বুকের তাজা রক্ত ঢেলে জেরুজালেম রক্ষায় মার্কিন-ইসরাইল সিদ্ধান্ত রুখতে প্রস্তুত

মিছিলে মিছিলে উত্তাল সারাদেশ

ঢাকা: মুসলমানদের পবিত্রভূমি জেরুজালেমে ইসরাইলের রাজধানী ও মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্য আন্দোলনসহ বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন সারাদেশে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে।

রাজধানী ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও রংপুরসহ সারাদেশে এ বিক্ষোভ হয়েছে। মার্কিন ও ইসরাইল বিরোধী এসব বিক্ষোভ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ডাকে শুক্র জুমা বাদ সারা দেশে জেরুসালেম ইস্যুতে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়েছে। মিছিলে ইসলামি দলগুলোর নেতাকর্মীসহ সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ শরীক হয়েছেন।

শুক্রবার বাদ জুমা হেফাজত ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে বায়তুল মোকাররমের উত্তরগেটে সমাবেশ শুরু হয়। এতে ঢাকার কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।

নামাজের পরপরই বায়তুল মোকাররমের আশপাশে বিপুল পরিমাণ মানুষকে জড়ো হতো দেখা যায়। তাদের কণ্ঠে ছিল ‘ট্রাম্পের ঘোষণা মানি না মানবনা’, জেরুজালেম ফিলিস্তিনের, ইসরাইল নিপাত যাক’ ইত্যাদি স্লোগান।

বায়তুল মোকাররমে অবস্থান করছেন আওয়ার ইসলামের প্রতিনিধি মুহাম্মদ তারিক জামিল। টেলিফোনে তিনি জানান, ১৩ ডিসেম্বর আমেরিকান দূতাবাস ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দিয়েছে হেফাজত ঢাকা মহানগর। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জুমার নামাজের পর পরই ব্যানার নিয়ে নেতা কর্মীরা দাঁড়িয়ে যান। সেখানে একের পর এক বক্তব্য রাখেন হেফাজতের নেতৃবৃন্দ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেম শহরকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণার প্রতিবাদে বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস ঘেরাও করবে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ১৩ ডিসেম্বর বেলা ১১টায় দূতাবাস ঘেরাও ও আগামী রবিবার ফের বিক্ষোভ মিছিল করার ঘোষণা দিয়েছে হেফাজত।

বিক্ষোভকারীরা ফিলিস্তিনের ‘কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’, ‘দুনিয়ার মুসলিম এক হও, লড়াই করো’, ‘বিশ্ব মুসলিম ঐক্য গড়, ফিলিস্তিনি স্বাধীন করো’ প্রভৃতি স্লোগান দেন।

ট্রাম্পের এ ঘোষণার প্রতিবাদে একই সময়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ঢাকা মহানগরী শাখা।
জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর ফটক থেকে এই বিক্ষোভ মিছিলগুলো বের হয়ে পুরানা পল্টন ও দৈনিক বাংলা মোড় হয়ে উত্তর ফটকে এসে শেষ হয়। এ সময় পুরানা পল্টন থেকে দৈনিক বাংলা মোড়ে প্রায় ৪০ মিনিট যান চলাচল বন্ধ ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য এই দুই মোড়ে মোতায়েন ছিল।

ইসলামী ঐক্য আন্দোলন
মুসলমানদের প্রথম কেবলা বায়তুল মুকাদ্দস তথা জেরুজালেমে মার্কিন দুতাবাস স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ইসলামী ঐক্য আন্দোলন ঢাকা মহানগরীর উদ্যেগে শুক্রবার বাদ জুমা বায়তুল মুকাররমের উত্তর গেইট থেকে পল্টন এলাকায় প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। মিছিলে দখলদারী ইসরাঈল ও তার মুরব্বী আমেরিকার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়; মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম জেরুজালেমকে ইসরাঈলের রাজধানী করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে হলেও বিশ্বের দুই’শ কোটি মুসলমান তা মেনে নেবে না।

আন্দোলনের ঢাকা মহানগরীর আমীর মোস্তফা বশীরুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন সংগঠনের আমির ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী আরো বক্তব্য রাখেন সংগঠনের জয়েন্ট সেক্রেটারী অধ্যাপক মোস্তফা তারেকুল হাসান, কেন্দ্রীয় অফিস সম্পাদক মওলানা আবু বকর সিদ্দিক, বাংলাদেশ জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান ও ছাত্রনেতা ওমর ফারুক।

বক্তাগণ বলেন, বিশ্ব মুসলিমের সেন্টিমেন্ট জাতিসংঘসহ বিশ্বের সকল দেশের নীতির বিপরীতে ট্রাম এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রমান করেছে, আমেরিকা ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রু। মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ আমেরিকার বন্ধুত্ব করেছে। তাদের সজাগ হওয়ার এখনই সময়। কারণ হায়েনার সাথে বন্ধুত্ব করার পরিনাম হবে ভয়াবহ। মুসলিম দেশ সমুহকে আমেরিকার এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে সম্ভব সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের মুসলমানগণ আমেরিকার পদলেহী সরকারগুলোকে ক্ষমা করবে না।

বিক্ষোভে ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাল মাদানি বলেন, ‘জেরুজালেমকে যারা ইসরায়েলের রাজধানী করতে চায়, এটা আমরা করতে দেব না। মুসলমানদের এক বিন্দু রক্ত থাকতে জেরুজালেম ইহুদিদের রাজধানী করতে দেব না।’

হাটহাজারীতে বিক্ষোভ
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের হাটহাজারী শাখার উদ্যোগে বাদ জুমা বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। সেখানে হাজারও ধর্মপ্রাণ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তারা ট্রামের হটকারী সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিস ঢাকা মহানগরের উদ্যোগে একই স্থানে মিছিল করতে দেখা গেছে।

ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে: চট্টগ্রাম জামায়াত
জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রামমহানগরীর উদ্যোগে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেছেন, গোটা বিশ্বব্যাপী মুসলমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। মায়ানমার, সিরিয়া,মিশর,ইয়ামেন,কাশ্মীর ও ফিলিস্তিনে মুসলমানদের উপর চরম অত্যাচার নির্যাতন ও জুলুম চলছে। ফিলিস্তিনি মুসনলমানদের মাতৃভূমি দখল করে ইহুদীবাদী ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। এখন মুসলমানদের পবিত্র ভূমি আল্ আকসা মসজিদের নগরী জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী করার চেষ্টা করছে আমেরিকা। যেখানে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী জেরুজালেম। সেখানে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই জঘন্য অন্যায় চেষ্টার প্রতিবাদে বিশ্ব মুসলিম তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। নেতৃবৃন্দ ইসলাম ও মুসলমানদের নিশ্চিহ্নকরার এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর প্রতি উদাত্ত আহবান জানান।

নগরীর আগ্রাবাদে জামায়াত নেতা এম.এফ আজমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, জামায়াত নেতাএম.এ. গফুর ও মোস্তাকআহমদ প্রমুখ। সমাবেশ শেষে এক বিক্ষোভ মিছিল বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

ছাত্রশিবির: আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুসলমানদের অতি পবিত্র স্থান জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।

এক যৌথ প্রতিবাদ বার্তায় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত ও সেক্রেটারি জেনারেল মোবারক হোসাইন বলেন, মুসলমানদের অতি পবিত্র স্থান জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্তে গোটা মুসলিম উম্মাহ সাথে আমরাও বিক্ষুব্ধ, মর্মাহত ও বিস্মিত। জেরুজালেম শুধু কোন স্থানের নাম নয় বরং সারা বিশ্বের মুসলমানদের প্রথম কেবলা ও প্রাণের স্পন্দন পবিত্র মাসজিদুল আকসা সেখানে অবস্থিত। ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ভাবে এই পবিত্র স্থান মুসলমানদের বলে স্বীকৃত। অন্যদিকে ইসরাইল একটি অবৈধ ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্র তা বিশ্ব স্বীকৃত। যেই ইসরাইলি রাষ্ট্রের বৈধতাই নেই সেখানে সেই দেশের রাজধানী এমন একটি স্থানকে ঘোষণা করা চরম দায়িত্বহীনতা, অবিবেচক ও উস্কানিমূলক কাজ। তার এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববাসী মেনে নেয়নি। ইতিমধ্যে জাতিসংঘ, ওআইসি, ইউরোপিয় ইউনিয়ন, আরবলীগ, ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানিসহ সকল দেশ ও সংস্থা প্রত্যাখ্যান করেছে। ইতিমধ্যে গোটা মুসলিম বিশ্বে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে ও লাখ লাখ মুসলমান বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, বহু আগে থেকেই আরব বিশ্বকে অস্থিতিশীল করার অশুভ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছে মার্কিন সরকার ও ইসরাইল। তারা ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংস করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। যা এ ঘোষণার মাধ্যমে আবারো প্রমাণ হয়েছে। তাদের এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মুসলিম উম্মাহর পবিত্র দায়িত্ব। আমরা অবিলম্বে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তার এই ষড়যন্ত্রমূলক স্বীকৃতি বাতিল করার জন্য আহবান জানাচ্ছি। একই সাথে এই উস্কানিমূলক সিদ্ধান্ত বাতিলে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, দেশ ও বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বকে সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণের আহবান জানাচ্ছি।

জেরুজালেমে ইসরাইলহানা সহ্য করবে না বিশ্ব: আল্লামা মাসঊদ
জেরুজালেমে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণার নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান ও ঐতিহাসিক শোলাকিয়ার গ্র্যান্ড ইমাম ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেন, জেরুজালেমে ইসরাইলি হানা সহ্য করবে না বিশ্ব। ইসরাইল সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ফিলিস্তিনীদের উপর চেপে বসেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প জেরুজালেমে ইহুদীতা-বের পক্ষে যে সমর্থন ব্যক্ত করেছেন তা বুমেরাং হবে। বিশ্বজনমতের বিরুদ্ধে কোনো কিছুই টিকে থাকে না উল্লেখ করে আল্লামা মাসঊদ বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকেনি। আরও কত রাজরাজারা হারিয়ে গেছে। জেরুজালেমে ইসরাইলের হঠকারী সিদ্ধান্ত তাদের জন্যই বিপদ ডেকে আনবে।

ট্রাম্পের ঘোষণার মাধ্যমেই জেরুজালেম ইসরাঈলের রাজধানীর বৈধতা পাবে না দাবি করে আল্লামা মাসঊদ বলেন, মুসলমানদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস জেরুজালেমে অবস্থিত। মুসলিম বিশ্বের এই পবিত্র স্থানকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া ইসরাইল। ইসরাইলের হাত থেকে জেরুজালেমকে রক্ষা করতে হবে। রক্ষা করতে হবে পবিত্র স্থান বায়তুল মোকাদ্দাস।

মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্যই জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী ঘোষণা করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আজ ৮ ডিসেম্বর ২০১৭ শুক্রবার দুপুরে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান আল্লামা মাসঊদ এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার প্রচার সম্পাদক মাওলানা মাসঊদুল কাদির স্বাক্ষরিত এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানা যায়।
আল্লামা মাসঊদ বিবৃতিতে বলেন, ইসরায়েল মার্কিন মদদে যেভাবে জেরুজালেম নগরীকে তার রাজধানী বানাচ্ছে, এতে ইহুদীবাদীদের চিরাচরিত ধৃষ্টতা, আর এই ধৃষ্টতায় মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

Comments

comments