সেন্টমার্টিনদ্বীপে দূর্ভিক্ষের আশংকা!

হাফেজ মুহাম্মদ কাশেম, টেকনাফ:
২৭ সেপ্টেম্বর ঘটা করে পর্যটন দিবস পালিত হলেও সেপ্টেম্বরের পর অক্টোবর মাসও শেষ হয়েছে। কিন্ত টেকনাফ এবং দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটক নেই। পর্যটকবাহী জাহাজও চালু হয়নি। কবে নাগাদ চালু হবে তারও কোন নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছেনা। প্রতি বছর অনেক আগেই দেশী-বিদেশী পর্যটক, ভিআইপিদের পদচারণা থাকলেও এবছর রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের প্রভাবে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু না হওয়ায় তা দেখা যাচ্ছেনা। একদিকে সাগরে মাছ শিকার বন্দ, অন্যদিকে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু না হওয়ায় যেকোন সময় সেন্টমার্টিনদ্বীপে দূর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে যেকোন সময় দুর্ভিক্ষের আশংকা করছেন দ্বীপবাসী।

জানা যায়, দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে শতাধিক হোটেল মোটেল রয়েছে। ঈদের আগে থেকেই এসব হোটেল মোটেলকে পর্যটক বরণে প্রস্তত করা হয়েছিল। তাছাড়া প্রতি বছরই কুরবনীর ঈদের পরদিন থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ চালু করা হত। কিন্ত এবছর বৈরী আবহাওয়ার কারণে স্থানীয় প্রশাসন থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করার অনুমতি দেয়া হয়নি। উপরন্ত যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের প্রভাব।

সরেজমিন পর্যটকবাহী জাহাজ কেয়ারী সিন্দাবাদের জাহাজ ঘাটে গিয়ে দেখা যায় জাহাজে পর্যটক ওঠানামার জেটি মেরামত কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কাঠের এ জেটি ঘুর্ণিঝড় মোরার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ঘাটে পর্যটকবাহী জাহাজ কেয়ারী সিন্দাবাদ ও কেয়ারী ক্রুজ ডাইন প্রস্তত। অফিস, অভ্যর্থনা, ওয়েটিং রুমসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সংস্কারও শেষ।

সেন্টমার্টিনদ্বীপ ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব নুর আহমদ ৩১ অক্টোবর বলেন ‘দ্বীপবাসীর প্রধানতঃ জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল হচ্ছে পর্যটন ও সাগরে মাছ শিকার। বছরের ৬ মাসই বেকার থাকতে হয়। অন্যান্য বৎসর ১লা অক্টোবর থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ চালু হলেও এবৎসর এখনও চালু হয়নি। ফলে একদিকে পর্যটন ব্যবস্যায়ীদের মাথায় হাত। অন্যদিকে দ্বীপ থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নে ফিশিং বোট প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে দ্বীপে বড় ধরনের দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। সেন্টমার্টিনদ্বীপের ১ হাজার ৩৫৪টি পরিবারের সাড়ে ৮ হাজার বাসিন্দার ৪ ভাগের ৩ ভাগই পর্যটন নির্ভর। এমনিতেই বর্ষাকালে বেকার সময় কাটানোর পর অক্টোবর থেকে পুরো দমে পর্যটক সমাগমের আশায় সকলেই বিনিয়োগ করে প্রস্ততি নিয়েছিল। এখন পুরো ১ মাস অতিবাহিত হলেও পর্যটক যাতায়ত শুরু না হওয়ায় আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির সম্মুখীন এবং হতাশ হয়ে পড়েছেন।

প্রতি বছর আড়াই থেকে ৩ লক্ষ দেশী-বিদেশী পর্যটক সেন্টমার্টিনদ্বীপ ভ্রমণ করেন। এখাতে সরকার প্রচুর রাজস্ব আয় করেন। এ অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ৩ লক্ষ দেশী-বিদেশী পর্যটক সেন্টমার্টিনদ্বীপ ভ্রমণ বঞ্চিত হবেন। এতে দেশের একটি অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত এবং প্রবাল দ্বীপের সুনাম মারাত¦কভাবে ক্ষুন্ন হবে। ঈদের আগে থেকেই সেন্টমার্টিনদ্বীপের হোটেল মোটেলকে পর্যটক বরণে প্রস্তত করা হয়েছে। দ্বীপের মানুষ পর্যটকদের বরণ করতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। সেন্টমার্টিনদ্বীপে জাহাজ থেকে পর্যটক ওঠানামার জেটির কিছু অংশ ভেঙ্গে গিয়েছিল। এ জেটির দায়িত্বে আছেন কক্সবাজার জেলা পরিষদ। বিষয়টি তাঁদের এবং স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করার পর মেরামত কাজও শেষ হয়েছে। এসমস্যা নিরসনে জরুরী ভিত্তিতে টেকনাফ-সেন্টমার্টিনদ্বীপ নৌপথে আগের নিয়মে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা নিতে আমি প্রধানমন্ত্রী, স্বরাস্ট্রমন্ত্রী, পর্যটন মন্ত্রীর কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় দ্বীপবাসীর অপুরণীয় ক্ষতি হবে, এবং এখনও হচ্ছে’।

পর্যটকবাহী জাহাজ কেয়ারী সিন্দাবাদ ও কেয়ারী ক্রুজ ডাইনের ইনচার্জ শাহ আলম বলেন ‘জাহাজ চলাচলের জন্য প্রশাসনের অনুমতি পাওয়া যাচ্ছেনা। ১ অক্টোবর থেকে যথানিয়মে টেকনাফ-সেন্টমার্টিনদ্বীপ নৌরুটে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করার ঘোষণা এবং পুর্ণ প্রস্ততি রয়েছে। কিন্ত রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের প্রভাবে প্রশাসন জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছেননা’।

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড বাহিনী শাহপরীরদ্বীপ স্টেশনের এমএ আক্তার বলেন নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনা ভরাট হওয়ায় টেকনাফ-সেন্টমার্টিনদ্বীপ চলাচলকারী পর্যটকবাহী জাহাজগুলো যাতায়ত করে মিয়ানমার জলসীমানার খাড়ি দিয়ে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভাল থাকলেও সীমান্ত পরিস্থিতি ভিন্ন। এখনও মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী উস্কানীমুলক কর্মকান্ড অব্যাহত রেখেছে। টেকনাফ থেকে দেশী-বিদেশী পর্যটক ও ভিআইপিদের নিয়ে মিয়ানমার জলসীমানা ব্যবহার করে যাতায়তকালে যে কোন মুহুর্তে অপ্রীতিকর ঘটনার আশংকা বিদ্যমান থাকায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড বাহিনীর পক্ষ থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের উপর আপত্তি জানানো হয়েছে। আমরা চাইনা কোন পর্যটকের ক্ষতি হউক। পর্যটকদের কারণে সীমান্ত উত্তেজনা বা নতুন করে কোন অঘটন সৃস্টি পরিহার করতে রাষ্ট্রিয় নিরাপত্তার স্বার্থ বিবেচনায় এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিষয়টি উচ্চ পর্যায়ে দ্বি-পাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি করা দরকার’।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ জাহিদ হোসেন সিদ্দিক বলেন ‘রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের প্রভাবে জেলা প্রশাসন জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছেননা। এব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চলছে’।

Comments

comments