সীমান্তে আবারও রোহিঙ্গা ঢল : ২৯ হাজার এতিম শিশু শনাক্ত

দুই সপ্তাহের ব্যবধানে আবারও উখিয়ার পালংখালী আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করেছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। গতকাল শেষরাতেই তারা নাফ নদ পার হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে চলে আসে।

দুই দিন ধরে এসব রোহিঙ্গা মিয়ানমারের কোয়ানসিবং ও নাইসাদং সীমান্তে অবস্থান করছিল। এবারে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুমানিক ৩ হাজার বলা হলেও স্থানীয়দের মতে তা হবে ৫ হাজারের বেশি। এর আগে ১৫ অক্টোবর একই সীমান্ত দিয়ে অন্তত অর্ধলাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে, যা ছিল এ পর্যন্ত আসা রোহিঙ্গার সবচেয়ে বড় স্রোত। গতকাল ভোরে নতুন অনুপ্রবেশ করা এই রোহিঙ্গারা আঞ্জুমানপাড়া অতিক্রম করে ক্যাম্প এলাকার দিকে যেতে চাইলে সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবির সদস্যরা তাদের বাধা দেন। দিনভর খোলা আকাশের নিচে অবস্থান গ্রহণের পর সন্ধ্যায় তাদের কুতুপালং ও বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয়ের সুযোগ দেয় বিজিবি। এ ছাড়া মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে আরও অন্তত ২০ থেকে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান নিয়ে আছে। সুযোগ পেলে যে কোনো সময় তারাও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করবে বলে জানিয়েছে বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এদিকে এক তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়েছে এ পর্যন্ত ২৯ হাজার ২২ এতিম রোহিঙ্গা শিশু শনাক্ত হয়েছে। সরেজমিনে গতকাল আসা রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওপারে মিয়ানমারের বিভিন্ন সীমান্তে উখিয়ার লম্বাবিল, আঞ্জুমানপাড়া, থাইংখালী, টেকনাফের হ্নীলার উনছিপ্রাং, দক্ষিণপাড়া সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে আরও হাজার হাজার রোহিঙ্গা। এসব রোহিঙ্গা ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই তাদের ভিটেবাড়ি ফেলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার উদ্দেশে হাঁটা শুরু করে। মিয়ানমারের বুসিদং ও রাসিদং থেকে হেঁটে বাংলাদেশ সীমান্তে আসতে তাদের দুই থেকে তিন সপ্তাহ লেগে যায়।

এ ছাড়া উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়ার বিপরীতে ওপারে মিয়ানমার সীমান্তের কোয়ানসিবং, নাইসাদং, দংখালী, কুমিরখালী, মংডুর সর্বদক্ষিণে নাইক্যনদিয়ায় এক মাসেরও অধিক সময় ধরে অপেক্ষা করছে আরও ২০ থেকে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা। সুযোগ পেলেই তারাও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করবে। তাই ভিটেবাড়িছাড়া এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তের কাছেই মানবেতর জীবন যাপন করছে। এদিকে গতকালও শাহপরীর দ্বীপের কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে ভোরে কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ অনুপ্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বিজিবির কক্সবাজার ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঞ্জুরুল হাসান খান জানান, বৃহস্পতিবার ভোরের আগেই এসব রোহিঙ্গা উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তে শূন্যরেখায় আশ্রয় নেয়।

ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের আলোকে তাদের ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। সকাল থেকে সীমান্তে ইউএনএইচসিআর, আইওএমসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার কর্মীরাও উপস্থিত থেকে তাদের মানবিক সহায়তা দিয়েছেন।

৩৪ বিজিবির অতিরিক্ত পরিচালক মেজর ইকবাল জানান, অনুপ্রবেশকৃত রোহিঙ্গার সংখ্যা আড়াই থেকে তিন হাজার। তাদের নো-ম্যান্স-ল্যান্ডে রাখার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তাদের তল্লাশি শেষে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় পাঠানো হবে।

গতকাল সকালে আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, অনাহারে-অর্ধাহারে থাকা এসব রোহিঙ্গা খাবার ও পানির জন্য ছটফট করছে। বিশেষ করে শিশুরা ক্ষুধার যন্ত্রণায় কান্নাকাটির রোল বসিয়ে দিয়েছে। বয়স্করাও ক্ষুধায় কাতর হয়ে আঞ্জুমানপাড়ার ধানখেতের আইলে কড়া রোদ মাথায় নিয়ে বসে ছিলেন। সকাল ৯টার পর আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ও দেশি-বিদেশি এনজিওর কর্মীরা সীমান্তে উপস্থিত হয়ে শুকনো খাবার ও পানি বিলি-বণ্টন করেন। প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্যও উপস্থিত হন রেড ক্রিসেন্ট ও কুতুপালংয়ের বিদেশি হাসাপাতাল এমএসএফের কর্মীরা। তবে প্রয়োজনের তুলনায় খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা অপ্রতুল হওয়ায় তা নিয়ে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। বেশ কয়েক দিন না খেয়ে থাকা এসব রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুকে বেশ ধৈর্যহীন হতে দেখা যায়। খাবার ও পানি দেখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ার অবস্থা তাদের। আঞ্জুমানপাড়ায় রাখাইনের বুসিডং মনিবিল এলাকা থেকে আসা হোছন ও জাফর আলমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা বাড়ি থেকে বের হয়েছেন ১১ দিন আগে। নদী-নালা, খাল-বিল ও পাহাড়-পর্বত অতিক্রম করে বুধবার শেষরাতে বাংলাদেশে ঢোকেন।

তারা জানান, মিয়ানমারে এখন যারা রয়ে গেছেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাদের এমপিসি কার্ড (মিয়ানমার পুলিশ ক্লিয়ারেন্স) নিতে বাধ্য করছে। তারা তাদের কোনো সম্পদ দাবি করতে পারবে না। সেনারা যেখানে নিয়ে যান, রোহিঙ্গাদের সেখানে যেতে হবে। এ কার্ড ছাড়া ঘরের বাইরে বের হলে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো হচ্ছে অমানবিক অত্যাচার। একই এলাকার মোহাম্মদ খলিল জানান, প্রতিটি পরিবারের পুরুষ সদস্যকে প্রতি সপ্তাহে তিন দিন করে বিনা পয়সায় মিয়ানমার পুলিশ ও সেনাদের জন্য শ্রম ব্যয় করতে হয়। অনীহা প্রকাশ করলেই নেমে আসে ভয়াবহ অত্যাচার। তাই তারা প্রাণ বাঁচাতে ও জীবনের নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন। মনিবিল থেকে আসা বৃদ্ধা ছবুরা খাতুন (৭৫) বলেন, ‘জীবনে সুখ-শান্তি কী তা চোখে দেখিনি। মরার আগে যেন একটু শান্তিতে মরতে পারি এজন্যই দুই সপ্তাহ ধরে কষ্ট করে ছেলেদের কাঁধে চড়ে এপারে এসেছি।’

বাংলাদেশ প্রতিদিন

Comments

comments