বাচ্চুর শক্তির উৎস কোথায়?

অর্থ লোপাটের ঘটনায় বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু ও তার নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের দায় নিরূপণে দুদকের তদন্ত কবে নাগাদ শেষ হবে- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন দলমত নির্বিশেষ সংশ্লিষ্ট সবাই।

এমনকি এ ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা হয়েছে খোদ আদালত থেকেও। বাচ্চুকে বাদ দিয়ে বেসিক ব্যাংক দুর্নীতি মামলার তদন্তে দুদকের স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আদালত। কিন্তু আদালতের সেই পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী দুদক থেকে এখনও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

যে কারণে বারবার আদালত থেকে একই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন বাচ্চুর শক্তির উৎস কোথায়?

সূত্র জানায়, হাইকোর্ট ও সুপ্রিমকোর্ট থেকে অন্তত পাঁচ দফায় দুদককে তাগিদ দিয়ে বেসিক ব্যাংকের মামলায় বাচ্চু ও পরিচালনা পর্ষদের বিষয়ে তদন্ত করতে বলা হয়েছে।

সর্বশেষ বুধবার এক আসামির জামিন শুনানির সময় এতবড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় আবদুল হাই বাচ্চুর দায়বদ্ধতা ছিল কিনা এবং এজাহারে তার নাম না থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আদালত।

এদিন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির মামলায় ব্যাংকের ইন্টারনাল ক্রেডিট ডিভিশনের জিএম মো. সেলিমের জামিন শুনানিতে দুদকের তদন্ত নিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন।

আদালত বলেছেন, আর্থিক অনিয়মের মামলায় আসামি ধরার ক্ষেত্রে ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ বা সুবিধামতো বাছাই হচ্ছে। এতে দুদকের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আদালত।

বাচ্চু বা পরিচালনা পর্ষদের বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ থাকার পরও কেন তাদের সম্পৃক্ত করে দুদক তদন্ত শেষ করছে না জানতে চাইলে দুদকের প্রধান কৌঁসুলি খুরশিদ আলম খান বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি টাইম-টু-টাইম আদালতের নির্দেশনা কমিশনকে অবহিত করছি।

এরপরের দায়িত্ব তো কমিশনের।’ তিনি বলেন, ‘বাচ্চু বা বোর্ড সদস্যরা আসামি হচ্ছেন না কেন আদালতের প্রশ্ন সেটাই। শুধু হাইকোর্টই নয়, আপিল বিভাগ থেকেও এ প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

আমি কমিশনকে লিখিতভাবে এবং ব্যক্তিগতভাবে এসব বিষয় জানিয়েছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও বাচ্চু বা পর্ষদকে বাদ দিয়ে মামলার চার্জশিট দেয়া হবে কিনা সেটা কমিশনের বিষয়।

আমি মনে করি আদালতের নির্দেশ বেসিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে করা দুদকের ৫৬ মামলার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।’

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন। ফলে আদালতের নির্দেশনামতো বাচ্চু ও পর্ষদের বিষয়ে তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

তবে এর আগে তিনি এ বিষয়ে যুগান্তরকে বলেছিলেন, ‘আমরা আদালতের নির্দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।’ বেসিক ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সবাই আইনের আওতায় আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তদন্তকালে সবার সম্পৃক্ততাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।’ দুদক সচিব ড. শামসুল আরেফিনের কাছে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বৃহস্পতিবার তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘তদন্ত চলমান আছে। এখনও তদন্তকারী কর্মকর্তারা তদন্ত রিপোর্ট জমা দেননি।’

বেসিক ব্যাংক মামলার আসামি ব্যাংকের ইন্টারনাল ক্রেডিট ডিভিশনের জিএম মো. সেলিমের পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকও মনে করেন, বোর্ড সদস্য যারা ঋণ অনুমোদন করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি।

ওপরের লোকজনই ঋণ দিয়েছে। ফলে তাদের বাদ দিয়ে যিনি ঋণ দেয়ার অনুমোদন দেননি তাকে আসামি করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শাহদীন মালিক আদালতের পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃত করে বলেন, একই মামলায় আপনারা (দুদক) কাউকে ধরবেন, কাউকে ধরবেন না এটা তো পিক অ্যান্ড চুজ।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উচ্চ আদালত থেকে বারবার নির্দেশনা আসতে থাকায় ৩ অক্টোবর দুদক থেকে বেসিক ব্যাংকের আলোচিত অর্থ কেলেঙ্কারির হোতা সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু ও তার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের ১০ জন সদস্যকে তদন্তের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ওইদিন দুদকের পক্ষ থেকে দু’জন তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেয়া হয়।

মতিঝিল থানায় দায়ের করা একটি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দুদকের উপপরিচালক মির্জা জাহিদুল আলম এবং পল্টন থানায় দায়ের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক জয়নুল আবেদীনকে পৃথক চিঠি দিয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনামতো তদন্তের জন্য বলা হয়।

চিঠিতে বাচ্চু ও পর্ষদ সদস্যদের তদন্তের ব্যাপারে হাইকোর্টে নির্দেশনার বিষয়টি অবগত করা হয়। দুদকের এ সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়, ‘মহামান্য সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের আদেশের আলোকে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম যথাসময়ে সম্পন্ন করে সাক্ষ্য-স্মারক (প্রতিবেদন) দাখিলের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হল।’

এদিকে দু’জন তদন্ত কর্মকর্তাকে আদালতের নির্দেশনার আলোকে তদন্ত করতে চিঠি দেয়ার পর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কেটে গেছে ১ মাস ৭ দিন। এ সময়ের মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তারা বাচ্চু বা পর্ষদকে জিজ্ঞাসাবাদের কোনো উদ্যোগ নেননি বলে জানা গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, আমরা আদালতের নির্দেশনার কথা জেনেছি। কিন্তু সে আলোকে কাজ হচ্ছে না কেন, সে বিষয়ে তারা কোনো কথা বলতে নারাজ।

আদালতের পর্যবেক্ষণ দুদকের ধীরগতির তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর বিষয়ে কথা বলে কোনো লাভ নেই। যেখানে গণমাধ্যম, সুধী সমাজ, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ এবং বিচারালয় তার বিরুদ্ধে সোচ্চার। সেখানে হাইকোর্টের রুল অমান্য করায় আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। এর মাধ্যমে সব দেশ এবং দেশের মানুষকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। আসলে তার শক্তির উৎস কোথায়?

তিনি আরও বলেন, মূলত তাকে রক্ষা করতে গিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাত এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে দুর্বল করে দেয়া হচ্ছে। দেশের শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া বাচ্চু সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

সে বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করুন। বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, দুটি অডিট ফার্মের নিরীক্ষা প্রতিবেদনসহ সার্বিক বিবেচনায় বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান, পরিচালকরা এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারেন না। তিনি বলেন, বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যানের জড়িত থাকার যথেষ্ট প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। এখন দুদক কি করে সেটা দেখার অপেক্ষা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য টিপু মুন্সি তার বক্তব্যে বলেন, ‘বেসিক ব্যাংকের অনিয়মের বিষয়ে তৎকালীন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপ জনগণের সামনে দৃশ্যমান হচ্ছে না। বরং তিনি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।’

বেসিক ব্যাংকের অর্থ লোপাটের ঘটনায় দুদকের দায়ের করা ৫৬টি মামলার মধ্যে একটি মামলায় ২৬ জুলাই হাইকোর্ট বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুদককে তদন্তের নির্দেশ দেন।

এতে আদেশ প্রাপ্তির ৬০ দিনের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। ওই ৫৬ মামলার মধ্যে উচ্চ আদালতের নির্দেশমতো একটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ২৭ নভেম্বরের মধ্যে দাখিলের তাগিদ আছে বলেও দুদক সূত্রে জানা গেছে।

তদন্ত কাজে নিয়োজিত একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, তদন্তের প্রয়োজনে বাচ্চু ও ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এর জন্য আমরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছি। তাদের কি প্রশ্ন করা হবে মামলার নথি পর্যালোচনা করে সেটাও ঠিক করা হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে সে বিষয়টি বলা যাচ্ছে না।

দুদকের আইন ও বিধি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে দুর্নীতি মামলায় আসামি করতে হলে, এমনকি সাক্ষী করতে হলেও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। ওই ব্যক্তি যদি বিদেশে পলাতক থাকেন তবে ভিন্নকথা। অপরাধের পর পলাতক হয়ে যাওয়াই তার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রথম সাক্ষী হিসেবে বিবেচিত হবে।

বেসিক ব্যাংকের উচ্চপদস্থ সংশ্লিষ্ট সবাই দেশে আছেন। ফলে তাদের খোঁজ নিয়ে দুদকে ডেকে এনে বা তাদের ঠিকানায় গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা দুদকের জন্য খুব কঠিন কাজ নয়।

বেসিক ব্যাংকের মামলাগুলোর তদন্ত কাজ করছেন দুদকের ৯ জন কর্মকর্তা। তবে দুদক যে ৫৬ মামলা করে তা কোনোটিতে বাচ্চুর নাম নেই। অথচ বেসিক ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুসহ শীর্ষ ১১ কর্মকর্তার ঋণ কেলেঙ্কারিতে সম্পৃক্ত থাকার কথা উঠে আসে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সাবেক চেয়ারম্যান ও টপ ম্যানেজমেন্টকে বিচারের আওতায় আনতে দুদকের চাহিদা অনুযায়ী ঋণ জালিয়াতি ও অনিয়মের নথি সরবরাহ করা হয়েছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তেও বেসিক ব্যাংকের তিনটি শাখায় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে।

এর মধ্যে ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ শনাক্ত হওয়ার ঘটনায় মামলা করে দুদক। যার মধ্যে রয়েছে, গুলশান শাখার মাধ্যমে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, শান্তিনগর শাখায় ৩৮৭ কোটি টাকা, প্রধান শাখায় প্রায় ২৪৮ কোটি টাকা এবং দিলকুশা শাখায় ১৩০ কোটি টাকা।

যুগান্তর

Comments

comments