হাথুরুসিংহের অপ্রত্যাশিত বিদায়

বরখাস্ত এবং বরখাস্ত হতে চলা—মূলত ফুটবলেই এই দুই শ্রেণির কোচ পাওয়া যায়। ক্রিকেটে কোচদের এমনতর প্রকারভেদ শোনা যায়নি। কিন্তু উপুল চন্ডিকা হাথুরুসিংহে দেখালেন ক্রিকেটে এমন কোচও হয়, যিনি একটি পূর্ণাঙ্গ সফরের মাঝপথেই আগাম পদত্যাগ করে বসেন এবং সফরটা কোনোক্রমে শেষ করে ছুটি কাটাতে যান। আর ছুটিতে থাকা অবস্থায় নিয়োগদাতা ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকেন।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সঙ্গে হাথুরুসিংহের চুক্তিটি ছিল ২০১৯ বিশ্বকাপ শেষ হওয়া পর্যন্ত। কিন্তু ২০১৭ সালের অক্টোবরেই যে তিনি চুক্তিটির শেষ টেনে দেবেন, এটি বিসিবির কাছে একেবারেই প্রত্যাশিত ছিল না। এ ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাত। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান এখনো হাথুরুসিংহের পদত্যাগের কারণ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অন্ধকারে ঢিল ছুড়ে বলেছেন, হতে পারে বাংলাদেশের ‘ছিদ্রান্বেষী’ সংবাদমাধ্যম তাঁকে তিতিবিরক্ত করে তুলেছিল অথবা দক্ষিণ আফ্রিকায় টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম যেভাবে সংবাদ সম্মেলনে ড্রেসিংরুমের ‘গোপন ব্যাপার’ হাট করে দিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টকে কাঠগড়ায় তুলেছেন, সেটি পছন্দ করেননি। এমন কথাও উড়ে বেড়াচ্ছে, হাথুরুসিংহে বুঝে গেছেন যে বাংলাদেশ দলকে সর্বোচ্চ যা দেওয়ার তা তিনি দিয়ে ফেলেছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে কোন দলই না হারে। গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের ৪০ দিনের ওই সফরে বাংলাদেশ সাতটি ম্যাচই হেরেছে। এটি অপ্রত্যাশিতও ছিল না। প্রশ্ন উঠতে পারে হারের ধরন নিয়ে। দলের মধ্যে এক ফোঁটা লড়াই ছিল না। পরাজয়ের মানসিকতায় কুঁকড়ে থাকা একটি দলকে যেভাবে জয়ের সুতীব্র আকাঙ্ক্ষায় উজ্জীবিত করেছিলেন হাথুরুসিংহে, এই দলটিকে দেখে তা মনে হয়নি। তবে ৪৯ বছর বয়সী এই শ্রীলঙ্কান কোচ মনে হয় না এমন পরাজয়ে ব্যথিত হয়ে পদত্যাগ করেছেন। তাঁর রিপোর্টটা পেলেই হয়তো প্রকৃত কারণটি ধরতে পারবে বিসিবি। না হলে ওটা চিররহস্যই হয়ে রইবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে। যাহোক, হাথুরুসিংহের পদত্যাগের ধরনে পেশাদার কোচের পেশাদারির পরিচয় মেলেনি। বিসিবির আশা, পেশাদারের ন্যূনতম পরিচয়টুকু তুলে ধরতে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের রিপোর্টটা হাথুরুসিংহে দেবেন।

বিসিবিকে এর আগেও প্রায় এভাবেই এক কোচ বিদায় জানিয়েছেন। সে অবশ্য টেস্ট-পূর্ব যুগে। কেনিয়ায় ১৯৯৪ আইসিসি ট্রফি ব্যর্থতার পর দলের সঙ্গে না ফিরেই পদত্যাগ করেছিলেন সে সময়ের ভারতীয় কোচ মহিন্দর অমরনাথ। পরে অবশ্য সফরের রিপোর্ট তিনি দিয়েছেন। রিপোর্টে বলেছিলেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গি নেই, তাঁরা ফিটনেস-সচেতন নন। তাঁদের মধ্যে উপদল গড়ে তোলার প্রবণতাও আছে। ভবিষ্যতের দল গড়ার জন্য এটি বিসিবির সহায়কও হয়েছে।

হাথুরুসিংহে আগে ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোচ, শ্রীলঙ্কা দলের ছায়া কোচ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ‘এ’ দলের, অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য দল এবং বিগ ব্যাশের দল সিডনি থান্ডারের দায়িত্বও সামলেছেন। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে তাঁকে কোচ নিয়োগ দেওয়াটা ছিল বিসিবির এক ‘মাস্টার স্ট্রোক’। ফল পাওয়া যায় নগদ নগদ। আগের সাড়ে ১৪ বছরে বাংলাদেশ দুটি করে মোট চারটি টেস্ট জিতেছিল জিম্বাবুয়ে ও দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। অসহায় আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হেরেছিল ৬৮ টেস্ট। আর হাথুরুর সোয়া তিন বছরে ৯ হারের পাশে জয় ৬ টেস্ট। এই সময় ওয়ানডেতে ঘরের মাঠে বাংলাদেশ জেতে টানা পাঁচটি ওয়ানডে সিরিজ। পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয়ও আছে এর মধ্যে। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো উঠেছে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে খেলেছে টুর্নামেন্টটির সেমিফাইনালে। আইসিসির ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন সাতে। সামান্য সময়ের জন্য হলেও ওঠা গিয়েছিল ছয়ে।

বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানের সঙ্গে হাথুরুসিংহের রসায়নটা জমেছিল ভালো। নাজমুল বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন এই কোচ চুক্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত যাবেন না। এবং যাওয়ার আগে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এমন উচ্চতায় তুলে দেবেন, যেখানে তাকাতে গেলে তাঁর মাথার হ্যাটটা খসে পড়বে। তাই ই-মেইলে পদত্যাগপত্র পেয়েও বিসিবি সভাপতি ভেবে নেন হাথুরুসিংহে অভিমান করেছেন, তিনি যথারীতি ঢাকায় ফিরবেন এবং মান ভাঙিয়ে আবারও তাঁকে কাজে বহাল করা যাবে। নাজমুল ভুল ভেবেছিলেন। ভুল ভেবেছিল গোটা বিসিবি। বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা হাথুরু ভেবেছিলেন অনেক আগেই। ভাবনাটা তাঁর মাথায় অন্তত জমতে শুরু করেছিল আরকি! সেটা মার্চ-এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ দলের শ্রীলঙ্কা সফরের সময়।

বাংলাদেশ যে বিকেলটিতে শ্রীলঙ্কায় শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দিয়ে জিতে নিল নিজেদের শততম টেস্ট, সেটি হাথুরুর কাছে ছিল অন্য রকম। একদিকে তাঁর বুকের মধ্যে বইছিল দুটি জয়ের আনন্দধারা—একটা উন্নয়নশীল দলকে প্রতিষ্ঠিত দলের বিপক্ষে টেস্ট জেতানোর। আরেকটি, আগের চাকরি থেকে প্রায় তাড়িয়ে দেওয়া চাকরিদাতা শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ডকে ‘দেখিয়ে দেওয়া’। যা আসলে ব্যক্তিগত প্রতিশোধবোধ। আবার একটা দুঃখও হাথুরুকে আক্রান্ত করছিল, তাঁদের শ্রমে ঘামে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মহিরুহ হয়ে ওঠা শ্রীলঙ্কাকে টেস্টে হারতে দেখলেন তাঁরই নবীন ছাত্রদের কাছে! যে ক্লাবটিতে দীর্ঘ সতেরো বছর খেলেছেন, সেই তামিল ইউনিয়ন ক্লাবের মাঠ পি সারায় ওঠা ‘হায় হাথুরু, হায় হাথুরু’ বিলাপটাও তাঁর কানে না পৌঁছে পারেনি। পি সারা ওভালে ওই ঐতিহাসিক টেস্টটা কভার করতে গিয়ে নিজের কানেই শুনেছি শ্রীলঙ্কান জনতার সেই স্লোগান—হাথুরুকে শ্রীলঙ্কার কোচ চাই, কোচ চাই!

ওই সফরে শ্রীলঙ্কার যেখানেই গেছি, শুনেছি একই কথা। ঘরের ছেলে হাথুরুসিংহেকে কোচ করে আনাই ডুবতে বসা শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটকে টেনে তোলার একমাত্র উপায়। শ্রীলঙ্কার সাংবাদিক মহল থেকেও জানা গিয়েছিল হাথুরুকে কোচ করে আনতে আগ্রহী শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটও (শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ড)। একদিন সুযোগমতো হাথুরুসিংহের কাছেই সরাসরি জানতে চাইল বাংলাদেশের সাংবাদিক ব্রিগেড, তিনি নিজে শ্রীলঙ্কার কোচ হতে চান কি না। তাঁর উত্তর ছিল পাল্টা প্রশ্নে, ‘আপনারা কি চান না আমি বাংলাদেশের কোচ থাকি? তাহলে এক কাজ করুন, বিসিবিকে বলুন আমাকে বরখাস্ত করতে। ২০১৯ বিশ্বকাপ পর্যন্ত বিসিবির সঙ্গে আমার চুক্তি, আমাকে বরখাস্ত না করলে তো শ্রীলঙ্কার কোচ হতে পারি না।’ এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হলো, চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে উঠতে পারল না তারা। পদত্যাগ করলেন তাদের দক্ষিণ আফ্রিকান কোচ গ্রাহাম ফোর্ড। অন্তর্বর্তীকালীন কোচের অধীন দেশের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজ হারল জিম্বাবুয়ের কাছে। এটাই শ্রীলঙ্কায় কোচ হয়ে ফেরার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করল হাথুরুসিংহের জন্য। শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের প্রস্তাব পেলেন এবং তাতে সম্মতিও দিলেন। সম্মানের সঙ্গে নিজের দেশের কোচ হওয়ার সুযোগ পেলে সেটি হেলায় হারানোর ভুল কে করবেন? ক্রিকেটের পৃথিবীতে প্রধান কোচ হিসেবে চতুর্থ সর্বোচ্চ বেতন পেতেন বিসিবি থেকে, শোনা গেল হাথুরুসিংহেকে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট সেটিও দিতে রাজি। তাহলে আর দেরি কেন? ‘শুভস্য শীঘ্রম’ বলে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের হয়ে শ্রীলঙ্কা সফরের ১০ মাস পরই শ্রীলঙ্কার কোচ হতে চলেছেন হাথুরুসিংহে। আগামী জানুয়ারিতেই হয়তো শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে দুই টেস্টের সিরিজ খেলতে আসছেন বাংলাদেশে। তবে এই কোচ নিয়ে বন্ধুপ্রতিম ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে সম্পর্কটা যাতে তিক্ত না হয়, সে জন্য বিসিবি সভাপতিকে চিঠি দিয়ে হাথুরুসিংহেকে কোচ নিয়োগের অনুমতি চেয়ে রেখেছেন শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের প্রধান থিলাঙ্গা সুমাথিপালা। দারুণ ক্রিকেট কূটনীতি!

যদিও নিজেকে আদ্যন্ত পেশাদার দাবি করা হাথুরুসিংহে যেভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন, সেটা কতটা পেশাদার ও নৈতিক আচরণ এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। যে কারণে বিসিবিকে আবার নামতে হচ্ছে বিদেশি কোচের খোঁজে। বাস্তবতা হলো টাকার বস্তা ঢেলেও তাঁর বিকল্প খুঁজে পাওয়াটা সহজ হবে না। দুনিয়াজুড়ে টি-টোয়েন্টি লিগের দৌরাত্ম্য, বিশেষ করে আইপিএল, কাজটিকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলেছে!

Comments

comments