আবার অটোরিকশার মেয়াদ বাড়ানোর তোড়জোড় : আড়াই কোটি টাকা তুলছে মালিক সমিতি!

সিএনজিচালিত অটোরিকশার মেয়াদ বৃদ্ধির কাজ ত্বরান্বিত করতে প্রায় আড়াই কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করছে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতি ঐক্য পরিষদ। অটোরিকশার মালিকদের কাছ থেকে এই টাকা তোলা হচ্ছে। তবে মালিক সমিতি ঐক্য পরিষদের দাবি, অটোরিকশা পরীক্ষা ও আনুষঙ্গিক খরচের জন্য মালিকেরা অনুদান হিসেবে এই টাকা দিচ্ছেন।

তিন বছর আগে অটোরিকশার মেয়াদ ৪ বছর বাড়িয়ে ১৫ বছর করা হয়। আগামী মাসে এই মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ১৫ বছরের পুরোনো সব অটোরিকশার মেয়াদ এখন একসঙ্গে আরও ৬ বছর বাড়ানোর জন্য তদবির চলছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মাধ্যমে বিদ্যমান অটোরিকশাগুলো পরীক্ষার অনুমতি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। ৯ বছর মেয়াদ ধরে এই অটোরিকশাগুলো আমদানি করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১১ সালে প্রথম ১ বছর, ২০১২ সালে আবার ১ বছর এবং ২০১৪ সালে আবার ৪ বছরের জন্য মেয়াদ বাড়ানো হয়। এখন আরও ৬ বছর বাড়িয়ে ৯ বছরের অটোরিকশার মেয়াদ ২১ বছর করার তোড়জোড় চলছে।

বিআরটিএ ও মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে। ঢাকা বিভাগ থেকে অনুমতি নেওয়া ও প্রাইভেট সিএনজিচালিত অটোরিকশা এই হিসাবে ধরা হয়নি। এর মধ্যে রাজধানীতে চলাচল করা ৫ হাজার ৫৬১ ও চট্টগ্রামে ৭ হাজার ৪৬৯টি অটোরিকশার বয়সসীমা (ইকোনমিক লাইফ) আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে।

এই অবস্থায় গত বছরের ২১ নভেম্বর ঢাকা ও চট্টগ্রামের অটোরিকশামালিকদের চারটি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ঢাকা মহানগর অটোরিকশা মালিক সমিতি ঐক্য পরিষদের ব্যানারে আবারও এসব অটোরিকশার মেয়াদ আরও ৬ বছর বাড়ানোর আবেদন করা হয়। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে দেওয়া ওই আবেদনে অটোরিকশার ইঞ্জিন ও গ্যাস সিলিন্ডার পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিআরটিএ বুয়েটে অটোরিকশার নমুনা পরীক্ষা করার অনুমতি চেয়ে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পেলেই অটোরিকশার নমুনা পরীক্ষার জন্য বুয়েটের সঙ্গে যোগাযোগ করবে বিআরটিএ।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। তবে খুদে বার্তা পাঠিয়ে তিনি জানান, নিজেই ফোন করবেন তিনি। কিন্তু তিনি আর যোগাযোগ করেননি। এই প্রতিবেদক আবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি।

তবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবদুল মালেক জানিয়েছেন, গত সোমবার অটোরিকশার বয়সসীমা-সংক্রান্ত একটি চিঠি মন্ত্রণালয়ে এসেছে। চিঠিতে বুয়েটের মাধ্যমে অটোরিকশার পরীক্ষা করাতে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। অনুমতি দেওয়া হবে কি না, এ ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

মেয়াদ বৃদ্ধির এই তৎপরতার মধ্যেই প্রতিটি অটোরিকশার জন্য মালিকের কাছ থেকে এক হাজার করে টাকা চাঁদা তুলছে ঐক্য পরিষদ। গত ১০ অক্টোবর ঐক্য পরিষদের অন্তর্ভুক্ত ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় এই চাঁদা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার অটোরিকশার মালিকদের কাছ থেকে এই টাকা তোলা হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির রমনা, রামপুরা ও তেজগাঁও অঞ্চলের সভাপতি নজরুল ইসলাম টাকা তোলার কথা স্বীকার করেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘বুঝেনই তো, টাকা ছাড়া কোনো ফাইল সরে না। খরচ হিসেবে এই টাকা নেওয়া হচ্ছে।’ কোন খাতে খরচ হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সমিতির বড় নেতারা আছেন, তাঁরাই জানেন কীভাবে খরচ হবে। আমাকে টাকা তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আমি তুলছি।’

খরচের ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি ও ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক বরকত উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতি প্রতিষ্ঠার পর মালিকদের কাছ থেকে মাসিক চাঁদা নেওয়া হয়নি। এখন একবারে নেওয়া হচ্ছে। কী ধরনের খরচের জন্য চাঁদা তোলা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বুয়েটে যদি অটোরিকশা পরীক্ষা করার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে সেখানে পরীক্ষা বাবদ ফি দিতে হবে। ২০১৩ সালে বুয়েটে নমুনা পরীক্ষার জন্য ফি দিতে হয়েছিল সাড়ে ১১ লাখ টাকা।

নতুন অটোরিকশা আনতে সমস্যা কোথায় জানতে চাইলে বরকত উল্লাহ বলেন, এটি সময়সাপেক্ষ। এত অল্প সময়ে এটা সম্ভব নয়। অটোরিকশা ডেনটিং-পেইন্টিং করে ইঞ্জিন ও গ্যাস সিলিন্ডার প্রতিস্থাপন করলে কোনো সমস্যা হবে না। এতে মালিক ও দেশ আর্থিকভাবে লাভবান হবে। যাত্রীদের কী লাভ হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার বয়সসীমা বাড়ালে সব মালিকের ফোন নম্বর, পরিচয়সহ একটি ডেটাবেইস বানানো হবে এবং তাঁরা চালকদের কাছ থেকে দৈনিক জমা বেশি নেবেন না বলে অঙ্গীকার করানো হবে। মালিকেরা জমা বেশি না নিলে চালকেরা অতিরিক্ত ভাড়া নিতে পারবেন না। ফলে মিটারে চলাচল নিশ্চিত হবে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, প্রতিবারই ভাড়া বাড়ানোর আগে তাঁরা এমন অঙ্গীকার করেছেন। কিন্তু কখনোই রক্ষা করেননি। তাঁদের বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। এখন সরকার যে সিদ্ধান্তই নিক, এই খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সব অটোরিকশা একটি প্রতিষ্ঠানের আওতায় আনতে হবে। নয়তো এ খাতে বিশৃঙ্খলা থেকে বের হওয়া যাবে না। যাত্রীরাও সেবা পাবে না।

Comments

comments