মেজর জলিল এখনো প্রাসঙ্গিক

মাসুদ মজুমদার

মেজর জলিল

১৯ নভেম্বর। মেজর অব: এম এ জলিলের মৃত্যুবার্ষিকী। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বিরোধীদলীয় স্রোতধারার প্রাণপুরুষ মেজর জলিল বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে নতুন ধারার বরপুত্র। এক অসাধারণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পক্ষে টানা সংগ্রামী এই লড়াকু সৈনিক বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক বিরল এক্সপেরিমেন্টও। মার্কসবাদে মুক্তির দিশা খুঁজে একসময় হতাশ হয়ে পড়েন। ইসলামের ভেতর মুক্তির অন্বেষা তাকে নতুন পথের সন্ধান দেয়। মৃত্যু পর্যন্ত সেই লক্ষ্যে মুক্তি আন্দোলন করেছেন। মার্কসবাদ-মাওবাদে মুক্তির দিশা খোঁজার মধ্যে তার কোনো ভড়ং ছিল না। তাই যখনই নতুন দিশা পেলেন তখনই মত পাল্টালেন। নিঃসঙ্কোচে তার নতুন অস্তিত্ব জানান দিলেন। আলী শরিয়তির ধারায় মেজর জলিলও নতুন স্বপ্নের জালটি বুনে গেলেন। ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’ তার দেশপ্রেমের এক অমর গদ্যকাব্য। আজ বিনম্রচিত্তে পরম শ্রদ্ধাভরে তাকে স্মরণ করছি। তার স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারে নতুন প্রজন্ম জাগুক- এই প্রত্যাশা করছি।

বাংলাদেশের আজকের প্রেক্ষাপটে মেজর জলিল অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একসময় যেকোনো দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তর্জনি উঁচিয়ে ‘খামোশ’ বলতেন মওলানা ভাসানী। স্বাধীনতার স্বপ্নভঙ্গের প্রেক্ষাপটে ‘রুখো’ বলে আধিপত্যবাদের পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছিলেন মেজর জলিল। আজ আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘিœত। স্বাধীনতার স্বপ্নগুলো ভূলুণ্ঠিত। গণতন্ত্র সুদূরপরাহত। জুলুম-অত্যাচারের হাহাকার সর্বত্র। এমন পরিস্থিতিতে লড়াকু সৈনিক মেজর জলিলকে বেশি মনে পড়ছে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও রাজনৈতিক ঐক্যতানের কারণে নির্দ্বিধায় বলতে পারি- মেজর জলিল জীবিত থাকলে আজ হুঙ্কার দিয়ে রাজপথে নামতেন। জনমনে সাড়া জাগাতেন। দুঃশাসনের আসন কাঁপাতেন। প্রতিবাদী কণ্ঠ ও চরিত্রগুলো আজ আর নেই। যারা আছেন তারা কেউ কেউ কায়েমি স্বার্থবাদের পদতলে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ বা রাজনৈতিক নষ্টামির কাছে আত্মসমর্পণ করে বসে আছেন। আজকের বাস্তবতায় জলিলচর্চার তাগিদ বাড়ছে। সময়ের সাহসী সন্তানদের মূল্যায়নের প্রয়োজনও বেড়েছে।

মেজর জলিল যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন তার কোনো স্থাবর সম্পত্তি ছিল না। ভাড়া করা বাড়িতে থাকতেন। একসময় একটি পুরনো মডেলের গাড়ি ছিল। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সেটিও বিকিয়ে দিতে হয়েছিল। জাতির জন্য উজাড়প্রাণ, প্রশস্ত হৃদয়ের সিংহদিলী মানুষটি জাতির জন্য রেখে গেলেন একবুক ভালোবাসা। শত্রু-বন্ধু চেনার মানদণ্ড। সহজ-সরল-নির্লোভ জীবনাচার। সত্যের জন্য, মানুষের জন্য, অন্যায়-অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক জ্বলন্ত উপমা। সর্বোপরি স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত।
মেজর এম এ জলিল,- নামটি উচ্চারিত হলেই মানসপটে ভেসে ওঠে এমন এক বর্ণিল-স্বপ্নিল প্রলম্বিত চুল-শ্মশ্রুমণ্ডিত নায়কের কথা, যিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টর কমান্ডার। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী। আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদবিরোধী আন্দোলনের আপসহীন অগ্রসৈনিক। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে বিরোধীদলীয় রাজনীতির সাহসী যোদ্ধা, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে আমৃত্যু বজ্রকণ্ঠ ও সংগ্রামী জননেতা। জাতীয় রাজনীতিতে বর্ণাঢ্য জীবন-বৈচিত্র্যের ব্যতিক্রমী পুরুষ। জাতীয় শত্রু-তাঁবেদার শোষক-জালিমের আতঙ্ক, মজলুমের বন্ধু। স্বজন-প্রিয়জনের প্রিয়মুখ। সহজ-সরল নিরহঙ্কার অথচ অসাধারণ ব্যক্তিত্বের মহিমায় মহিমান্বিত এক ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি। তার নামটি উচ্চারিত হলে মানসপটে ভেসে ওঠে জাতীয় রাজনীতিতে দুই দশকজুড়ে প্রভাব বিস্তারকারী-মুক্তির নেশায় সতত জাগ্রত, কল্যাণব্রতে অঙ্গীকারবদ্ধ, বস্তুগত জীবনে প্রতিষ্ঠাবিমুখ, এক অসাধারণ দেশপ্রেমিকের প্রতিচ্ছবি।

মাত্র ৪৭ বছর বয়সের এক অকুতোভয় সাহসী যোদ্ধা বাংলাদেশের রাজনীতিকে এমন কিছু ব্যতিক্রমী বিষয় উপহার দিয়েছেন- যা অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি যুদ্ধে গেলেন; কিন্তু কোনো রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। দেশের ডাকে সাড়া দিতেই তিনি নিজেকে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। দেশের প্রয়োজনেই ভারতীয় বাহিনীর লুটপাটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। দেশের কল্যাণচিন্তা করেই অকল্পনীয় এক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিরোধীদলীয় রাজনীতির স্রোতপ্রবাহ সৃষ্টি করেছিলেন। দেশ-জাতির কথা ভেবেই কলম ধরেছিলেন। আজ মেজর জলিল আমাদের মাঝে নেই। আছে তার দেশপ্রেমের ঈর্ষণীয় উপমা। সেই সাথে আছে কালজয়ী কিছু লেখা।

হাজার চেষ্টা করেও জাতি আজ আর একজন জলিলকে খুঁজে পাবে না। কিন্তু তার কালজয়ী লেখাগুলো জাতিকে প্রেরণা জোগাবে। যেকোনো মানুষকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় পরিস্থিতির মুখেও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করবে। তাই তার লেখাগুলো জাতির সম্পদ, দেশের সম্পদ। আমরা যারা এ বর্ণাঢ্য ব্যতিক্রমী পুরুষটির সান্নিধ্যে গিয়েছি- তারা উপলব্ধি করেছি মেজর জলিল জাতিকে কত বেশি দিতে চেয়েছিলেন। পথ-মত তার কাছে কখনো বড় ছিল না। ভাবার বিষয় ছিল মানুষের মুক্তি, মানবতার মুক্তি। সর্বোপরি তার ‘জীবনাদর্শের’ বিজয়। এ কারণেই আমরা সাক্ষ্য দেবো- পারিবারিক পরিবেশ তাকে দিয়েছিল নিষ্ঠার সবক। সৈনিক জীবন করেছিল সাহসী, কষ্টসহিষ্ণু ও সুশৃঙ্খল। মুক্তিযুদ্ধ বানিয়েছিল লড়াকু। বামধারার সমাজবাদী রাজনীতি করেছিল অভিজ্ঞ। আমৃত্যু সংগ্রামী জীবন তাকে করেছে প্রতিবাদী, জালিম-শোষক ও লুটেরা শাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন। অবশেষে চিন্তার পরিবর্তন ও ইসলামের মূল ধারায় প্রত্যাবর্তন তার মাঝে এনেছিল পূর্ণতা।

পূর্বাপর একজন দেশপ্রেমিক ও মুক্তিকামী সাহসী যোদ্ধার সন্ধান চাইলে মেজর এম এ জলিলের মতো একজন সাহসী যোদ্ধাকে আমাদের প্রয়োজন পড়বেই। তার স্মৃতি প্রতিনিয়ত আমাদের প্রেরণা জোগাবে। জাতীয় জীবনের যেকোনো সন্ধিক্ষণে, সঙ্কটে দুর্বিপাকে আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেবে মেজর জলিলের কথা। আমাদের স্বাধীনতা কখনো অরক্ষিত হয়ে পড়লে আমাদের সামনে ভেসে উঠবে মেজর জলিলের সেই বাণী- ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’। তখনই আমরা থমকে দাঁড়িয়ে আমাদের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে স্বাধীনতা রক্ষার শপথ পালনে মেজর জলিলের মতোই রুখে দাঁড়ানোর ভরসা পাবো।

Comments

comments