ফাঁসেই শেষ হল জেএসসি, কূল পাচ্ছে না কর্তৃপক্ষ

পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টাখানেক আগে প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের হাতে

বৃহস্পতিবার ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ বিষয়ের পরীক্ষায় শেষ হয় এবারের জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট-জেএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টাখানেক আগে ছড়িয়ে পড়া ওই প্রশ্নেই পরীক্ষা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার বলেছেন, তারা চেষ্টা করছেন প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে, কিন্তু পারছেন না।

সকালে মিরপুরের এম ডি সি মডেল ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, পৌনে ৯টার পর থেকেই শিক্ষার্থীরা জটলা করে কেন্দ্রের বাইরে মোবাইল ফোনে প্রশ্ন ও তার উত্তর দেখছেন।

সেখানে ‘খ’ সেটের ‘দিকপাল’ প্রশ্নটি মোবাইলে পড়ছিলেন এক শিক্ষার্থী। এই শিক্ষার্থীর অভিভাবকের সাথে কথা বললে তিনি প্রশ্ন পাওয়ার কথা স্বীকার করেন।

সুলতান মোল্লা স্কুলের আরেক শিক্ষার্থী তার বোনের পাশে দাঁড়িয়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন-উত্তরে চোখ বুলাচ্ছিলেন। তিনি প্রশ্নের একটি কপি শেয়ার ইটে এ প্রতিবেদককে দেন।

এই শিক্ষার্থী জানান, তার দুলাভাই তাকে আগে বলে রেখেছিলেন প্রশ্ন পাবেন। তিনি ৯টার কয়েক মিনিট পর একটি ফেইসবুক গ্রুপ থেকে প্রশ্নটি সংগ্রহ করে তাকে পাঠিয়েছেন।

ফাঁস হওয়া প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে অভিভাবকদের এই সহযোগিতার দৃশ্য দেখা গেছে কেন্দ্রের সামনেও।

পরীক্ষার আগে কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে প্রশ্ন ও তার উত্তর দেখছেন শিক্ষার্থী

এ কেন্দ্রের এক শিক্ষার্থী পরীক্ষার সময় হয়ে গেছে বলে দ্রুত পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢুকতে চাইলে তার মা তাকে পরে ঢুকতে বলেন।

সন্তানকে তিনি বলেন, “এখন ভালো করে প্রশ্নের উত্তরগুলো পড়ে নাও। ৫ মিনিট আগে ঢুকলেই হবে।”

এ প্রশ্ন যদি পরীক্ষায় না আসে তখন কী করবেন-এ প্রশ্নের জবাবে ওই শিক্ষার্থী বলেন, “সকালে যে প্রশ্নটা পাই সেটাই তো আসে। সব পরীক্ষায় সকালে যে প্রশ্নটা পেয়েছি, সেটাই এসেছে। আর ‘খ’ সেটের ‘দিকপাল’ প্রশ্নটি ৪-৫টা পরীক্ষায় এসেছে। এটাই আসবে নিশ্চিত।”

সকালে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজ কেন্দ্রের সামনেও জটলা করে শিক্ষার্থীদের ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ও উত্তর পড়তে দেখা যায়। সাড়ে ৯টার দিকে ফেইসবুক মেসেঞ্জার আর হোয়াটস অ্যাপে ইমেজ আকারে ‘খ’ সেট ‘দিকপাল’ নামে বোর্ড প্রশ্নের একটি সেট আসে, তা সঙ্গে হাতে লেখা বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তরও পায় শিক্ষার্থীরা।

ওই প্রশ্ন-উত্তর নিয়ে ব্যস্ত শিক্ষার্থীদের একজনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, যারা প্রশ্ন পায় তারা পরীক্ষার হলে কখন ঢোকে?

জবাবে তিনি বলেন, “যারা প্রশ্ন পায় তারা পরীক্ষার পাঁচ মিনিট আগে ঢোকে, যারা পায় না তারা আরও আগেই ঢুকে যায়। প্রশ্ন পেয়ে উত্তর পড়ে তারপর ঢোকে, তাই ওরা পাঁচ মিনিট আগে ঢোকে। সব প্রশ্নই (পরীক্ষার) আগে পাওয়া গেছে।”

ছেলে এত দেরিতে পরীক্ষার কেন্দ্রে যাচ্ছে কেন- এ প্রশ্নের জবাবে সিদ্ধেশ্বরী বয়েজ স্কুলের এক শিক্ষার্থীর মা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এমসিকিউয়ের উত্তর দেখে যাচ্ছে।”

সাংবাদিক বুঝতে পেরে তিনি বলেন, “রিভিশন করছে।”

দুপুর ১টায় পরীক্ষা শেষ হলে মতিঝিল মডেল হাই স্কুলের এক পরীক্ষার্থী জানান, সকাল সাড়ে ৯টায় তারা যে প্রশ্ন পেয়েছিলেন ‘খ’ সেটের, সেটিই হুবহু এসেছে মূল পরীক্ষায়, বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর সব কয়টি সঠিক হয়েছে তার। একই কথা বলেন আরও কয়েকজন পরীক্ষার্থী।

প্রশ্নের জন্য যে টাকা দিতে হয় তা কোথায় পান- এই প্রশ্নের উত্তরে সিদ্ধেশ্বরী বয়েজ হাই স্কুলের এক পরীক্ষার্থী বলেন, তারা চার-পাঁচজন বন্ধু মিলে টাকা দিয়ে প্রশ্ন কেনেন, তারপর অন্যান্য বন্ধুদেরও দেন।

“প্রশ্নের টাকা তো একা দিতে পারি না। একজন যোগাযোগ করে প্রশ্ন নেই তারপর চার-পাঁচ জন মিলে টাকা দেই। বাসা থেকে নেই টাকা।”

সকালে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের অনুলিপি দেখে ৯টা ৫৮মিনিটে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকারকে বিষয়টি জানানো হয়।

তখন তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পরীক্ষা শেষ হলে দেখা যাক, ওই সেট পরীক্ষায় এসেছে কি না।”

পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টাখানেক আগে প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের হাতে

পরে পরীক্ষা শেষে বেলা দেড়টার দিকে তাকে ফোন করে ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই পরীক্ষা হওয়ার কথা জানালে দৃশ্যত অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন তিনি।

“আমরা চেষ্টা করছি এটা বন্ধ করার জন্য। কিন্তু আমারও প্রশ্ন, এটি বন্ধ হচ্ছে না কেন?”

প্রশ্ন ফাঁস রোধে অভিভাবকদের সচেতনতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

‘চলছে নকলও’

মিরপুরের এম ডি সি মডেল ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে মেয়েকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে আসা আসগর হোসেন বলেন, প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নকল করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

“প্রতিদিনই শুনছি প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। দেখছিও বাচ্চারা মোবাইলে কী সব দেখছে। আবার কাগজে লিখে নিচ্ছে। অনেকে আবার বলছে, ও লিখে নিছে, ওর কাছ থেকেই জানতে পারব।”

পরীক্ষা শেষে মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীও তাদের কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের নকল করার কথা জানিয়েছেন। কয়েকজন কাগজে লিখে নেওয়া নম্বর দেখে বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন বলে জানান তারা।

ওই প্রশ্নেই হয়েছে পরীক্ষা

পরীক্ষার হলে দায়িত্বরত শিক্ষকরা তাদের কিছু বলছে কি না- জানতে চাইলে এক শিক্ষার্থী বলেন, “টিচার তো দেখেননি। ওনারা তো এসব খেয়াল করেন না। আর লুকিয়ে তো করে এসব।”

এভাবে প্রশ্ন ফাঁস এবং এই বয়সে শিক্ষার্থীদের অসৎ পন্থা অবলম্বন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসগর হোসেন বলেন, “কী যে অবস্থা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার! সরকার কী করছে? একদিন প্রশ্ন আউট হতে পারে, কিন্তু প্রতিদিন? এটা কীভাবে হচ্ছে? পরীক্ষার মাধ্যমে বাচ্চাদের মেধা যাচাই করা হয়, কিন্তু ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা নিয়ে কী লাভ হচ্ছে?

“পড়ালেখা করিয়ে আমরা সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করতে চাই। কিন্তু ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে ওরা কী শিখবে? ওরা তো চুরি করতে শিখছে। এরা দেশের জন্য কী করবে? আর যারা প্রশ্ন পাচ্ছে না তারা তো এ শিক্ষাব্যবস্থার উপর আস্থা হরিয়ে ফেলছে।”

আরেক অভিভাবক বলেন, “এক ঘণ্টা আগে প্রশ্নটা না এসে আগে আসলেই তো হয়। আর বাচ্চারাও বা কী করবে? কাল সন্ধ্যা থেকেই প্রশ্ন খুঁজেছে। পরীক্ষার আগে পড়বে কী, প্রশ্ন খোঁজায় তো ব্যস্ত।”

প্রশ্ন ফাঁস রোধে সরকারের পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের সচিব শাহান আরা বেগম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফর ডটকমকে বলেন, সরকার কঠোর না হলে এর প্রতিকার হবে না।

“আমাদের কী করার আছে? সরকারকে কঠোর হতে হবে।”

নির্ধারিত সময়ের পর শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বাচ্চারা অনেক ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে। সে কারণে সাড়ে ৯টার পর আসলেও কিছু করার থাকে না।”

Comments

comments