ব্যবসায়ীদের হাহাকারে অর্থনীতির আর্তনাদ

আমাদের অর্থনীতির সাম্প্রতিক অসুখ-বিসুখ এবং আর্তনাদ অনুধাবন করার জন্য আমি আপনাকে কয়েকটি অভিনব পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর অনুরোধ জানাব। প্রথমেই আপনি যেতে পারেন কোনো কাফন ও কফিন বিক্রির দোকানে। তারপর চলে যান আজিমপুর কবরস্থানে। এবার আপনি কতগুলো প্রশ্নের উত্তর মিলিয়ে নিন এবং একটি সমাধান বের করে সিদ্ধান্তের সমীকরণ দাঁড় করান। কাফন ও কফিনের দোকানে গিয়ে জিজ্ঞাসা করুন যে আগের তুলনায় তাদের বিক্রিবাট্টা বেড়েছে নাকি কমেছে। যদি কমে থাকে তবে কেন ওগুলোর দাম বৃদ্ধি পেল সেই প্রশ্নের জবাবটি নিয়ে আজিমপুরে চলে যান। গোরখোদক, ইমাম এবং সেখানকার কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসা করে সাম্প্রতিক সময়ে লাশ দাফনের সংখ্যা এবং গোরখোদক, ইমাম ও লাশের গোসলের কাজে নিযুক্ত লোকদের প্রাপ্ত বখশিশ কমে যাওয়ার কারণ জেনে অর্থনীতির অসুখ-বিসুখ ও আর্তনাদের সমবেদনা অনুভবের চেষ্টা করুন।

দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, আয় রোজগার এবং হাহাকার বোঝার জন্য আপনি ঢাকার নিউমার্কেটি কাঁচাবাজার, কয়েকটি রিকশা, টেম্পো ও সিএনজি অটোরিকশার গ্যারেজে গিয়ে মালিক, শ্রমিক ও ড্রাইভারদের সঙ্গে কথা বলুন। প্রথমত দেখবেন যে, মোটা চাল, পিয়াজ, তরিতরকারি ইত্যাদি বিক্রি মারাত্মকভাবে কমে গেছে। দরিদ্র জনগণ আগের মতো কেনা দূরের কথা— কেবল বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু না হলেই নয় তাও কিনতে পারছে না। ফলে ব্যবসায়ীরা মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকেন।
দরিদ্রদের বাদ দিয়ে ধনী বা মধ্যবিত্তদের ক্রয়ক্ষমতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারবেন যে, তারা তরিতরকারি, মাছ-মাংস ও মশলার ব্যবহার অনেক কমিয়ে দিয়েছেন। এখন আর কেউ কথায় কথায় রিকশায় চড়েন না। ফলে রিকশার ভাড়া কয়েক গুণ বাড়া সত্ত্বেও রিকশা মালিক ও শ্রমিকরা ভালো নেই। আগে যাত্রীর চাহিদার তুলনায় রিকশা ছিল কম। এখন পরিস্থিতি উল্টে গেছে। একজন যাত্রী ধরার জন্য কয়েকজন রিকশাচালক রীতিমতো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু করে দেন। প্রায় একই অবস্থা বিরাজ করছে সিএনজি অটোরিকশার ক্ষেত্রে।

গণপরিবহন তথা ঢাকা শহরের বাস-মিনিবাসগুলোর অবস্থা কেমন যাচ্ছে তা বোঝার জন্য আপনি একদিন বিকালবেলা জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে ধীরেসুস্থে হাঁটা শুরু করুন। তারপর মত্স্য ভবন পার হয়ে শাহবাগের দিকে এগোতে থাকুন। সবশেষে শাহবাগ থেকে ফার্মগেট হয়ে তেজগাঁও থানার সামনে গিয়ে থেমে যান। এবার একটু বিশ্রাম নিয়ে দুই গ্লাস শীতল জল পান করে পেট ও মাথা ঠাণ্ডা করে নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন এই বলে, ‘ওহে ভোলা মন! তুমি এই সুদীর্ঘ পথে কী দেখিলা। কী জানিলা এবং কী বুঝিলা!’ আপনার মন তখন উত্তর করবে যে, আপনার মতো শত শত লোক পয়সা বাঁচানোর জন্য বাসে চড়ার পরিবর্তে নজিরবিহীনভাবে দলে দলে অবিরামভাবে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলছেন। কিছু ফাজিল ও ফাঁকিবাজ লোক যারা কিনা আপনার চেয়েও চালাক তারা অভিনব ছলচাতুরী করে বাস কোম্পানির ভাড়া ফাঁকি দিচ্ছেন। এই শ্রেণির লোক প্রেস ক্লাব থেকে বাসে উঠছেন। কন্ডাক্টর ভাড়া চাইতেই উত্তর দিচ্ছেন যে, একটু পরে দেব, মিরপুর যাব তো অনেক দেরি আছে। এরপর বাসটি যখন শিশু পার্কের সামনে পৌঁছে ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়ল তখন ফাজিল লোকগুলো বাসের ড্রাইভার, কন্ডাক্টর ও সরকারকে গালাগাল করে চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে বাস থেকে নেমে গেলেন। পরবর্তীতে সামান্য হেঁটে শাহবাগ পৌঁছে ভিন্ন বাসে সওয়ার হয়ে হোটেল সোনারগাঁওয়ের মোড়ে গিয়ে একই কর্ম করলেন। আর এভাবেই টাউটারি করতে করতে বিনা ভাড়ায় গন্তব্যে পৌঁছলেন সঙ্গে বোনাস হিসেবে সরকারকে গালাগাল করার বাহাদুরির কথা বলে রাতের বেলায় স্ত্রীকে ম্যানেজ করে ফেললেন।

নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের অবস্থা বোঝার জন্য আপনি একবার ইডেন কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজ, শামসুন্নাহার হল, রোকেয়া হল, টিএসসিসহ নর্থসাউথ-ব্র্যাক বা আইইউবি ক্যাম্পাস ঘুরে আসতে পারেন। সেখানে তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বাস, কলকাকলী ইত্যাদি আগের মতো দেখতে পাবেন না। যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক তার সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যে বিষয়টি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেছেন, এখনকার যুবকদের হাতে টাকাপয়সা নেই। ফলে তারা প্রেমও করতে পারছে না। ছেলেমেয়েদের টিনএজে অর্থাৎ ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সে তারা যা দেখে তাতেই মুগ্ধ হয়ে যায়। মেয়েরা অকারণে হাসে এবং ছেলেরা প্রেম করার জন্য বন্য হয়ে ওঠে। তারা পরস্পরের সন্ধানে দিনরাত অস্থির হয়ে ইতিউতি করতে থাকে। বর্তমান অবস্থার চাপে টিনএজারদের সেই চিরপরিচিত অস্থিরতা, অবাক হওয়া হাসি-উচ্ছ্বাস ম্লান হয়ে গেছে। ক্ষেত্রবিশেষে তারা অদ্ভুত আচরণ শুরু করেছে। নিচের উদাহরণটি পড়লে আপনি হয়তো ভালোভাবে বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেন। নিউমার্কেটের উল্টো দিকের প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যামের মধ্যে তিন তরুণ একটি মোটরসাইকেলে বিষণ্ন মনে এলোমেলো আলোচনা করতে করতে কোথায় যেন যাচ্ছিল। তাদের সামনে একজন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ রিকশা চালাচ্ছিলেন। মোটরসাইকেলের তরুণ চালক বার বার বৃদ্ধের রিকশার পেছন থেকে গুঁতা মারছিল এবং কার যেন চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছিল। এভাবে বার বার আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে বৃদ্ধ শেষমেশ সাহস করে বলেই ফেললেন, এই মামা! কী হইছে? গুঁতাইতেছেন ক্যান? তরুণরা হৈহৈ করে বলে উঠল— ওরে মামা! তোমার পোঁদে ঠেকাইয়া মজা নিতাছি! বৃদ্ধ রাগত স্বরে খেঁকিয়ে উঠে বললেন, আমার চুল তো এমনিতে পাকে নাই। আসল জায়গায় ঠ্যাকাবার না পাইরা বুড়া মানুষের পেছনে ঘুরতাছো।

এবার উচ্চমধ্যবিত্ত ও বিত্তবানদের হালহকিকত সম্পর্কে কিছু বলি। তাদের সম্পর্কে বলার আগে চলুন রাজধানী ও বিভাগীয় শহরগুলোর অভিজাত ক্লাব, হোটেল এবং বারগুলো ঘুরে আসি। কয়েক বছর আগে এসব স্থানে প্রচণ্ড ভিড় ও রমরমা আড্ডার কারণে নিরিবিলিতে দুই দণ্ড সময় কাটানোর ফুরসত ছিল না। জমজমাট আড্ডা, নাচগান, খানাপিনার পাশাপাশি হাউজি খেলা চলত পুরোদমে। ব্যবসায়ীরা দুই হাতে যেমন টাকা উপার্জন করতেন তেমনি এসব স্থানে এসে দুই হাত উজাড় করে খরচ করতেন। সময়ের বিবর্তনে পরিস্থিতি উল্টে গেছে। ওসব স্থানে এখন অজানা এক অন্ধকার ও নীরবতা নেমে এসেছে। ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন জ্যোতিষী, পীর-ফকিরের পেছনে ঘুরে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশ্বস্ত হতে চাইছেন। অনেকে মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডায় নিয়মিত যাচ্ছেন। কেউ কেউ চল্লিশ দিনের চিল্লা দেওয়ার জন্য তাবলিগে চলে যাচ্ছেন।

উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে বিত্তবানদের শরীর-মন, চালচলনে ব্যাপক পরিবর্তন চলে এসেছে। বেশির ভাগ লোকের মেদ-ভুঁড়ি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে গেছে। মাথার তালু টাক হয়ে পড়েছে। কোমর-নিতম্ব শুকিয়ে গেছে। ফলে আগেকার প্যান্ট বাদ দিয়ে নতুন মাপের পোশাক পরিধান করতে হচ্ছে। চেহারার উজ্জ্বল তেলতেলে ভাব চলে গেছে। চেহারায় রুক্ষ-শুষ্ক ভাব। হাঁটাচলায় উদাসীন এবং কথাবার্তায় অদ্ভুত এক হতাশা ফুটে ওঠে। অর্থনৈতিক চাপের কারণে তাদের পারিবারিক জীবনেও অনেক পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। সেদিন এক ব্যবসায়ীর গল্প শুনেছিলাম। ভদ্রলোকের ব্যবসা যখন খুব রমরমা ছিল তখন তিনি অতিমাত্রায় রোমান্টিক হয়ে পড়েন এবং কোনোরকম চিন্তাভাবনা না করেই আরেকটি বিয়ে করে বসেন। তার প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে শুরু থেকেই বনিবনা হচ্ছিল না। স্ত্রীর বদমেজাজ ও নোংরা স্বভাব সত্ত্বেও ছেলেমেয়েদের কারণে তিনি প্রথম স্ত্রীকে তালাক না দিয়ে নতুন বউয়ের সঙ্গে সুখের লাগি সংসারধর্ম শুরু করেন। প্রথম কয়েক বছর বেশ আরামেই কাটল। কিন্তু তার ব্যবসায় মন্দা ও অর্থকষ্টের কারণে নতুন সংসারে অশান্তি নেমে এলো। দ্বিতীয় স্ত্রী একদিন কাউকে কিছু না বলে জনৈক সুদখোর কালো টাকার মালিকের হাত ধরে বিদেশ পাড়ি দিলেন। বেচারা ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে বড় বউয়ের কাছে ফিরে এলেন। এর পরের ঘটনা স্বয়ং ব্যবসায়ীর মুখেই শুনুন।

‘পুরনো সংসারে ফেরার পর বড় বউ আর কথা বলে না। আগের মতো ঝাঁজ দেখায় না। এমনকি আমার খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারেও খোঁজ নেয় না। এদিকে আমার সংসারের করুণ দশা অন্যদিকে ব্যবসায় লাল বাতির কারণে রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটাতে কাটাতে আমি একসময় রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লাম। মারাত্মকভাবে শুকিয়ে গেলাম। আমার স্ত্রী সাধারণ আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন। আমার এই করুণ দশা দেখে সে আর নীরব থাকতে পারল না। একদিন হঠাৎ বলে উঠল, “ওকি জেসিকার বাপ! তোমার কী অইছে। তোমার গুয়াডা হুগাইয়্যা দি মুয়া অইয়্যা গ্যাছে। ” তার কথা শুনে শতকষ্টের মধ্যেও আমি একটু হাসার চেষ্টা করলাম। আমার সেই কষ্টের হাসি দেখে সে পুনরায় বলল, “ও মোর খোদা! এ কী অইলো! আগে লোকটা ভ্যাটকাইলে (হাসলে) কী সুন্দর লাগত। আর অহন ভ্যাটকাইলে চোখ দুইডা খল্লা মাছের মতো বাইর অইয়া আহে; দ্যাখলে ভয় লাগে। এই জন্যই মনে অয় খাচ্ছোইরা মাতারী তোমারে ছাইড়া চইল্যা গ্যাছে”। ’

দেশের শীর্ষ ধনীদের ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা বোঝার জন্য আপনি দেশের ব্যাংক, বীমা ও ট্যাক্স আদায়কারী সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় ঢুঁ মারতে পারেন। আপনি দেখবেন, পুরো ব্যাংকিংব্যবস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছেন অব্যবসায়ী অথবা লুটেরা ধনিক শ্রেণির লোকেরা। তারা কোনো সৎ ও সংগতিপূর্ণ ব্যবসায়ীকে ঋণ না দিয়ে নিজেরা লুটপাট করছেন এবং অন্যান্য ধান্ধাবাজ ও অব্যবসায়ীদের মোটা অঙ্কের ঋণ দিচ্ছেন। পুরো ঋণদান প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ হওয়ার কারণে বেশির ভাগ ঋণ মাঠে মারা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে যার মধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। ফলে ওইসব ঋণ আর কোনো দিন আদায় করা সম্ভব হবে না। দেশের পুরো আর্থিক খাত দুর্বৃত্ত চক্রের কবলে পড়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবমতে, গত কয়েক বছরে অন্তত ৫ লাখ কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে; যার সঙ্গে দেশের কোনো শীর্ষ ব্যবসায়ী গ্রুপের সংযোগের অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

আমাদের ব্যাংক ও বীমা ব্যবসার অনিয়ম রীতিমতো হিমালয়ের উচ্চতা অতিক্রম করেছে অথবা ওগুলোর সমস্যার গভীরতা প্রশান্ত মহাসাগরের অতলান্তকে ভেদ করে ফেলেছে। নামসর্বস্ব কোম্পানিকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়ে জনগণের আমানত খেয়ানতকারী দুর্বৃত্তরা বুক ফুলিয়ে সমাজ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অসৎ লোকেরা সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যেখানে কোনো কাগজপত্র বা বৈধ বন্ধকী সম্পত্তি ছাড়াই ব্যাংকগুলোয় সাগর ডাকাতি করে যাচ্ছে নির্বিবাদে সেখানে দেশের নামকরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা শিল্পগ্রুপ ঋণ চাইতে গেলে সকাল বিকাল হাই কোর্ট দেখিয়ে তাদের রীতিমতো অপদস্থ ও নাজেহাল করে পত্রপাঠ বিদায় করা হচ্ছে। ১০-১২ বছর আগে প্রায়ই দেখা যেত, ১০-১২টি ব্যাংক মিলে সিন্ডিকেট করে বড় বড় শিল্পগ্রুপকে শত শত কোটি টাকা ঋণ দিত। জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রথম পাতাজুড়ে বিশাল বিজ্ঞাপন কিংবা লিড নিউজ হিসেবে ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট ও ব্যবসায়ী গ্রুপের ঋণচুক্তির স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের ছবি ছাপা হতো।

সাম্প্রতিককালে আপনি যদি পত্রপত্রিকার পাতায় চোখ বুলান, তবে অতীতের সেই গৌরবময় ছবি দেখতে না পেলেও নবরূপে অদ্ভুত ইঙ্গিতবহ কিছু ছবি প্রায়ই দেখতে পাবেন।

আমরা আজকের আলোচনার একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। দেশের আর্থিক খাত ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা যথা মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, পোর্ট, কাস্টমস ও আয়কর বিভাগের হালহকিকত দেখেও আপনি অর্থনীতির সার্বিক চিত্র অনুধাবন করতে পারবেন। ওইসব সংস্থার কর্মকর্তারা যদি আয়েশি জীবনের জৌলুসভোগী হয় তবে ধরে নেবেন ব্যবসায়ীরা নির্যাতিত হচ্ছেন। ওইসব কর্মকর্তা যদি দাম্ভিক, বেপরোয়া এবং অবৈধ অর্থের মালিক হয়ে পড়েন তবে ধরে নিতে হবে যে ব্যবসায়ীদের জুলুম-অত্যাচার ও শোষণের জালে আবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। ওইসব কর্মকর্তার অফিস, বাসস্থান, পোশাক-পরিচ্ছদ, গাড়ি এবং গায়ের চামড়া যত উজ্জ্বল, চকচকে ও বর্ণিল হয়ে নব নব রূপ লাভ করবে ব্যবসায়ীরা ততই বিবর্ণ, বিপর্যস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত ও দেউলিয়া হতে থাকবেন।

রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায়ে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ন্যায়পরায়ণ রাজা-বাদশাহরা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন তার একটি উদাহরণ দিয়ে আজকের নিবন্ধ শেষ করব। আসলে রাজস্ব কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কৃষক ও গৃহস্থদের বাস্তব অবস্থা যাচাই-বাছাই করে খাজনা আদায় করতেন। কারও বিরুদ্ধে প্রজারা কাজী বা রাজার দরবারে অভিযোগ করলে অভিযুক্তকে বিচারের আওতায় আনা হতো। কেউ ঘুষ বা দুর্নীতির আশ্রয় নিলে সঙ্গে সঙ্গে চাবুক মেরে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হতো। কোনো কর্মকর্তার শরীরে মেদ জমলে কিংবা তার বাড়ি, ঘোড়া বা পোশাকে জৌলুস লক্ষ্য করা গেলে বেত মেরে তাকে চাকরিচ্যুত করা হতো এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাজকোষে জমা করা হতো। বাদশাহ বা সুলতান স্বয়ং রাজস্ব বিভাগ তদারক করতেন এবং সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোককে অর্থমন্ত্রী বানাতেন। হজরত উমরের আমলে মিসরে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। তিনি গর্ভনরকে মদিনায় ডেকে পাঠালেন। রাতে খাবারের সময় উমর জয়তুন তেল দিয়ে শুকনো রুটি নিয়ে নিজে খেলেন ও গভর্নরকে খেতে দিলেন। গভর্নর হাত গুটিয়ে বসে রইলেন। হজরত উমর বললেন, কী হচ্ছে খাচ্ছো না কেন! গভর্নর বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন! আমি তো এত নিম্নমানের খাবার খাই না। রাগত স্বরে খলিফা জানতে চাইলেন— তা তুমি কী খাও? তিনি উত্তর করলেন, আমি শাহি খাবার খাই। খলিফা তত্ক্ষণাৎ গভর্নরকে চাবুক মারতে আরম্ভ করলেন এবং তাকে পদচ্যুত করে বললেন, যে দেশের শাসক জনগণের দুরবস্থার কথা চিন্তা না করে শাহি খাবার খায় সে দেশে দুর্ভিক্ষ হবে না তো কী হবে।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও কলামিস্ট।

Comments

comments