ইয়াবা ব্যবসা করে শত কোটি টাকার মালিক শেখ জামাল!

ইয়াবা ব্যবসা করে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন কুইন মেরী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ জামাল ওরফে সেগা জামাল (৩৭)। কলেজ ভবনের অষ্টম তলায় তার ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটকে তিনি ইয়াবার মজুদখানা হিসেবে ব্যবহার করতেন।

কক্সবাজারের দু’জন ইয়াবা ব্যবসায়ী লবণ, কাঠ ও শুঁটকির ট্রাকে করে চালান ঢাকায় পাঠাত। পরে এসব ইয়াবা চলে আসত সেগা জামালের বাসায়। ঢাকার বাইরের বড় বড় ‘ডিলার’ জামালের কাছ থেকে এসব ইয়াবা নিত। জামাল নিজে তার প্রাডো গাড়িতে করে চালান ডিলারের কাছে পৌঁছে দিতেন।

শনিবার রাতে রাজধানীর ভাটারা এলাকায় এমন একটি ইয়াবার চালান পৌঁছে দিতে গিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের কাছে হাতেনাতে গ্রেফতার হন সেগা জামাল। অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনায় এ চিত্র উঠে এসেছে।

জামালকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা জানান, সেগা জামাল একজন মুখোশধারী শিক্ষানুরাগী। ইয়াবার ব্যবসা আড়াল করতে তিনি ভাটারা এলাকায় কুইন মেরী কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছেন সেগা ফাউন্ডেশন। যুক্তরাজ্যে তিনি কুইন মেরী কলেজের একটি শাখা খোলার চেষ্টা করছেন। ঢাকাতে যুক্তরাজ্যের একটি কলেজের শাখা খুলে শিক্ষাবাণিজ্য করার চেষ্টা করছেন তিনি। প্রগতি সরণিতে ক-৯০ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলা কিনে নিয়ে তিনি কুইন মেরী কলেজ করেছেন। ওই ভবনের ৮ম তলায় রয়েছে তার বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা এবং বনশ্রীতে রয়েছে তার একাধিক ফ্ল্যাট। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে একটি মোটেল করার প্রক্রিয়াও শুরু করেছেন তিনি। জমি কেনা বাবদ ২২ লাখ টাকার বায়নাও করেছেন।

অধিদফতরের আরেক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক কিভাবে হয়েছেন- এ প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি জামাল। তিনি দাবি করেছেন, তার ঠিকাদারি ব্যবসা রয়েছে। ওই ব্যবসার মাধ্যমে এ সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে তিনি এ দাবি করলেও প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, সেগা জামাল মাদক ব্যবসা করেই শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের খিলগাঁও সার্কেলের পরিদর্শক সুমনুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, অনেক দিন ধরেই আমরা তথ্য পাচ্ছিলাম কুইন মেরী কলেজের চেয়ারম্যান জামাল ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। সোর্স নিয়োগ করে তার বিষয়ে আমরা তথ্য সংগ্রহ করছিলাম। শনিবার রাতে গোপন সংবাদে জানতে পারি, ভাটারা এলাকায় জামাল প্রাডো গাড়িতে করে ইয়াবার চালান হাতবদল করবেন। পরে সেখানে অবস্থান নেই। রাত ৯টার দিকে প্রাডো গাড়ি নিয়ে তিনি সেখানে গেলে তার গাড়ি তল্লাশি করে ১ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবা জব্দ করি। পরে প্রগতি সরণিতে তার বাসায় অভিযান চালিয়ে আরও পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করি। ইয়াবা সরবরাহে ব্যবহৃত তার প্রাডো গাড়িটি (ঢাকা মেট্রো গ-৬৫৫৮) জব্দ করা হয়েছে।

যেভাবে ধরা পড়লেন সেগা জামাল : অভিযানে অংশ নেয়া কর্মকর্তারা যুগান্তরকে জানান, সেগা জামাল খুবই ধূর্ত। অনেক দিন ধরে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল তাকে। হাতেনাতে গ্রেফতার করার মতো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। শনিবার রাতে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার পর তার গাড়ি চ্যালেঞ্জ করা হয়। তারপর ব্যারিকেড দিয়ে গাড়ির গতিরোধ করা হয়। এ সময় গাড়ির দরজা খুলে তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। কর্মকর্তারা তাকে ধরে ফেললে তিনি ছিনতাইকারী বলে চিৎকার করতে থাকেন। সেখানে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেলে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা পরিচয়পত্র দেখান। এ সময় সেগা জামালকে স্থানীয়রা গণধোলাই দেয়ার চেষ্টা করেন। পরে কর্মকর্তারা তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসেন। সেগা জামাল তখন তাদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি নানা ধরনের প্রলোভন দেখাতে শুরু করেন।

অভিযানে নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক সুমনুর রহমান বলেন, সেগা জামালকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি স্বীকার করেন তার প্রগতি সরণির ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে ইয়াবা মজুদ আছে। পরে রাতেই সেখানে অভিযান চালানো হয়। তার ফ্ল্যাটের আলমারিতে রাখা বালিশের কভার থেকে ৫ হাজার পিস ইয়াবা বের করে দেন।

যে কৌশলে দীর্ঘদিন ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে : ইয়াবা ব্যবসা করে সেগা জামাল শত কোটি টাকার মালিক হলেও তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তিনি অভিনব কৌশলে মাদক ব্যবসা করতেন। ঢাকায় বছরের পর বছর ইয়াবা ব্যবসা করলেও এখানকার কোনো মাদক ব্যবসায়ী তাকে চিনতেন না।

তিনি কক্সবাজারের আইয়ুব ও আজিজ নামে দু’জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর মাধ্যমে রাজধানীতে ইয়াবা নিয়ে আসতেন। তারা কক্সবাজার থেকে ইয়াবার চালান ঢাকায় এনে জামালের বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিত। লবণের ট্রাক, কাঠের ট্রাক এবং শুঁটকির ট্রাকে করে ঢাকায় আনা হতো ইয়াবা।

রাজশাহী, কুমিল্লা, সিলেট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ইয়াবা ব্যবসায়ীরা ঢাকায় এসে সেগা জামালের কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে নিয়ে যেত। বড় চালানের ক্ষেত্রে নিজেই চালান পৌঁছে দিতেন তিনি।

এ বিষয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক (ডিডি-ঢাকা অঞ্চল) মুকুল জ্যোতি চাকমা যুগান্তরকে বলেন, সেগা জামালকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুরো সিন্ডিকেট চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। চিহ্নিত হলে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।

Comments

comments