টাকা না পেয়ে ব্যবসায়ীকে হত্যার অভিযোগ ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে

এক লাখ টাকা না পেয়ে রাসেল নামের এক পাট ব্যবসায়ীকে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে রংপুরের গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বিরুদ্ধে। কাউনিয়া উপজেলার হলদীবাড়ি গ্রামের বাড়ি থেকে শনিবার (২৮ অক্টোবর) রাতে রাসেলকে ধরে নিয়ে যায় ডিবি পুলিশ। পরে তার বোনকে ফোন করে রাতেই এক লাখ টাকা নিয়ে ডিবি কার্যালয়ে যেতে বলা হয়। কিন্তু তিনি এ টাকা জোগাড় করতে ব্যর্থ হন। রবিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে হাসপাতালে গিয়ে রাসেলের লাশ দেখতে পান তার পরিবারের সদস্যরা।

তবে ডিবি পুলিশ বলছে, রাসেল একজন মাদক ব্যবসায়ী ও হেরোইনসেবী। আটক করে থানায় আনার পর অসুস্থ হয়ে পড়লে শনিবার রাতেই তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি মারা যান। রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, রাসেলকে ডিবি পুলিশের এসআই বাবুল ও গোলাম মোরশেদ এবং কনস্টেবল শহীদ আটক করেছিলেন।

এদিকে, রাসেলের মৃত্যুর খবরে স্বজনরা হাসপাতালে ছুটে গেলে পুলিশ তড়িঘড়ি করে লাশ হাসপাতালের ২৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে নামিয়ে হাসপাতালের ‘ডেড হাউসে’ নিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখে।

নিহত রাসেলের ছোট বোন সোহানা মনি অভিযোগ করেন, শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে তার বড় ভাই রাসেলকে গ্রামের বাড়ি থেকে ডিবি পুলিশ ধরে তাদের অফিসে নিয়ে যায়। পরে রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর আশরতপুর এরশাদনগর এলাকার তার (সোহানা) শ্বশুরবাড়িতে দেয়াল টপকে বাসায় ঢুকে ডিবি পুলিশ। তারা বাড়ির মালামাল তছনছ করে। সোহানা বলেন, ‘ডিবি পুলিশ জানায় আমার বাড়িতে মাদক আছে। কিন্তু তল্লাশি করে কিছুই পাওয়া যায়নি। পরে তারা জানায় ভাইকে (রাসেল) তারা ধরে নিয়ে ডিবি অফিসে আটকে রেখেছে। তাকে মুক্ত করতে চাইলে এক লাখ টাকা নিয়ে আসতে হবে। রাতের মধ্যে এ টাকা না দিতে পারলে লাশ পাওয়া যাবে বলেও তারা হুমকি দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরপর রাতে আবারও পাশের বাড়ির এক নারীর মোবাইলে ফোন করে আমাকে ওই টাকা নিয়ে যেতে বলা হয়। একপর্যায়ে তারা ভাইয়ের (রাসেল) সঙ্গে আমার কথা বলিয়ে দেয়। সে সময় ভাই বলেন,এক লাখ টাকা নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে আসো কিন্তু আমরা টাকা জোগাড় করতে পারিনি। পরে সকালে মামাতো বোন সীমাকে সঙ্গে নিয়ে ডিবি অফিসে গেলে আমাকে কোতয়ালী থানায় যেতে বলা হয়। থানায় গেলে জানানো হয়, ভাই অসুস্থ, তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে দেখি ভাইয়ের লাশ পড়ে আছে।’

নিহত রাসেলের মামাতো বোন সীমা জানান, রাসেল মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন না। তিনি পাটের ব্যবসা করতেন। পুলিশ অন্যায়ভাবে তাকে ধরে নিয়ে এক লাখ টাকা দাবি করে। এ টাকা না দেওয়ায় অমানুষিক নির্যাতন করে তাকে হত্যা করা হয়েছে।

হাসপাতালের ‘ডেড হাউসে’র সামনে প্রত্যক্ষদর্শী এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ডিবি পুলিশ রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর আশরতপুর এরশাদনগর এলাকায় রাসেলের ছোট বোন সোহানা মনির বাড়ি ঘেরাও করে তল্লাশি শুরু করে। তারা সোহানা মনির স্বামী তুলির খোঁজ করতে থাকে। তারা বলে, সোহানার স্বামীও মাদক ব্যবসায়ী। এ সময় এলাকাবাসীরা একথার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, তিনি মাদক ব্যবসায়ী নন, বরং রংপুর জেলা পরিষদ সুপার মার্কেটে কাপড়ের দোকান রয়েছে তার। এসময় ডিবি পুলিশের এক এসআই সোহানাকে বলেন, তোমার ভাইকে (রাসেল) ছাড়িয়ে আনতে চাইলে রাতের মধ্যে এক লাখ টাকা নিয়ে আসতে হবে। ওই প্রত্যক্ষদর্শী নারী আরও জানান, এরপর গভীর রাতে ডিবি পুলিশ মোবাইলে ফোন করে টাকা নিয়ে আসবে কিনা তা জানতে চায়। এ সময় রাসেলের সঙ্গে সোহানাকে কথা বলিয়ে দেয় তারা। সেখানেও এক লাখ টাকা নিয়ে রাতের মধ্যে দেখা করতে বলে ডিবি পুলিশ।

এ ব্যাপারে রংপুর ডিবি পুলিশের ওসি শরিফুল ইসলামের সঙ্গে কয়েকবার মোবাইল ফোনে চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর শফিক বলেন, ‘রাসেল মাদকসেবী। তাকে কোনও নির্যাতন করা হয়নি, টাকাও দাবি করা হয়নি। তার নামে বেশ কয়েকটি মাদক আইনে মামলা রয়েছে।’

নির্যাতনে মৃত্যুর খবরে দুপুর ২টার দিকে রংপুর পুলিশ লাইনের ভেতরে অবস্থিত ডিবি পুলিশ কার্যালয়ে গেলে সেখানে দুজন কনস্টেবল ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায়নি। রংপুরের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ঢাকায় থাকায় এ বিষয়ে কথা হয় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘রাসেল মাদকসেবী। হেরোইন সেবনের কারণে অসুস্থ হয়ে মারা গেছে সে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাসেল, তার বাবা ও বোনের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলা রয়েছে। তার পরও ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে লাশের সুরতহাল করে ময়নাতদন্ত করা হবে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, রাসেলকে আটক করেছে ডিবি পুলিশের এসআই বাবুল, এসআই গোলাম মোরশেদ এবং কনস্টেবল শহীদ। তিনি দাবি করেন, তারা তাকে বলেছে রাসেলকে বাসা থেকে নয়, নগরীর মাহিগজ্ঞ এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘তদন্তে যারাই দোষী সাব্যস্ত হবেন, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলা ট্রিবিউন

Comments

comments