বিদ্যুতের দাম বাড়লই

বেশ কিছুদিন ধরেই চলছিল বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া। শুরু থেকেই ব্যবসায়ী সমাজ ও ভোক্তা অধিকার সংগঠন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে দাম না বাড়ানোর। অন্যদিকে বিএনপি, বামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল হুমকি দিয়েছিল, দাম বাড়ানো হলে সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। এত সব বিরোধিতা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ৩৫ পয়সা বা ৫ দশমিক ০৩ শতাংশ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ২০০৯ সালের শুরুতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ৮ দফায় বৃদ্ধি পেল বিদ্যুতের দাম। দামবৃদ্ধি থেকে ছাড় পায়নি কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প খাত এবং তৃণমূলের লাইফলাইনে থাকা গ্রাহকও। আগামী মাস অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে বর্ধিত এ দাম কার্যকর হবে।

খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে বিদু্যুতের দাম বাড়ানো হলেও বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিদ্যুৎ ক্রয়ে অর্থাৎ পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়নি। তাই খুচরা পর্যায়ে দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আয় করবে।

এদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তীব্র সমালোচনা করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। দামবৃদ্ধির প্রতিবাদে বাম দলগুলো আগামী ৩০ নভেম্বর হরতাল ডেকেছে। এ ছাড়া ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের ভাষ্য, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে তারা দাম যে কমানো সম্ভব, তা যুক্তিসহ তুলে ধরেছিল। এখন উল্টো দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় গণশুনানি ‘অর্থহীন’ বলে প্রমাণিত হলো।

রাজধানীর কারওয়ানবাজারে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে বিইআরসির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিদ্যুতের নতুন দাম ঘোষণা করে কমিশন। পাইকারি না বাড়িয়ে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বৃদ্ধি কেনÑ জানতে চাইলে কমিশন চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম বলেন, বিতরণ খরচ বৃদ্ধির বিবেচনায় কমিশন এ দাম বাড়িয়েছে।

তিনি বলেন, ২০১৫ সালের তুলনায় এবার পাইকারিতে প্রতি ইউনিটে বিদ্যুতের দাম ৬ পয়সা করে কমানো হয়েছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ২৫ ভাগ এবং অন্য বিতরণ কোম্পানির শতকরা ১৩ ভাগ গ্রাহক ন্যূনতম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও যে অতিরিক্ত বিল দিতেন, তা থেকে মুক্তি পাবেন। সব মিলিয়ে দেশে এমন গ্রাহকসংখ্যা ৯০ লাখ, যাদের বিদ্যুতের দাম বাড়ার বদলে কমবে। এ ধরনের গ্রাহকশ্রেণি বিদ্যুৎ যতটুকুই ব্যবহার করুক, বিআরইবি এলাকায় হলে তাদের ন্যূনতম ৯০ টাকা এবং অন্য বিতরণ এলাকায় ন্যূনতম ১০০ টাকা বিল দিতে হতো। এখন ডিমান্ড চার্জ ২৫ টাকার সঙ্গে ব্যবহৃত বিদ্যুতের বিলই দিতে হবে।

কমিশন সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে এনার্জি কস্ট এবং বিতরণ ব্যয় বিবেচনা করা হয়। বিতরণ কোম্পানিগুলো গড়ে ৬ টাকা ৮৪ পয়সা পর্যন্ত গ্রাহকের আঙিনায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে খরচ করে। এর বিপরীতে বিতরণ কোম্পানিগুলো প্রতি ইউনিটে এখন ৬ টাকা ৫০ পয়সা রাজস্ব আদায় করছে। এতে তাদের প্রতি ইউনিটে ৩৫ পয়সা লোকসান হচ্ছে। কমিশন এবার এ ৩৫ পয়সাই বৃদ্ধি করেছে।

পাইকারি দর না বাড়লেও বিতরণ কোম্পানির জন্য বিদ্যুতের দাম পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এবার পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এবং নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য কমানো হয়েছে। এ সংক্রান্ত আদেশে কমিশন বলেছে, বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি) বিতরণের জন্য গত অর্থবছরে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ কিনত ৫ টাকা ১২ পয়সায়। এখন ৩৩ পয়সা বাড়িয়ে এ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ দশমিক ৪৫০ টাকা; আরইবির ৪ দশমিক ২৩ টাকার পরিবর্তে ১৭ পয়সা কমিয়ে ৪ দশমিক ০৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিপিডিসিকে ৫ দশমিক ৮৫ টাকার বিদ্যুৎ কিনতে হবে ইউনিটে ৮ পয়সা বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৯২৮ টাকায়। ডেসকোকে ৫ দশমিক ৮৫ টাকার বিদ্যুৎ ২২ পয়সা বাড়িয়ে ৬ দশমিক ০৬৬ টাকায় এবং নেসকোর দাম ৬২ পয়সা কমিয়ে ৫ দশমিক ১২ টাকা থেকে ৪ দশমিক ৪৯৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

লাইফলাইনে থাকা গ্রাহক ছাড়াও অন্যান্য শ্রেণিতে এবার ৫ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ২১ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে। বেড়েছে কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুতের দামও।

কৃষি : সেচে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৩ টাকা ৮২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪ টাকা করা হয়েছে।

ক্ষুদ্র শিল্প : ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুতের দাম অফপিক ৬ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ৩৮ পয়সা, পিক আওয়ারে ৯ টাকা ২৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৮৪ পয়সা আর ফ্ল্যাট দরের ক্ষেত্রে ৭ টাকা ৬৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ২০ পয়সা করা হয়েছে।

বাণিজ্যিক : আগের ফ্ল্যাট রেট ৯ টাকা ৮০ পয়সার স্থলে করা হয়েছে ১০ টাকা ৩০ পয়সা; অফপিক সময়ের ৮ টাকা ৪৫ পয়সার স্থলে ৯ টাকা ২৭ পয়সা এবং পিক আওয়ারের জন্য ১১ টাকা ৯৮ পয়সার স্থলে ১২ টাকা ৩৬ পয়সা।
এ ছাড়াও মধ্যচাপ শ্রেণির অর্থাৎ ৫০ কিলোওয়াট থেকে ৫ মেগাওয়াট, উচ্চচাপ ৫ থেকে ৩০ মেগাওয়াট এবং অতি উচ্চচাপ ২০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪০ মেগাওয়াট ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

পাইকারি বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোয় চলতি অর্থবছরে বিপিডিবির ঘাটতি দাঁড়াবে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। কমিশন আশা করছে, এই অর্থ সরকার বিপিডিবিকে ভর্তুকি হিসাবে দেবে। সব শ্রেণির গ্রাহকের ওপর আর্থিক চাপ কমাতে এবার পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি বলে কমিশন জানায়। এক প্রশ্নের জবাবে কমিশনের তরফে জানানো হয়, প্রথম ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত এলএনজি ব্যবহারে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচে খুব একটা হেরফের হবে না, যাতে পাইকারি দর পরিবর্তন করার দরকার হবে। সরকার জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমে আসত। সে ক্ষেত্রে বৃদ্ধির পরিবর্তে আরও দাম কমানো যেত কিনাÑ এমন প্রশ্নে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এখন যে অবস্থায় দর আছে, তা ধরেই হিসাব করা হয়েছে। ভবিষ্যতে সরকার দাম পুনর্নির্ধারণ করলে তা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত : এবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিইআরসি ডিমান্ড চার্জ, সার্ভিস চার্জকে মূল দরের সঙ্গে সমন্বয় করেছে। এর আগে বিতরণ কোম্পানিগুলো তাদের মতো করে অনেক ক্ষেত্রে এ অর্থ আদায় করত। এখন থেকে আর সে সুযোগ থাকছে না। প্রিপেইড মিটারের ক্ষেত্রে এখন থেকে আর কোনো নিরাপত্তা জামানত (সিকিউরিটি ডিপোজিট) নেওয়া যাবে না। আর যেসব গ্রাহক প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করবেন, তাদের আগের মিটারের সিকিউরিটি ডিপোজিট ফেরত দিতে হবে।

কমিশনের দাম বৃদ্ধির ঘোষণার সময় কমিশন সদস্য আব্দুল আজিজ খান, মাহমুদুল হক ভূইয়া, রহমান মুরশেদও উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, বর্তমান সরকারের গত ৯ বছরে বিদ্যুতের দাম ৮ বার বেড়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় গড়ে ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এর আগে বিগত মহাজোট সরকারের আমলে ছয়বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। মহাজোট সরকারের আমলে সর্বশেষ বাড়ানো হয়েছে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে, বিদ্যুতের খুচরা দাম ১৫ শতাংশ এবং পাইকারি দাম ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। এর আগে ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে শুধু আরইবি গ্রাহকদের বিদ্যুতের মূল্য ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ বাড়ানো হয়। এর পর ২০১০ সালের মার্চে আরইবি ছাড়া অন্যান্য সংস্থার গ্রাহকদের গড়ে ৬ দশমিক ৩২ টাকা শতাংশ দাম বাড়ানো হয়। তৃতীয় দফায় ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে শতকরা ৫ ভাগ খুচরা দাম বাড়ানো হয়। একই বছর ডিসেম্বরে চতুর্থ দফায় ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ, পঞ্চম দফায় ২০১২ সালের ফেব্রয়ারি মাসে ৭ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ এবং ষষ্ঠ দফায় ২০১২ সালের ১ মার্চ ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ খুচরা দাম বাড়ানো হয়।

এদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে আগামী ৩০ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সারা দেশে আধাবেলা হরতাল ডেকেছে বাম দলগুলো। বৃহস্পতিবার বিইআরসির ঘোষণার পর এ কর্মসূচি ঘোষণা করে সিপিবি, বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা। বুধবার এক সমাবেশ থেকে বাম দলগুলো হুমকি দিয়েছিল, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে হরতাল দেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার বিইআরসি দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর বাম দলগুলোর নেতারা জরুরি বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকের পর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ৩০ নভেম্বর সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল আহ্বানের কথা জানানো হয়।

সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম গণমাধ্যমকে বলেন, এটা একটি গণবিরোধী সিদ্ধান্ত। আমরা এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাই। ওই প্রতিবাদের অংশ হিসেবেই ৩০ নভেম্বর সারা দেশে আমরা হরতাল ডেকেছি। সেলিম বলেন, গণশুনানিতে আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম, এ মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম কমানো সম্ভব। কিন্তু সেটা না করে উল্টো দাম বাড়ানো হয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

Comments

comments