গুম উধাও নাটকের নায়কেরা

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

মোবাশ্বের হাসান একজন শিক্ষক ও গবেষক। তিনি অধ্যাপনা করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি আরো কাজ করেন সরকারের এটুআই প্রকল্পে। নিত্যদিনের মতো মোবাশ্বের হাসান সকাল-সন্ধ্যা কাজ করেন তার বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিকাল ৪টার পর বেরিয়ে পড়েন অন্য কাজে। ৭ নভেম্বর সরকারের ওই প্রকল্পের একটি সভায় যোগ দিতে তিনি আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনে যান। সন্ধ্যে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত তার অবস্থান ছিল আইডিবি ভবন এলাকায়। ৬টা ৪১ মিনিটে কার সাথে ফোনে কথা বলেন তিনি। এর চার মিনিট পর তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তখন থেকে আজ (১৭ নভেম্বর ২০১৭) পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ-খবর পাওয়া যায়নি। এর পরদিন ৮ নভেম্বর ভোরে গুলশানের বাসা থেকে সাদা পোশাকের লোকেরা ধরে নিয়ে গেছে এক প্রকাশনা ব্যবসায়ীকে। করিম ইন্টারন্যাশনাল নামে ওই প্রকাশনা সংস্থাটির কর্ণধার তানভীর ইয়াসিন করিমের শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কোনো হদিস মেলেনি।

এটি একজন মানুষের গল্প নয়। একদিনের গল্প নয়। এটি নিত্যদিনের গল্প। গুম ও উধাও হওয়া আজকাল বাংলাদেশে যেন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলেন, যখন ‘ডিজঅর্ডার ইজ দ্য অর্ডার অব দ্য ডে’ হয় তখন কোনো কিছুকেই অস্বাভাবিক মনে হয় না। মোবাশ্বের হাসান নিখোঁজ হওয়ার আগে ২২ আগস্ট নিখোঁজ হন বিএনপির নেতা ও ব্যবসায়ী সাদাত আহমেদ। ২৬ আগস্ট থেকে খোঁজ নেই কানাডার ম্যাকভিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইশরাক আহমেদের। ২৭ আগস্ট নিখোঁজ হন কল্যাণ পার্টির মহাসচিব আমিনুর রহমান। একই দিনে লাপাত্তা হন বেলারুশের অনারারি কনসাল ও ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায়। ৭ অক্টোবর বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন আরাফাত রহমান নামের এক যুবক। ১০ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ হন পূর্বপশ্চিম বিডি অনলাইনের সাংবাদিক উৎপল দাস। ২৭ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ আছেন বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও তার সহকর্মী আশিক ঘোষ। নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইচ ওয়াচ জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ৯০ জন গুম হয়েছেন। ২০১৭ সালের মে মাস পর্যন্ত পাওয়া প্রতিবেদনে ৪২ জনের গুম হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এসব গুম, উধাও এবং বলপূর্বক অপহরণ সম্পর্কে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর ভাষ্য প্রায় একই রকম। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, ‘অনেকে ইচ্ছে করে মিসিং হয়ে যাচ্ছে বা আত্মগোপনে গিয়ে আমাদের বিব্রত করছে। এ ধরনের মিসিংয়ের সুরাহা করা গোয়েন্দাদের জন্য একটু কষ্টকর।’ নিখোঁজ, গুম কিংবা অপহরণ নতুন নয় বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক। প্রতিটি গুম, খুন এবং বলপূর্বক অপহরণের পর সংশ্লিষ্ট অভিভাবক এবং পরিবার থানায় জিডি করতে যায়। কখনো কখনো পুলিশ জিডি নিতেও অনীহা দেখায়। অথচ বেশির ভাগ গুম হয়ে আসছে পুলিশের নামে। সাদা পোশাকে তারা নিজেদের পুলিশ ও র‌্যাবের পরিচয় দিচ্ছে। দৃশ্যত পুলিশের যানবাহন ব্যবহার হচ্ছে। কোনো কোনো সময় নাম-পরিচয় ও সুনির্দিষ্ট স্থানের কথা তারা বলছে।

পুলিশের পোশাকেও বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। প্রায় সব সময়ই পুলিশ অস্বীকার করছে, তাদের লোকেরা এসব করছে না। ভুক্তভোগী লোকজন এ অফিস থেকে ও অফিস ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে হয়রান হয়ে ফিরে আসছে। কোনো মতেই আপনজনের সন্ধান করতে পারছে না তারা। এসব লোকদের সন্ধান মিলছে কখনো কখনো। তবে জীবিত নয়, লাশ হয়ে। গতানুগতিক খবর এ রকম যে, অপহৃত ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেছে নদীতে, জঙ্গলে অথবা সড়কে। বন্দুক যুদ্ধ বা ক্রস ফায়ারের নামে গুম, খুন ও জোরপূর্বক অপহৃত ব্যক্তিদের নাম যখন সংবাদপত্রে বা চ্যানেলে প্রকাশিত হয় কেবল তখনই পরিবার বা স্বজনেরা জানতে পারে তাদের হদিস। অথচ প্রকাশিত খবরের বেশ আগে এমনকি কয়েক মাস আগে তাদের সাদা পোশাকে তুলে আনা হয়েছিল। যেসব লোকেরা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন গুম ও খুন থেকে তাদের ভাষ্য থেকেও জানা যাচ্ছে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ধরে নেয়ার বেশ কিছুকাল পরে কোর্টে হাজির করেছে অথবা ফিল্মি স্টাইলে কোনো নিরাপদ জায়গায় নামিয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনার বেশির ভাগই পুলিশের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ অভিভাবকদের। তবে রাষ্ট্র ও সমাজের এই সময়ে সাধারণ মানুষের উপলব্ধি, হয়তো বেশির ভাগ ঘটনা পুলিশ ঘটিয়ে থাকবে কিন্তু এর বাইরেও অজানা শক্তি আছে, অজানা শত্রু আছে এবং আছে রাজনীতি। বিস্ময়ের ব্যাপার, প্রায় এক দশক ধরে এ ধরনের ঘটনার ব্যাপকতা বাড়লেও সরকারের তরফ থেকে কোনো তদন্তের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সমাজ সম্পর্কে যারা সচেতন, তারা জানেন রাষ্ট্র বা সরকারের দুর্বলতার সুযোগে পেশাদার অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ দেশে প্রতিবেশীর গোয়েন্দা সংস্থা বেশ সক্রিয় আছে- রাজনীতিকদের এ অভিযোগ অনেক পুরনো। ‘বিভিন্ন সময় রহস্যজনক নিখোঁজের পেছনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাত থাকার অভিযোগ উঠছে’। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হয়তো তাদের তৎপরতা কমতে বাড়তে পারে।

ক) ইলিয়াস আলী থেকে সালাহ উদ্দীন এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ জনতা পার্টি- বিজেপির সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও দলের কেন্দ্রীয় নেতা অসিত ঘোষকে অপহরণ এবং গ্রেফতার প্রমাণ করে, বিষয়টি রাজনৈতিক। বিরোধী দলগুলো দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, তাদেরকে নির্মূল করার জন্য সরকার পরিকল্পিতভাবে এসব গুম, খুনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি কয়েক মাস আগে তাদের গুম করা নেতাকর্মীদের একটি দীর্ঘ তালিকা সংবাদপত্রে প্রকাশ করেছিল। নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক তালিকা তৈরি করে যে ক্রসফায়ার বা বন্দুক যুদ্ধে নিহতের ঘটনা ঘটছে সেই গোপন কথাটি এক অসতর্ক মুহূর্তে ফাঁস করে দিয়েছেন সাভারের সরকারদলীয় এমপি ডা. এনামুর রহমান।

খ) নিখোঁজের আড়াই সপ্তাহ পর মিঠুন চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় নেতা অসিত ঘোষকে গ্রেফতারের কথা নিশ্চিত করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। সন্দেহভাজন হিসেবে ৫৪ ধারার মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে মিঠুনকে গত ৭ নভেম্বর এবং অসিতকে ৮ নভেম্বর আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। এর আগে গত ২ নভেম্বর মিঠুন ও অসিতের পরিবার সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিল, ২৭ অক্টোবর পুলিশের একটি দল তাদের সূত্রাপুর থানা এলাকা থেকে তুলে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় প্রমাণিত হয়, পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক আগে এ রকম তুলে নিয়ে গিয়ে পরে তাদের হত্যা করে অথবা মামলায় জড়িয়ে দেয়। মিঠুন চৌধুরীর স্ত্রী সুমনা চৌধুরীর দাবি, তার স্বামী মিঠুন চৌধুরী সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করেন। তাই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, একজন ব্যক্তিকে গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে সমর্পণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনার পর সাদা পোশাকের গ্রেফতার নিষিদ্ধ করে উচ্চ আদালত কিছু নির্দেশনা দেয়। কিন্তু পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা যে অগ্রাহ্য করছে, মিঠুন-অসিতের ঘটনা তার আরেকটি প্রমাণ।

গ) যশোরে সাত কর্মকর্তাসহ ১৬ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অপহরণ ও গুমের মামলা হয়েছে। শঙ্করপুর এলাকার হিরা খাতুন মামলার বিবরণে উল্লেখ করেন, গত ৫ এপ্রিল ১০টার দিকে তার একমাত্র পুত্র সাঈদ ও তার বন্ধু শাওন শহরের পৌর পার্কে বেড়াতে যায়। দুপুর ১২টার দিকে সাব্বির হোসেন নামে এক যুবক মোবাইলে তাকে জানায় যে, পুলিশ সাইদ ও শাওনকে আটক করেছে। সাথে সাথে তিনি পৌরপার্কে গিয়ে দেখেন পুলিশ সাইদ ও শাওনকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এ সময় তিনি দৌড়ে পুলিশের কাছে আটকের কারণ জানতে চাইলে তারা তাকে থানায় গিয়ে কথা বলতে বলেন। তিনি থানায় যাওয়ার পর পুলিশ তার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করলে সামর্থ্য না থাকায় দিতে পারেননি। এরপর তিনি পত্রিকা মারফত জানতে পারেন, তার ছেলে ও ছেলের বন্ধু পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়েছে। বিষয়টা নিশ্চিত হওয়ার জন্য বাদি থানায় গেলেও তাকে সহযোগিতার বদলে তার সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। এতে তিনি সন্দেহ করছেন, দাবি করা দুই লাখ টাকা না পেয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ তার ছেলে ও ছেলের বন্ধুকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ ও হত্যা করেছে। উল্লেখ্য, মামলাটি যশোর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে দায়ের করা হয় এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইনের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে বাদিকে তা প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়। এই সাধারণ ঘটনা থেকে যে অসাধারণ ঘটনার উপসংহার টানা যায় তা হচ্ছে দায় মুক্তির দাবি।

ঘ) সাতক্ষীরার হোমিও চিকিৎসক মোখলেসুর রহমান জনি পুলিশ হেফাজত থেকে নিখোঁজের অভিযোগ আছে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হেবিয়াস কার্পাস রিট হয়। ওই আদালত থেকে বিচারিক তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়। ওই তদন্ত কমিটির রিপোর্টে জনিকে থানায় আটক রাখার এবং ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার কথা বলা হয়। অথচ মোখলেসুর রহমান জনিকে আটকের অভিযোগ পুলিশ স্বীকার করেনি। বিচারিক তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের বিরুদ্ধে যায়।

ঙ) দুই লাখ টাকা না পেয়ে খুলনায় শাহজালাল নামে এক ব্যক্তির দুই চোখ তুলে ফেলার অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ২০১৫ সালে রাজধানীর মিরপুরে দাবি করা পাঁচ লাখ টাকা না পেয়ে নাহিদ নামে এক যুবককে পুলিশ কথিত ক্রসফায়ারে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আটকের পর আইন শৃঙ্খলাবাহিনী উল্লিখিত অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। এদের কিছু অসাধু সদস্য আইনকানুনের তোয়াক্কা না করা এবং অন্যায় অপকর্ম করার যথেষ্ট রিপোর্ট গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই সেদিন গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল ব্যবসায়ীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া অর্থসহ সেনাসদস্যদের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়েছে। চাঁদাবাজি, জায়গাজমি দখল, কন্ট্রাক্ট কিলিং, মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়সহ নানা অপরাধে লিপ্ত হওয়া পুলিশের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক মাসে এরা বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষকে নানাভাবে নিপীড়ন করে যাচ্ছে। সুতরাং গুম, উধাও এবং অপহরণের প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হলে বেরিয়ে পড়বে অব্যাহত গুম, উধাও এবং অপহরণের জন্য আসল অভিযুক্ত কারা? সরিষায় ভূত থাকলে যেমন ভূত ছাড়ানো যায় না, তেমনি দেশের আইনশৃঙ্খলা যাদের ওপর সমর্পিত তারাই যদি আইনের ব্যতিক্রম করে তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ‘গুম, উধাও এবং জোরপূর্বক অপহরণÑ হত্যার চেয়েও গুরুতর অপরাধ’। কারণ মৃতের অনুশোচনা এক সময় শেষ হয়ে যায়। আর যার খোঁজ পাওয়া যায় না তার জন্য স্বজনের দহন সারা জীবন ধরে তাড়িয়ে বেড়ায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাস্যকর উক্তি অপরাধের মাত্রাকে হ্রাস করে। প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার প্রয়াস পায়। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকারকে গুম, উধাও এবং জোরপূর্বক অপহরণের অবসান ঘটাতে হবে। সরকারকে মনে রাখতে হবে যে, একটি সন্ত্রাস দিয়ে আরেকটি সন্ত্রাস মোকাবেলা করা যায় না।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

Comments

comments