আরিফ হাওলাদারকে ধরা যাচ্ছে না কেন?

রোকেয়া রহমান

আরিফ হোসেন হাওলাদার খুবই ভাগ্যবান একজন ব্যক্তি। পুলিশ এখনো তাঁর টিকিটাও ছুঁতে পারেনি। পুলিশ অবশ্য বলছে, তারা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। মনে প্রশ্ন জাগে, আসলেই কি তারা চেষ্টা চালাচ্ছে? সত্যিই কি তারা আন্তরিক আরিফ হোসেনকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে।

পাঠক, আরিফ হোসেনকে কি চিনতে পারছেন? তিনি শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। অবশ্য তিনি সদ্য সদ্যই সাবেক হয়েছেন। আরিফ হোসেন এলাকার ছয় নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে সেসব সম্পর্কের দৃশ্য ভিডিও করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছেন—এমন অভিযোগ পাওয়ার পর ইউনিয়ন ছাত্রলীগ তাঁকে বহিষ্কার করে।

১১ নভেম্বর প্রথম আলোয় আরিফ হোসেনের কর্মকাণ্ডের খবরটি ছাপা হয়। যে ছয় নারীকে বিভিন্ন ফাঁদে ফেলে তিনি অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, সেই নারীদের জীবন আজ বিপর্যস্ত। দুজনের সংসার ভেঙে গেছে। দুজন কলেজে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। আরেকজন বলেছেন, মরে যাওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু উপায় একটা আছে। সবার আগে নির্যাতক প্রতারক আরিফকে আটক করে বিচার করা; তাতে অন্তত ভুক্তভোগী নারীরা কিছুটা নিরাপদ বোধ করবেন, সুযোগ পাবেন নতুন করে জীবন গড়ার। অপরাধী ধরা না পড়া পর্যন্ত হুমকি থেকেই যায়।

দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পরপরই আরিফ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। সেটা ৯ নভেম্বরের ঘটনা। ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি বা করেনি। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে কাউকে খুঁজে পাওয়া কি খুব কঠিন কিছু? তিনি ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে কি তাঁকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না? নাকি আরিফ যা করেছেন, তা পুলিশের কাছে অপরাধ বলে গণ্য হচ্ছে না? সে জন্যই গ্রেপ্তারে এই গড়িমসি? শুধু কি তা-ই? অনৈতিক সম্পর্কের ভিডিওগুলো এখনো ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব ভিডিও প্রচার বন্ধেরও তো কোনো উদ্যোগ পুলিশ নিল না। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়বে, আর ডিজিটাল পদ্ধতিতে মানুষের জীবন তছনছ করা হবে, তা তো হতে পারে না।

এত জঘন্য অপরাধ করার পরও একজন ব্যক্তি যদি গ্রেপ্তার না হন, তাহলে তাঁকে ভাগ্যবান বলব না তো কী বলব? এমন ভাগ্যবান অবশ্য আমাদের দেশে আরও অনেক আছে। খুন, ধর্ষণ, ডাকাতিসহ বড় বড় অপরাধ করার পরও তারা আজ মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয় বা তারা প্রচুর অর্থ সম্পত্তি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার মালিক। পুলিশের এত সাহস কোথায় তাদের ধরার? তা ছাড়া দরকারটাই-বা কী? বরং প্রভাবশালীদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলেই তো তাদের লাভ। আর রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হলে তো কথাই নেই। বদলি থেকে শুরু করে চাকরিক্ষেত্রে কত সুবিধাই না পাওয়া যায়। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় যারা সন্ত্রাস করে, তাদের ব্যাপারে পুলিশ বরাবরই কম সক্রিয়।

একাত্তরে স্বাধীনতার সূচনালগ্নে যে পুলিশ বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়েছিল বিদ্রোহ আর প্রাণদানের মধ্য দিয়ে, সেই পুলিশের অপরাধ কিংবা অপরাধীর সঙ্গে আপস আমাদের কষ্ট দেয়। অর্থ ও ক্ষমতার কাছে তাদের আত্মসমর্পণ আমাদের হতাশ করে। পুলিশই যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে কোথায় যাবে সাধারণ মানুষ? এ কোথায় আমাদের বসবাস?

অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে গণমাধ্যম ও নাগরিকেরা চোখে আঙুল দিয়ে না দেখালে কিংবা জোর প্রতিবাদ না জানালে পুলিশ প্রশাসন অনেক অপরাধকে আমলেই নেয় না। এতে তাদের ওপর আস্থায় চিড় ধরে। প্রশ্ন হচ্ছে, কবে এসবের অবসান হবে? কবে পুলিশ বাহিনীর টনক নড়বে? নিজেদের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পুলিশেরই।

আরিফ হোসেন হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে-এটাই এখন আমাদের চাওয়া। আমরা চাই আরিফ তার কৃতকর্মের উপযুক্ত শাস্তি পাক, যাতে আর কেউ এ ধরনের জঘন্য অপরাধ না করে।

রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক

Comments

comments