বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতি : ঋণ অনুমোদনে চাপ দিতেন বাচ্চু

বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সাবেক ১৩ সদস্যদের মধ্যে গত দু’দিনে তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

তদন্ত কর্মকর্তাদের জেরার মুখে তারা বলেছেন, ব্যাংক থেকে ঋণ দেয়ার নামে এতবড় অনিয়ম হয়েছে তারা তখন বুঝতে পারেননি। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনে বোর্ড সদস্যদের ওপর পরোক্ষভাবে চাপ দিতেন ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু।

তিনি বলতেন, ‘এটা অনুমোদন করতে হবে। উপরের চাপ আছে।’

একজন পর্ষদ সদস্যের দাবি, আবদুল হাই বাচ্চু তাদের মতামতকে প্রাধান্য দিতেন না। তাদের মতামত উপেক্ষা করে অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিছু কিছু সিদ্ধান্তে বিরোধিতা করলে বাচ্চু তাকে মৌখিকভাবে শাসিয়েছেন বলেও তিনি জানান।

তিনি বলেন, পর্ষদ সদস্যদের এমনভাবে নোটিশ করা হতো, যাতে তারা নির্ধারিত সময়ে বোর্ড সভায় উপস্থিত হতে না পারেন। চিঠিতে সভার যে সময় বলা হতো, সে সময়ে এসে দেখতেন মিটিং অর্ধেক শেষ।

ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী ফখরুল ইসলামের মাধ্যমে বোর্ডে ঋণ প্রস্তাব তোলা হতো জানিয়ে ওই সদস্য বলেন, তবে কিভাবে কার ঋণের প্রস্তাব বোর্ডে উপস্থাপন হতো তা তারা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারতেন না। বোর্ডে প্রস্তাব আসার সঙ্গে সঙ্গে সবাই রেজুলেশনে স্বাক্ষর করে সম্মানীর ৫ হাজার টাকা নিয়ে চলে যেতেন।

একজন সদস্য বলেছেন, বেসিক ব্যাংকের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে যে অনিয়ম হয়েছে তা বাংলাদেশ ব্যাংক শুরু থেকেই জানত। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার সঠিক তদারকির অভাবে এবং গাফিলতির কারণে দেশে ব্যাংকিং ইতিহাসে এতবড় ঘটনার বিস্তার ঘটেছে।

তদন্ত কর্মকর্তারা তাদের বলেছেন, “আপনারা যেভাবেই বলেন না কেন, নিজেদের দায় এড়াতে পারেন না। তারা পর্ষদ সদস্যদের এমন প্রশ্নও করেছেন, কে কত পরিমাণ ‘ভাগ’ পেয়ে জালিয়াতির ঋণে অনুমোদন দিয়েছেন।”

পর্ষদ সদস্যরা নিজেদের আড়ালে রেখে বক্তব্য দিলেও দুদক কর্মকর্তারা তা বিশ্বাস করছেন না। তারা বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির ফাইলপত্র ও মামলায় আনীত অভিযোগ সামনে রেখে পর্ষদ সদস্যদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

বৃহস্পতিবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বেসিক ব্যাংক পর্ষদের সাবেক সদস্য ও কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অধ্যাপক কাজী আক্তার হোসেনকে। এর আগে বুধবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে সাবেক পর্ষদ সদস্য ও বর্তমানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব শ্যাম সুন্দর শিকদার এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কামরুন্নাহারকে। এছাড়া আরেক সাবেক পর্ষদ সদস্য ও ব্যবসায়ী কাজী আনোয়ারুল ইসলামকে দুদকে তলব করা হয়েছিল। তিনি দুদকে হাজির হয়ে বক্তব্য দিতে সময় চেয়ে আবেদন করেছেন। তাকে পরে সুবিধাজনক সময়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে দুদক।

দুদক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আবদুল হাই বাচ্চুসহ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ১৩ সদস্যের মধ্যে তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের হাতে ব্যাংকের ঋণ দেয়ায় অনিয়মের বিষয়ে কয়েকটি লিখিত প্রশ্ন দেয়া হয়। তাদের প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে অনুরোধ করা হয়। বাকি ১০ সাবেক পর্ষদ সদস্যের মধ্যে সাবেক কাস্টমস কমিশনার শাখাওয়াত হোসেন ও বিসিকের সাবেক চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলামকে ২৭ নভেম্বর, চাঁদপুর চেম্বারের সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর আকন্দ সেলিম ও কামরুল অ্যান্ড ইসলাম আফতাব কোং-এর পার্টনার একেএম কামরুল ইসলামকে ২৮ নভেম্বর, এআরএস লুব বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম ও উত্তরণ ম্যাগাজিনের সহকারী সম্পাদক আনিস আহমেদকে ২৯ নভেম্বর, ব্যাংকের সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলাম ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব একেএম রেজাউর রহমানকে ৩০ নভেম্বর ও আবদুল হাই বাচ্চুকে ৪ ডিসেম্বর দুদকে হাজির হয়ে বক্তব্য দিতে নোটিশ করা হয়েছে।

এর বাইরে আরেকজন পর্ষদ সদস্য ও বর্তমানে বাণিজ্য সচিব সুভাশীষ বসুকেও নোটিশ করা হয়েছে। তার দেয়া সময়মতো মন্ত্রণালয়েই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় দুদক।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেসিক ব্যাংকের অর্থ লোপাটের ঘটনায় ৫৬টি মামলা করে দুদক। কিন্তু মামলায় পর্ষদ সদস্যদের কাউকেই আসামি করা হয়নি। মামলায় আবদুল হাই বাচ্চু ও পর্ষদ সদস্যদের আসামি করা নিয়ে উচ্চ আদালতে প্রশ্ন উঠার পর তাদের তদন্তের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।

চলমান তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। তদন্ত কর্মকর্তাদের বলেছি ভালোভাবে তদন্ত করতে। তদন্তে কোনো ফাঁকফোকর রাখতে চাই না আমরা। তদন্তের প্রয়োজনে স্বাধীনভাবে কর্মকর্তারা পর্ষদ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকেও তলব করা হয়েছে।

একজন তদন্ত তদারক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, তদন্তে প্রমাণ মিললে আসামির তালিকায় নতুন নামও যুক্ত হতে পারে। এ তালিকায় পর্ষদ সদস্যদের নাম এলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না বলেও জানান তিনি।

দুদকের ১০ জন কর্মকর্তা বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির মামলা তদন্ত করছেন। ৫৬টি মামলার তদন্ত তদারক করছেন দুদকের পরিচালক জায়েদ হোসেন খান ও সৈয়দ ইকবাল হোসেন। দুদকের এ ১২ সদস্যের টিম যৌথভাবে পর্ষদ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নিচ্ছে বলে জানা গেছে। পর্ষদ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের আগে তদন্ত কর্মকর্তাদের হাতে থাকে প্রশ্নমালা। গত দু’দিনে জিজ্ঞাসাবাদে তিন পর্ষদ সদস্যের কাছে কি ধরনের প্রশ্ন করা হয়েছে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, বেসিক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ঋণ প্রস্তাবের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে নেতিবাচক সুপারিশ ছিল। নেতিবাচক সুপারিশ থাকার পরও ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও পর্ষদ সদস্যরা তা উপেক্ষা করে ঋণ মঞ্জুর করেন। এ বিষয়ে পর্ষদ সদস্যদের প্রশ্ন করা হয়। তারা কেউ ঘটনা ঘুরিয়ে বলার চেষ্টা করলে পাল্টা প্রশ্ন করা হয় তাদের।

দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে তিন পর্ষদ সদস্যই একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে বলেন, বোর্ডে যখন ঋণ প্রস্তাবের ফাইল উঠত তখন তারা তাতে স্বাক্ষর করতেন। এর বেশি কিছু জানেন না। তাদের এমন সরল উত্তর মেনে না নিয়ে দুদক কর্মকর্তারা প্রশ্ন করেন, ‘জানার জন্যই সরকার আপনাদের বোর্ডের সদস্য করেছেন। কেন জানবেন না। আপনাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষার জন্য। কিন্তু আপনাদের সময় ব্যাংক থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে।

এমন প্রশ্নে তারা বলেন, আমরা ‘ওয়ার্কিং পেপার’ পড়তে পারিনি। একজন সদস্যকে প্রশ্ন করা হয়, পরের বোর্ড মিটিংয়ে রেজুলেশন কনফার্ম করার আগে কেন দেখলেন না। এ প্রশ্নে ওই সদস্য চুপ হয়ে যান। একজন সদস্য বলেন, পর্ষদে তার থাকাটাই ভুল হয়েছে। তখন তদন্ত কর্মকর্তারা বলেন, আপনার পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।

দুদক কর্মকর্তারা দুই সদস্যকে বলেন, ‘ওয়ার্কিং পেপার না পড়ে শত শত কোটি টাকা আপনাদের সহায়তায় বের হয়ে গেছে। এ দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে। এ প্রশ্নে ওই দুই সদস্য চুপ হয়ে যান। এ সময় এক কর্মকর্তা পর্ষদের দুই সদস্যকে বলেন, আপনাদের সম্মতিতেই এ টাকা বের হয়ে গেছে। অথচ সরকার আপনাদের নিয়োগ দিয়েছিল এ টাকা রক্ষার জন্য।

বোর্ডের সবাই বিভিন্নভাবে সুবিধাভোগী- এমন অভিযোগের বিষয়ে একজন সদস্য বলেন, ‘আপনারা এখন সেটা তো বলতেই পারেন। কিন্তু আমি কোনো সুবিধা পাইনি। আমি এখন বুঝতে পারছি, আমাদেরও দায় ছিল। কিন্তু আমরা দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারিনি। আমার জন্য ওই জায়গাটায় (পর্ষদ সদস্য হওয়া) যাওয়া সঠিক ছিল না।’

তিনি জানান, অল্প সময়ের মধ্যেই বোর্ড মিটিং শেষ হয়ে যেত। এতবড় অনিয়ম হয়েছে তখন বুঝতে পারিনি। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে বোর্ডের ওই সদস্য আরও বলেন, বেসিক ব্যাংকের ঋণ অনিয়মের ঘটনা কেন ২০১৫ সালে জানবে বাংলাদেশ ব্যাংক? ঘটনা তো আরও আগের। তখন কেন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। গাফিলতির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখাকেও দায়ী করেন তিনি।

দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা তিন পর্ষদ সদস্যের বক্তব্য পর্যালোচনা করছি। তারা কি কি তথ্য দিয়েছেন, আর কি দেননি তা মিলিয়ে দেখছি। তদন্তের প্রয়োজনে তাদের আবারও ডাকা হবে।

Comments

comments