খাল যায় যাক, ওয়াসার ‘ব্যবসা’ টিকে থাক!

হায়দার আলী

রাজধানীর ৪৩টি খালের অন্যতম পুরনো খাল হচ্ছে কল্যাণপুর খাল। গতকাল সোমবার সকাল ১১টায় শেরেবাংলানগরের জনতা হাউজিংয়ের ফটকের সামনে গিয়ে দেখা গেল, খালের ওপর বাবু মিয়ার চায়ের দোকান।

পাশেই মধু মিয়া ও বুলবুলের চায়ের দোকান। শুধু দোকানপাট নয়, আশপাশের বাসাবাড়ি এবং স্থাপনাও গড়ে উঠেছে খালের কিছু জমি দখল করে। খাল ধরে কল্যাণপুরের দিকে যেতে যেতে চোখে পড়ল শুধু দখল আর দখল। অবৈধ অসংখ্য দোকান, রিকশার গ্যারেজ, যুবলীগের অফিস ও নানা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

অভিযোগ রয়েছে, ওয়াসার কর্মকর্তারা ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভয় দেখিয়ে সেখান থেকে মাসোয়ারা নেন। তাই খাল হারালেও টিকে আছে দখলদার ও ওয়াসা কর্মকর্তাদের ‘ব্যবসা’। আর খালের যেটুকু অংশ দেখা যায়, তাও আবর্জনায় ভরা। পরিচ্ছন্নতা অভিযানের কোনো খবর নেই। পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে আশপাশের বিস্তৃত এলাকায় তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।

চায়ের দোকান করছেন কত বছর ধরে? এমন প্রশ্নের জবাবে জনতা হাউজিংয়ের ফটকের সামনের দোকানদার বাবু মিয়া বলেন, ‘১৯ বছর ধরে খালে দোকান করছি। তয় খালের ওপর আমার দোকান নয়, খালের পাশে দোকান। ’ তবে পাশেই দাঁড়িয়ে ষাটোর্ধ্ব আজাহার উদ্দিন খন্দকার বলেন, খালের ওপর না হইলে কী হবে, এগুলো সবই খালের জমি, দখল করে দোকান দিয়েছে। শুধু কী দোকান! খালের আশপাশের বাড়ির অর্ধেকই খালের জমিতে। কিন্তু ওয়াসার লোকদের সঙ্গে হাত করেই সব দখল করে নিয়েছে।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানায়, স্থানীয় জহির মিয়া ও তাঁর ভাই সাইদ মিয়া খালের ওপর দোকানসহ ১৪টি ঘর বানিয়ে ভাড়াও দিয়েছেন। জহিরের মতো খালের পাশে যাদের জমি রয়েছে, তাদের সবাই কমবেশি খালের জমি দখলে নিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করেছে। জনতা হাউজিংয়ের বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘ওয়াসার লোকজন কয়েকবার উচ্ছেদের জন্য এলেও আর উচ্ছেদ হয় না। যদিও বা একদিকে উচ্ছেদ করেন, কয়েক দিন পরই ওয়াসার লোকজনকে ম্যানেজ করে সেখানে স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করে নিচ্ছে দখলদাররা।

জনতা হাউজিং থেকে বেরিয়ে পশ্চিম আগারগাঁও ৬০ ফিট সড়কের ভাঙা ব্রিজ পর্যন্ত খালটির কোথাও পাঁচ ফুট, কোথাও তিন ফুট প্রশস্ত রেখেই বাকি জায়গা দখলে নিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। খালটির বেশির ভাগ স্থানেই ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখায় ঠিকমতো পানি নিষ্কাশনও হচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দা আলেক হোসেন, মনির হোসেন ও জয়নাল আবেদীন জানান, বিশাল খালটি এখন আর খাল নেই। নালায় পরিণত হয়েছে। ঠিকমতো ময়লা পানিও যেতে পারেনা। একটু বৃষ্টি হলেই আশপাশ ডুবে যায়।

দেখা গেছে, পশ্চিম আগারগাঁও হাজি নূর মোহাম্মদের পুরনো বাড়ির সামনেই ওয়াসার কালভার্টের ওপর ২০টির বেশি অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে ব্যবসা করে যাচ্ছে স্থানীয় কিছু মানুষ। এখান থেকেও মাসোয়ারা নিচ্ছেন ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। নিয়মিত মাসোয়ারা না দিলেই তাঁরা এসব স্থাপনা অভিযান চালিয়ে ভেঙে দেওয়ার ভয়ভীতি দেখান বলে অভিযোগ রয়েছে।

কল্যাণপুর খালটির অন্য অংশ জাতীয় অর্থোপেডিক ইনস্টিটিউটের (পঙ্গু হাসপাতাল) সামনে থেকেই শুরু হয়ে বিএনপি বাজার হয়ে শ্যামলী কাজি অফিস হয়ে কল্যাণপুর প্রধান খালে গিয়ে ঠেকেছে। খালটির উভয় পাশে পাকা করা হলেও নেই রেলিং। খালটি ময়লা-আবর্জনায় ভরা। বিএনপি বাজারের সামনেই দেখা যায়, খালটির ওপর ছোট বাঁশের সাঁকোও নির্মাণ করা হয়েছে।

শ্যামলী কাজি অফিস বাজারের সামনেই ওয়াসার খালের ওপর কালভার্টে নির্মাণ করা হয়েছে ২৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের কার্যালয়। স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, ওয়াসার খালটি এখন ব্যক্তিমালিকানা দাবি করে সেখানে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে একটু এগোতেই শ্যামলী ৪ নম্বর রোডের পাশেই ওয়াসার খালের দক্ষিণ পাশে কয়েক গজ পর পর বিভিন্ন ফলের গাছ লাগানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাল, ছাত্রলীগ নেতা এরশাদ, আতিক, সাঈদ এবং মনিরসহ স্থানীয় যুবকরাই নিজ উদ্যোগে এসব গাছের চারা লাগিয়েছে। কয়েকজন ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে, ‘খালের ভেতর ময়লা-আর্বজনা ভরে যাওয়ায় একটু বৃষ্টি হলে খাল উপচে পানি রাস্তায় এসে ঠেকে। খাল পরিষ্কারের বিষয়ে ওয়াসা উদাসীন। শ্যামলী রিং রোডের গোল্ডেন স্ট্রিটের গলির মাথায় গিয়ে দেখা গেছে, কল্যাণপুরের খালটির অর্ধেক অংশই দখল করে গ্যারেজ ও অর্ধশতাধিক ঘর তুলে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কক্ষ থেকেই দুই হাজার টাকা ভাড়া নিয়ে চলছে ঘরভাড়া। স্থানীয় রিকশাচালক আমান হোসেন বলেন, হামিদুলের দুটি গ্যারেজ রয়েছে। আর একটি আব্দুর রহিমের। দুজনই স্থানীয় প্রভাবশালী হাজি মো. শরিফ মাতবরের ছেলের কাছ থেকে ওয়াসার জমি ভাড়া নিয়ে গ্যারেজ ব্যবসা করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম ও রাজিউদ্দিন মিয়া জানান, এলাকার বিভিন্ন ভবন ভাঙার পর ইট আর সুরকি ফেলেও ওয়াসার খালটি ধীরে ধীরে ভরাট করে সেখানে রিকশার গ্যারেজ বানিয়ে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, অবৈধ বসতঘর তুলেও ভাড়া চলছে। ওয়াসার লোকজনের সঙ্গে আঁতাত করেই এটা তৈরি করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিমাংশ হয়ে মাহবুব মোরশেদ সরণি দিয়ে কল্যাণপুর প্রধান খাল পর্যন্ত বিস্তৃত কল্যাণপুর ‘চ’ খাল। কাগজে-কলমে এ খালের দৈর্ঘ্য এক হাজার ১২০ মিটার। প্রস্থ ১৮ মিটার হলেও বাস্তবে রয়েছে মাত্র সাত মিটার। সিটি করপোরেশনের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, খালটিতে অবৈধ স্থাপনা রয়েছে ৬৫০ বর্গমিটার। পুরো খালের ৮৪০ মিটার ময়লা-আবর্জনায় ভরা। তাই পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ রয়েছে। ফলে বৃষ্টি হলেই বেশির ভাগ এলাকা ডুবে যায় এবং জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীর ৪৩টি খালের মধ্যে ঢাকা ওয়াসা রক্ষণাবেক্ষণ করে ২৬টি।

কালেরকন্ঠ অনলাইন

Comments

comments