ঢাকায় ঘর সাজাতে গাছ

সুমনা শারমিন: বাসার সৌন্দর্য বাড়াতে গাছের ব্যবহার বরাবরই ছিল, তবে বর্তমানে জায়গার স্বল্পতার জন্য শহরের মানুষের মধ্যে ইন্ডোর প্ল্যান্ট ডেকোরেশনের প্রতি আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। ইট-কাঠ-পাথরের ঢাকা শহরে সবুজের ছোঁয়া দিতে ঘরে রাখতে পারেন বাহারি লতা কিংবা ফুলের গাছ।

আমাদের শহুরে জীবনযাত্রায় গাছপালা বা নিসর্গের সান্নিধ্য প্রতিনিয়তই কমছে। বড় অবকাশ ছাড়া প্রকৃতির সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ অনেকেরই নেই। তাই চার দেয়ালের মধ্যেই যদি রাখা যায় জীবন্ত উদ্ভিদ, তাতে গৃহসজ্জায় নান্দনিকতার পাশাপাশি প্রশান্ত এক পরিবেশও তৈরি হয়। ইচ্ছা আর আন্তরিক চেষ্টা থাকলে আপনিও নিজের ঘরটিকে সাজিয়ে তুলতে পারেন বাহারি উদ্ভিদ দিয়ে।
ছায়ায় বেঁচে থাকে এমন অনেক উদ্ভিদ ঘরের ভেতরে টবে লাগানো যায়। এসবের (ইনডোর প্ল্যান্টস) মধ্যে আইভি লতা, পাতাবাহার, মানি প্ল্যান্ট, ফাইলো ডেনড্রন, ড্রাসেনা, ক্রোটন, বাহারি কচু, পাম, অ্যানথুরিয়াম, ডাইফেনবেকিয়া, ম্যারান্টা, মনস্টেরা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এগুলোর প্রতিটির মধ্যে আবার নানা বৈচিত্র্যও আছে। ঢাকার বিভিন্ন নার্সারিতে খোঁজ নিলেই এসব উদ্ভিদ পাবেন। দাম খুব বেশি নয়, সাধ্যের মধ্যেই। ঘরের ভেতরে সাধারণত ফুল হয় না এমন ধরনের গাছ লাগানো হয়। তাই এখানে নকশা করা টব অথবা রঙিন টব রাখলে দেখতে ভালো লাগে।

জায়গার স্বল্পতা থাকায় চাইলেও অনেকে বাগান করতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে বারান্দা বা বসার ঘরের যেখানে আলো আসে এমন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের ফুলের গাছ যেমনÑ গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, কসমস, টগর, এস্টার ইত্যাদি রাখা যায়। গাছ যে ধরনেরই হোক তা যদি সুন্দর টবে লাগান হয় তবে দেখতে বেশ ভালো লাগে। নিজের পছন্দ মতো গাছ সাথে মানানসই টব বেছে নিতে পারেন।তবে লতানো গাছ ঝুলন্ত টবে লাগালে দেখতে ভালো লাগে। সে ক্ষেত্রে ভিন্ন আকৃতির যেমন-পাতাকৃতি, ত্রিকোণাকার, গোলাকার ইত্যাদি ছোট-বড় টব বেছে নিতে পারেন। ফুলের গাছ লাগানোর জন্য মাঝারি বা একটু বড় আকারের টব বেশ উপযোগী। এই ধরনের টবেও রয়েছে ভিন্নতা- নানান রঙ, নানান আকৃতি। মটকাকৃতি, গোলাকৃতি অথবা চৌকোণাকার টব ব্যবহার করেও সাজের ভিন্নতা আনা যায়।

এ ছাড়াও বর্তমানে তিনটি বা দুইটির ঝুলন্ত টবের সেট পাওয়া যায় যা ঘর বা বারান্দার একপাশে ঝুলাতে পারেন। এটি ঘরের সৌন্দর্য অনেকখানি বাড়িয়ে দেবে। লতানো গাছ লাগাতে ছোট-বড় ঝুলানো টব এবং কাপ, বাটি অথবা মালসা আকারের ছোট টবে পাথরকুচি, ক্যাকটাস বা এই ধরনের যেকোনো ছোট গাছ টেবিলে রাখা যায়।

রাজধানীর দোয়েল চত্বরে টব কিনতে আসা গৃহিণী ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, বাগান করা আমার শখ। সারা বছর নানান ধরনের গাছ লাগাই ঠিকই তবে বছরের এই সময়টা আমি ঘরের সাজগোজের দিকে বিশেষ মনোযোগ দেই। এখানে নতুন নতুন মডেলের টব, ফুলদানি পাওয়া যায়, মূলত এসব দেখতেই এখানে আসি; পছন্দ হলে নিয়ে যাই।
টবের দরদাম

ঢাকা কলেজের সামনে, গাউসিয়া মার্কেট ও দোয়েল চত্বরে মাটির তৈরি টবের আকার ও নকশার ভিন্নতানুযায়ী দামের পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ আকার ও মাপের ঝুলন্ত টব ১২০ থেকে ১৫০ টাকা। ছোট ঝুলন্ত টব ৫০ থেকে ৮০ টাকা। নকশা করা তিনটার সেট টবের দাম ৫৫০ থেকে ৭৫০ টাকা।

ছোট টব ৪০ থেকে ৮০ টাকা। মাঝারি আকারের টব ৬০ থেকে ১০০ টাকা। বড় টব ১৫০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। কাপ ও মালসাকৃতি টবের দাম ৩০ টাকা থেকে শুরু। উপকরণের ভিন্নতার জন্য এর দামের পার্থক্য ঘটে যেমনÑ চিনামাটি, পাথর, মোটা প্লাস্টিক, মাটি ইত্যাদি ভেদে দাম কমবেশি হয়ে থাকে। যেকোনো মাপের ভিন্ন আকৃতির টবের আকারে নতুনত্ব ও আধুনিকতার ছাপ থাকায় ভিন্ন আকৃতির দাম খানিকটা বেশি। তবে দরদাম করলে কিছুটা সাশ্রয়ে টব কেনা যায় এসব জায়গা থেকে।

গাছের দরদাম
প্রজাতি ভেদে ফুলের চারাগাছের দাম ২০ থেকে ১৫০ টাকা। পাতা বাহারের চারা ৫০ থেকে ২৫০ টাকা। লতাজাতীয় গাছের দাম ২০ থেকে ১৫০ টাকা। কলম করা ফল গাছ ৫০০ টাকা থেকে শুরু। কেনার আগে চারুকলার সামনে, কার্জন হল সংলগ্ন ফুটপাথ, বকশীবাজারের নার্সারি ও আগারগাঁওয়ের নার্সারি ঘুরে দেখতে পারেন।

গাছ ও টব কোথায় পাবেন
আগারগাঁও, ধানমন্ডি, কলাবাগান মাঠের পাশে, আবাহনী মাঠের উল্টা পাশে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার উল্টাপাশে, সায়েন্স ল্যাব, কার্জন হল সংলগ্ন ফুটপাথ, বকশীবাজার ইত্যাদি।

কিভাবে সাজাবেন
ঘরের আসবাব ও অন্যান্য সামগ্রীর সাথে মানানসই উদ্ভিদ ও টব বাছাই করুন। তা ছাড়া অবস্থান ও আয়তনের কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে। এমন অনেক গাছ আছে, যেগুলো ছায়ায় বা সরাসরি সূর্যের আলো ছাড়াও বেঁচে থাকে। তবে ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল থাকলে ভালো। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সুবিধার্থে ঘরের আসবাবপত্র ও গাছের মাঝখানে যথেষ্ট পরিমাণ ফাঁকা জায়গা রাখতে হবে। বিশৃঙ্খল বা এলোমেলো অবস্থা এড়াতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘর সাজাতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছায়ায় ভালো জন্মায় এমন গাছই ঘরের জন্য নির্বাচিত করা উচিত। যেসব ঘরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র বা এসি চলে, সেখানে ঠাণ্ডাপ্রিয় গাছ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইংলিশ আইভি, ম্যারেন্টা, জ্যাকোবিনিয়া, রাবার, বট ও মানি প্ল্যান্ট রাখা যেতে পারে। ড্রয়িংরুমের টেবিলে দু-একটি বনসাই প্ল্যান্টও রাখতে পারেন। রোদ পড়ে না, এমন দেয়ালে ঝুলন্ত উদ্ভিদ লাগানো যায় বা ওয়াল কার্পেটিংও করা যায়। শোয়ার ঘর ও খাবারের ঘরের মাঝের স্থানটিতে সারিবদ্ধভাবে কারুকাজ করা টবে বাহারি পাতার গাছ লাগানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ক্রোটন, রক্তপাতা, রিবন প্ল্যান্ট, ডাম্বকেইন, শতমূলী, ক্যালাডিয়াম, ড্রাসেনা ও অ্যাগলিওনিমা প্রভৃতি উদ্ভিদ বাছাই করা যায়।

যত্ম-আত্তি
টবসহ গাছ এনে ঘরে রেখে দিলেই চলবে না, সেসবে যত্ম বা পরিচর্যা করতে হবে। তবে এসব গাছের সহনশীলতা অনেক বেশি হওয়ায় সহজে মরে না। প্রয়োজন অনুযায়ী গাছের খাবার ও পানি দিতে হবে। রাসায়নিক সার না দিয়ে পরিবেশবান্ধব জৈবসার ব্যবহার করলেই গাছ বেশি সুন্দর ও সুস্থ থাকে। প্রায় সব নার্সারিতেই এসব জৈবসার পাওয়া যায়। পানি দেয়ার সময় সচেতন থাকতে হবে। প্রতিদিন কম করে পানি দেয়া ভালো। সবকিছু মিলিয়ে গাছের প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে। গাছকে অনুভব করে নিয়মিত যত্ম নিতে হবে। প্রতিটি টবের নিচের অংশে ছিদ্র রাখতে হবে।

সাবধানতা
টবে সাধারণ বেলে-দোআঁশ মাটিতেই এসব উদ্ভিদ লাগানো যায়। যতœ নিলে এবং গাছের টব পরিচ্ছন্ন ও শুষ্ক রাখলে ঘরে ক্ষতিকর রোগজীবাণু ও পোকামাকড়ের বসত হওয়ার শঙ্কা থাকবে না। তবে অ্যাজমা বা অ্যালার্জির সমস্যা যাদের আছে, তাদের শোয়ার ঘরে এসব উদ্ভিদ না রাখাই ভালো। আর শিশুদের শোয়ার ঘরেও স্যাঁতসেঁতে টব রাখা যাবে না। শোভা বাড়ানোর পাশাপাশি এসব উদ্ভিদ আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য উপাদান অক্সিজেনও সরবরাহ করে। এতে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অক্সিজেনের ভারসাম্য তৈরি হয় এবং পরিবেশের তাপমাত্রাও তুলনামূলক কমে। ঘরে মশার কয়েল, অ্যারোসল ¯েপ্র ও রেফ্রিজারেটর ব্যবহার করার ফলে যে কার্বন নির্গত হয়, তার সাথে পাল্লা দিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়িয়ে বাতাসের ভারসাম্য বজায় রাখে উদ্ভিদ।

Comments

comments