতিত্ব দাবি করেছেন। সে নির্বাচনে বিএনপিকে ওইসব নেতার কারসাজিতে হাত-পা বেঁধে সাঁতার দিতে বাধ্য করা হয়েছিল- এ কথা সবারই জানা। লোকে বলে- যার মেম্বার হওয়ার যোগ্যতা নেই সে কী করে নির্বাচিত হবে? তিনি স্বনামে স্বদলের পরিচয়ে নির্বাচিত হওয়ার কোনো যোগ্যতাই রাখেন না। তিনি অবশ্য কয়েক সপ্তাহ আগে ১% ফর্মুলা দিয়েছিলেন। ১% না হলে তো ১০০% পূরণ হয় না। এমনকি ৯৯.৯৯% হলেও ১০০% হলো না। সুতরাং তাদের সহযোগিতা না হলে ক্ষমতাসীনেরা ১০০ বছরেও ক্ষমতার মুখ দেখত না। ক্ষমতা না পেলে তারা রাস্তায় ফ্যাঁ ফ্যাঁ করত। এত বড় গরম কথা বলার পর নরম হতেও তার সময় লাগেনি। এসব লোক, যারা বঙ্গবন্ধুর নিকৃষ্ট সমালোচনা করত- তাকে উৎখাতের জন্য ‘গণবাহিনী’ ও ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ বানিয়েছিল, এখন তারা বঙ্গবন্ধুর প্রশস্তি গাইছে। চোরের মায়ের বড় গলা আর কাকে বলে! অপর দিকে জাতির বিয়াই সাহেব বলেছেন, তারা (বিএনপি) ক্ষমতায় এলে গণতন্ত্র দূরের কথা উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়বে। আরেকজন স্বাস্থ্য বিভাগের অস্বাস্থ্যকর নেতা বিএনপির কর্মকাণ্ডে অশনিসঙ্কেত দেখতে পাচ্ছেন। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে এসব নেতা বেসামাল হয়ে পড়েছেন। তাদের নেতৃত্বে দেশ শান্ত ও নিরাপদ রয়েছে বলে বলা হচ্ছে। উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ বেগবান। সুতরাং তারা ২০২১, ২০৪১ কেন; প্রয়োজনে অনন্তকালের জন্য ক্ষমতায় থাকতে পারেন। তাতে নির্বাচনের প্রয়োজন হবে কেন?

নির্বাচনকে তারা যেভাবে প্রহসনে পরিণত করেছেন, তার চেয়ে বরং নির্বাচন না হওয়া ভালো। অনেক দেশে রাজতন্ত্র আছে। ইচ্ছা করলেই তারা রাজতন্ত্র ঘোষণা করতে পারেন। তাতে দুটো লাভ- তারা ক্ষমতায় থাকার আইনগত ভিত্তি খুঁজে পাবেন এবং নির্বাচনের ঝামেলামুক্ত হবেন। বাকশাল করে তারা অতীতে তাই করেছিলেন। এখন যে গণতন্ত্র তারা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন, এর চেয়ে বরং বাকশালই ভালো। দেশের স্বীকৃত বারবার নির্বাচিত প্রধান রাজনৈতিক দলকে যখন মানববন্ধন করতেও দেয়া হয় না অথবা ২৭টি শর্তের বেড়াজালে জনসভার অনুমতি নিতে হয়, তার চেয়ে ‘এক নেতা এক দেশ’ ভালো নয় কি? নিকট অতীতে নেপথ্যের নায়কেরা মাইনাস টু ফর্মুলা দিয়েছিলেন। দেশ থেকে রাজনীতি বিসর্জন দেয়ার চক্রান্ত হয়েছিল। তখন তারা নেপথ্যের নায়কদের ‘গণতন্ত্রের কারিগর’ বলে অবহিত করেছিলেন। একজন নেত্রী দেশ ত্যাগ করেছিলেন। অপরজন বলেছিলেন- ‘বাংলাদেশ ছাড়া আমার আর কোনো ঠিকানা নেই।’ তাকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা যায়নি। এর ফলে তিনি বিদেশ থেকে ফেরত আসতে পেরেছিলেন। প্যাকেজ ডিলের নির্বাচনে তাকে জয়ী করা হয়েছিল। তার প্রতিপক্ষ দূরদৃষ্টি দিয়ে রাজনীতিকে দেখতে চেয়েছিল। তারা বলেছিল- অনির্বাচিত সামরিক শাসনের পরিবর্তে গরিষ্ঠ স্বৈরাচার (ম্যাজরিটি ডিক্টেটরশিপ) শ্রেয়। এখন অভিজ্ঞতা বলছে- ব্যক্তিতন্ত্রের চেয়ে সামরিক স্বৈরাচার শ্রেয়। ২০১৪ সালের প্রাককালে পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিজয়ের পর তারা যখন বুঝল জনতার শক্তিতে পতন তাদের অবধারিত, তখন তারা তাদেরই প্রবর্তিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করল। এতেও তারা আশ^স্ত না হলে ‘ছলে বলে কলে’ প্রতিপক্ষকে নির্বাচনের বাইরেই রাখা হলো। এক দশক পার হওয়ার পর যখন তারা দেখছে ‘দিনে দিনে বাড়িয়েছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ’ তখন তারা মাইনাস ওয়ান ফর্মুলায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করার পাঁয়তারা কষছে।

শাসক দলের দ্বিতীয় প্রধান নেতা বললেন- ‘তারা ফাঁকা মাঠে গোল দিতে চান না।’ গরুর দুধ যদি ভেজাল হয় তখন গোয়ালা বলে- খাঁটি গরুর দুধ। অর্থাৎ এতে ভেজাল আছে। তেমনি এরা যে আসলে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে চায় এটা তারই স্বীকৃতি। ২০০৮ সালে তারা প্রতিপক্ষের হাত-পা ও মুখে লাগাম লাগিয়ে বলেছিল- ‘সাঁতার কাটো’। ২০১৪ সালে তারা হুইসেল দেয়ার আগেই জয়ী ঘোষিত হয়েছিল। এবারে তারা এমন সব কারসাজি, জালিয়াতি ও কায়দা-কানুন করতে যাচ্ছে যাতে প্রতিপক্ষের হাত-পা বেঁধে নয়, কেটে দিয়ে অযোগ্য ঘোষণা করা যায়। রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীকে ঋণখেলাপি বানানো হয়েছিল। অবশেষে তাকে মামলা করে প্রার্থিতা বহাল করতে হয়েছে। যেহেতু তারা সরকারে রয়েছে এবং যেহেতু তারা পুলিশ ও আমলাতন্ত্রের ওপর ভর করতে চাইছে সুতরাং জনগণের আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা তাদের প্রয়োজন নেই। পুলিশ প্রশাসনকে যেভাবে সুযোগ-সুবিধা ও পদোন্নতি দেয়া হয়েছে তা অভূতপূর্ব। আমলাতন্ত্রে ধাপে ধাপে পাইকারি পদোন্নতি হচ্ছে। প্রশাসনে ১৬০ জন কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব হচ্ছেন। একজন বড় আমলার ভাষায়- ‘এটি আসন্ন বিজয় দিবসে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বড় উপহার।’ পুলিশে ১০ হাজার অনুগত লোক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। ইতোমধ্যেই প্রতিপক্ষকে নির্মূল অভিযানের অংশ হিসেবে ১. ‘বন্দুকযুদ্ধ’ অব্যাহত রয়েছে। ২. গুমের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ইতোমধ্যে সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান গুম হয়েছেন। ৩. মামলার কোনো কমতি নেই। নতুন করে বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে প্রতিদিন মামলা করা হচ্ছে। ৪. সবচেয়ে বড় টার্গেট হচ্ছেন বিরোধী নেত্রী। যেহেতু তাকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, অজেয় ও আপসহীন বিবেচনা করা হয় এবং নির্বাচন জয়ের প্রধান আকর্ষণ মনে করা হয়- তাই তাকে ঘায়েল করার জন্য সব ধরনের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে।

প্রধান বিরোধী নেত্রীর বিরুদ্ধে প্রায় পঁচিশটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি দুদকের দায়ের করা । নেপথ্যে নায়কদের সময়ে একই ধরনের মামলা করা হয়েছিল সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে। সেই মামলাগুলো মামুলি আনুষ্ঠানিকতা, অবশেষে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বর্তমান সরকার প্রধান বিরোধী নেত্রীর বিরুদ্ধে ২০টি মামলা দিয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের দায়ের করা এসব মামলার মধ্যে রয়েছে হত্যা, নাশকতা ও পুলিশের কাজে বাধা দেয়াসহ নানা ধরনের অভিযোগ। বর্তমান সময়ে দুদকের করা মামলাগুলো হলো- জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা, গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, বড়পুকুরিয়া দুর্নীতি মামলা এবং নাইকো দুর্নীতি মামলা। তার বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নাশকতার অভিযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা রয়েছে। রাজধানীর গুলশান ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানায় দু’টি, খুলনা সদর থানায় একটি এবং রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় তিনটি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানির অভিযোগে চারটি পিটিশন মামলা রয়েছে। সরকার এসব মামলার মাধ্যমে তাকে রাজনৈতিকভাবে অকার্যকর করতে চাইছে। সব মামলায় যাতে তিনি শাস্তি পান সে ব্যাপারে সরকারের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি রয়েছে। যদি তিনি কোনো মামলায় দোষী বিবেচিত হন তাহলে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হতে পারেন। তাকে জেলে পাঠিয়ে নির্বিঘ্নে নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য সরকার ষড়যন্ত্র আঁটছে। ২০১৪ সালের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে প্রধান নেত্রীসহ সবাইকে জেলে পুরে তামাশা দেখতে চাচ্ছে ক্ষমতাসীন সরকার। গত নভেম্বরের ৩০ তারিখ বিচারক তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। হরতাল থাকায় তিনি আদালতে হাজির হতে না পারায় এ পরোয়ানা জারি করা হয়। এ ধরনের ঠুনকো কারণ দেখিয়ে সরকার তার গতি স্তব্ধ করতে চাচ্ছে। জনগণের প্রবল প্রতিক্রিয়ার মুখে তার জামিন পুনর্বহাল হলেও সরকার ওঁৎ পেতে আছে প্রতিমুহূর্তে তাকে আটক করার জন্য। এ ছাড়া নেহাত মানহানির মামলায় একজন কনিষ্ঠ বিচারকও তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করছেন। সব কিছুর লক্ষ্য হলো খালি মাঠে গোল দেয়া।

রাজনীতি কেবল রাজনীতির দ্বারাই মোকাবেলা করা উচিত। একটি স্বচ্ছ ও সুন্দর নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জ্ঞাপন করতে পারলে জনমতের যথার্থ প্রতিফলন সম্ভব। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য। ইতঃপূর্বে নির্বাচনব্যবস্থাকে যেভাবে অগ্রহণযোগ্য, অকার্যকর ও অনিয়মতান্ত্রিক করা হয়েছে- জনগণ আশা করে তার পুনরাবৃত্তি হবে না। যত আগে সরকার এটি অনুধাবন করবে ততই তাদের মঙ্গল।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Comments

comments