গণতন্ত্র মুক্তি দিবসে রাজনীতিকদের অস্বস্তি

আলী রীয়াজ

জেনারেল এরশাদের সেনাশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের সাফল্যচিহ্নিত ৬ ডিসেম্বর এখন যে প্রায় বিস্মৃত এবং কেবল আনুষ্ঠানিকতার বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তা যতই বেদনাদায়ক হোক না কেন, তাতে বিস্মিত হওয়ার কারণ নেই। এই আনুষ্ঠানিকতাও যে এখন খুব ঘটা করে পালিত হয় এবং সব রাজনৈতিক দল যে তা আন্তরিকভাবে পালনের কথা ভাবে, তা-ও মনে হয় না। তদুপরি ২০০৮ সাল থেকে ক্ষমতাসীন জোটের অংশ হিসেবে জেনারেল এরশাদের দল জাতীয় পার্টির উপস্থিতি এবং ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে ব্যক্তি এরশাদের ভূমিকার কারণে এই দিবস পালন যে অনেকের জন্যই একধরনের অস্বস্তির জন্ম দেয়, তা সহজেই দৃষ্টিগ্রাহ্য।

১৯৯০ সালের পর প্রথম বছরগুলোতে এই দিনটিকে ‘গণতন্ত্র দিবস’ বলে পালনে যতটা উৎসাহ, আগ্রহ ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা লক্ষ করা গিয়েছিল, ২৬ বছর পরে তা যে অপসৃত সেটি কেবল সময়ের ব্যাপার নয়, বাংলাদেশের রাজনীতি কোন পথে অগ্রসর হয়েছে তারই লক্ষণ। দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তি পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া ২০০৮ সালের আগেই শুরু হয়েছিল, সেটি ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পরের মন্ত্রিসভা এবং ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে যে বিরোধী রাজনৈতিক জোটের উত্থান ঘটে, সেদিকে নজর দিলেই আমরা দেখতে পাই। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং তাদের মিত্র দলগুলো, যে এরশাদ এবং তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষেত্রে সুর বদল করেছে তাই স্বাভাবিক। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায় নিয়ে যাঁরা উচ্চকণ্ঠ, তাঁরা এ কথা বলতে খুব একটা আগ্রহী নন যে এরশাদের শাসনকেও ‘অবৈধ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের উত্থান-পতন, সাফল্য-ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে এগোলেও এর ভেতরে মর্মবস্তু হিসেবে সব সময়ই উপস্থিত ছিল সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা। যদিও আমি মোটা দাগে ‘সাধারণ মানুষের’ আকাঙ্ক্ষা বলেই বর্ণনা করেছি, তথাপি এ ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত, বিশেষত নাগরিক মধ্যবিত্ত সমাজের অগ্রণী ভূমিকার কথা উল্লেখ করা দরকার। এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারির পরপরই ছাত্রদের প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে এবং ১৯৯০ সালের শেষ পর্বের উত্থান ঘটে যখন ছাত্ররা তাদের দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সম্মিলিতভাবে আন্দোলনের কর্মসূচি প্রদান করে। এর বাইরে আন্দোলনের একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ। অন্য শক্তিগুলো সহায়কের ভূমিকা পালন করলেও নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছে মধ্যবিত্ত শ্রেণিই।

সামরিক বা বেসামরিক কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেই প্রধানত দুটি প্রবণতা উপস্থিত থাকে; একটির লক্ষ্য হচ্ছে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো যেমন মতপ্রকাশের ওপরে বাধানিষেধের অবসান, রাজনৈতিক দল গঠন ও সমাবেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অবাধ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের দলকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার অধিকার ফিরিয়ে আনা। অন্যটির লক্ষ্য হচ্ছে এই অধিকারগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন, যাতে করে ভবিষ্যতে আবারও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিপদের আশঙ্কা তৈরি না হয়।

গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রথম ধারার সাফল্যের মধ্য দিয়ে নির্বাচন এবং মৌলিক মানবাধিকারগুলো আপাতত প্রতিষ্ঠিত হলেও যে ধরনের ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাকে আমরা ‘আনুষ্ঠানিক’ (ফর্মাল) গণতন্ত্র বলে চিহ্নিত করতে পারি। সেখানে গণতন্ত্রের মর্মবস্তু অর্থাৎ আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সবার সমানাধিকার, শাসনের সর্বস্তরে নাগরিকের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা, জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকে অনুপস্থিত। এসব অধিকার ও কাঠামো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল ‘মর্মবস্তুর গণতন্ত্র’ (সাবস্টেন্টিভ ডেমোক্রেসি) প্রতিষ্ঠা সম্ভব। কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হলেও সেখানে কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো কেবল বহালই থাকে না, ক্রমাগতভাবে আরও শক্তি সঞ্চয় করে।

গত কয়েক দশকে সারা পৃথিবীতে যেসব দেশ বিভিন্ন ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করেছে, সেগুলোর মধ্যে অনেক দেশেই দেখা গেছে যে প্রাথমিকভাবে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আশা করা হয়েছিল যে এসব দেশ ধীরে ধীরে মর্মবস্তুর বিবেচনায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু দেখা গেছে যে তার বদলে এসব দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন এক ব্যবস্থা, যেগুলো বড়জোর ভঙ্গুর গণতন্ত্র বলে শনাক্ত করা যায়, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ‘সংকর শাসন’ বা হাইব্রিড রেজিম বলে বর্ণনা করেন। এগুলো দেখতে গণতন্ত্রের মতো হলেও সেখানে নিয়মিতভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান বা বিরোধীদের সীমিতভাবে কার্যক্রম চালাতে দিলেও এগুলো গণতন্ত্রায়ণের পথে অগ্রসর বলা যাবে না।

এ ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের কিছু লক্ষণ থাকলেও ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ ঘটে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে তোলা হয় না বা কার্যত ধ্বংস করে ফেলা হয়, নির্বাচনকে ব্যবহার করা হয় ক্ষমতা প্রলম্বিত করার জন্য, দল ও ব্যক্তির আধিপত্য সর্বব্যাপ্ত হয়ে পড়ে এবং জবাবদিহির ধারণাকে কার্যত অস্বীকার করা হয়। যেকোনো দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার সময় তৈরি করা ক্ষমতাকাঠামোর পরিবর্তন না ঘটলে কিছু সময়ের জন্য ‘ভঙ্গুর’ গণতন্ত্র বহাল থাকে, কিন্তু পর্যায়ক্রমিকভাবে তার ভেতরে আগের উপাদান ও বৈশিষ্ট্যগুলোই প্রধান হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সাফল্যের মধ্যে কেবল এরশাদের ক্ষমতার অবসান ঘটেছিল তা নয়, কর্তৃত্ববাদী শাসনের যেসব উপাদান ও প্রতিষ্ঠান ছিল, তা বদলে ফেলার সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তার বদলে বাংলাদেশ কার্যত একধরনের সংকর শাসনব্যবস্থায় প্রবেশ করে। ফলে বাংলাদেশে মর্মবস্তুর গণতন্ত্রের বদলে ভঙ্গুর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা একাদিক্রমে হাইব্রিড রেজিমে পরিণত হয়েছে এবং কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা প্রধান হয়ে উঠেছে। এতে করে ব্যক্তি হিসেবে এরশাদের ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রত্যাবর্তনই কেবল সম্ভব হয়েছে বা ৬ ডিসেম্বর এলে রাজনীতিবিদদের অস্বস্তিই সৃষ্টি হচ্ছে তা নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিকে বৃত্তচক্রের মতো আবারও আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথেই ফিরে যেতে হচ্ছে।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

Comments

comments