জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতাদের কাণ্ড

চাকরি চাই। চাকরি। নইলে সমস্যা আছে। আমরা আন্দোলন সংগ্রারে সঙ্গী। আমাদের চকরি দিতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। নানান হুমকি ও ধমকিও দেয়া হচ্ছে। তাদের পরিচয় সকলেই জানেন। এরা তারাই যারা খোদ ছাত্রলীগেও বিতর্কিত। ছাত্রলীগও তাদের দায়িত্ব নিতে রাজি নন। এর পরেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জিম্মি। ভয়ে মুখ খুলতে রাজি হননা অনেকেই।

এই অভিযোগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) কিছু বিতর্কিত ছাত্রলীগ নেতা কর্মী কে ঘিরে। অফিসার পদে বিতর্কিত ছাত্রলীগ নেতাদের চাকরি দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চাপ দিচ্ছে শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

এ বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল রানা বলেন, স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে এই নিয়োগ দেয়ায় সচেতন শিক্ষার্থী হিসেবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটতে দিতে পারি না। তাই আমরা এ নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে নতুনভাবে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের দাবি জানিয়েছি। তবে ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়োগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চাপ দেয়া হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

গত বছরও চাপে পড়ে চার ছাত্রলীগ নেতাকে চাকরি দিয়ে বিতর্কিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ছাত্রলীগের মনোনীত ৬ প্রার্থীকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগের আশ্বাস না দেয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি চাকরির মৌখিক পরীক্ষা (সিলেকশন বোর্ডের সভা) বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রলীগের এমন কর্মকাণ্ডে চরম বিব্রত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

যদিও ছাত্রলীগের নেতারা দাবি করেছেন স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে ওই নিয়োগ দেয়া হচ্ছিলো। যার কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে নতুনভাবে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে যোগ্য ব্যক্তিদের নেয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি ছাত্রলীগের সাবেক ৬ নেতাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অফিসার পদে নিয়োগ দিতে চাপ দেন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা ও সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১ থেকে সর্বোচ্চ ২ জনকে নিয়োগ দেয়ার কথা জানান।

কিন্তু ছাত্রলীগের নেতারা ৬ জনকেই নিয়োগ দিতে চাপ দেন। পরে দেনদরবার না হওয়ায় অন্য একটি চাকরির সিলেকশন বোর্ডের সভা বন্ধ করে দেয় ছাত্রলীগের নেতারা। এদিকে যাদেরকে অফিসার পদে নিয়োগ দিতে চাপ দিচ্ছেন তারা হলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য ফরহাদ আহমেদ, জাবি ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি হাসিনুর রহমান শামীম, রাসেল মিয়া স্বাধীন, আল বেরুনী হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল কুমার বাগচি, ছাত্রলীগকর্মী দেহলবি রেজাউল ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মেহদী জামিলের স্ত্রী। এদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে শামীমের বিরুদ্ধে আল বেরুনী হলে (সম্প্রসারিত ভবন) পুনঃর্মিলনীর নাম করে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তুলে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও ওই হলের মূল ভবনের চারতলা থেকে প্রতিপক্ষ কর্মীদের ফেলে দেয়ার অভিযোগে তাকেও বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

সর্বশেষ শহীদ সালাম-বরকত হলের গেস্টরুমে অজিত চন্দ্র নন্দী নামের এক ছাত্রকে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে বেধড়ক পিটিয়ে জখম করে সে।
আরেক ছাত্রলীগ নেতা স্বাধীননের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ও আ ফ ম কামালউদ্দিন হলের ছাত্রলীগকর্মীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। সে ঘটনায় ছাত্রলীগের আট নেতাকর্মী আহত হয়।

এছাড়া ২০১০ সালে ৫ই জুলাই আল বেরুনী হলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িত থাকার দায়ে তাকে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

প্রশাসন সূূত্রে জানা যায়, ছাত্রলীগের অযৌক্তিক দাবি মেনে না নেয়ায় তারা পরিকল্পিতভাবে নিয়োগ কমিটির সিলেকশন বোর্ডের সভা বন্ধ করে দিয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছাত্রলীগের সভাপতি গ্রুপ থেকে ১ জন এবং সাধারণ সম্পাদকের গ্রুপ থেকে ১ জনকে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। কিন্তু ছাত্রলীগ নেতারা কমপক্ষে উভয় গ্রুপ থেকে দুইজন করে নিয়োগ দেওয়ার চাপ দেন। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে নানা অনিয়মের প্রতিবাদ জানানোর হুমকি দেন।

অন্যদিকে ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানায়, স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে ৩ জনকে অস্থায়ী ভিত্তিতে অফিসার পদে নিয়োগ দিয়েছে প্রশাসন। অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ প্রাপ্তরা হলেন, শহীদ রফিক-জব্বার হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক এএস এম আবু দায়েনের স্ত্রী আফরোজা বেগম রেশমা, জাবির সিন্ডিকেট সদস্য ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলাউদ্দিনের মেয়ে আলেয়া ফেরদৌসী এবং জাবির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মো. আবুল হোসেনে ভাগ্নি রিফাত জেরিন।

অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া ওই ৩ জনকে স্থায়ী করনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. আমির হোসেনের সভাপতিত্বে সিলেকশন বোর্ডের সভা শাখা ছাত্রলীগ পণ্ড করে দেয়।

এ বিষয়ে সিলেকশন বোর্ডের সভাপতি ও উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. আমির হোসেন বলেন, বিশেষ কারণে নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। এর বাইরে আর কিছু বলতে পারবো না।

Comments

comments